রাকিবুল হাসান, শ্যামনগর (সাতক্ষীরা) প্রতিনিধি:
৪০ বছর ধরে রোগীদের স্বেচ্ছায় দেওয়া নামমাত্র ফি’তে চিকিৎসা সেবা দিয়ে যাচ্ছেন শ্যামনগরের সুন্দরবনঘেঁষা পার্শ্বেখালী গ্রামের সুনীল কুমার মন্ডল নামে এক পল্লী চিকিসৎক। চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের কাছে টাকা না থাকলেও দেন চিকিৎসা ও ফ্রি ওষুধ। এতে করে তিনি সবার কাছে ‘গরিবের ডাক্তারবাবু’ হিসেবে পরিচিত। তার এই চিকিৎসা সেবা নিয়ে খুশি রোগী ও এলাকাবাসীরাও।
সুন্দরবনের উপকূলঘেঁষা জনপদে, যেখানে আধুনিক চিকিৎসাসেবা এখনও অনেকের কাছে দূরের স্বপ্ন, সেখানে গ্রামের সাধারণ মানুষের কাছে পল্লী চিকিৎসক সুনীল কুমার মন্ডল শুধু একজন গ্রাম্য ডাক্তার নন, বরং তিনি এলাকাবাসীর কাছে জীবনের সংকটে প্রথম এবং শেষ ভরসা।
পল্লী চিকিসৎক সুনীল কুমার মন্ডলের বাড়ি সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার মুন্সীগঞ্জ ইউনিয়ের পার্শ্বেখালী গ্রামে। সেখানে সুন্দরবনঘেঁষা মীরগাঙ নদীর তীরে ছোট্ট একটি ঘরে বসেই সকাল থেকে রাত পর্যন্ত তিনি এই চিকিৎসা সেবা দেন।
সম্প্রতি বিকালে উপজেলা সদর থেকে মোটরসাইকেলে যাত্রা শুরু হয় পল্লী চিকিৎসক সুনীল কুমার মন্ডলের চেম্বারের উদ্দেশ্যে। উপজেলা সদর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার পথ পেরিয়ে হরিনগর বাজার, সেখান থেকে আরও ৫ কিলোমিটার পশ্চিমে সুন্দরবন বাজার। এরপর ভাঙাচোরা ইটের রাস্তা ধরে আরও ৪ কিলোমিটার এগিয়ে মইজুদ্দিনের মোড়। সেখানেই তার ছোট্ট চেম্বার।
সন্ধ্যা নামার মুখে পৌঁছে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সুনীল মন্ডল চুপচাপ বসে রোগী দেখছেন। চারপাশে ভিড়। কেউ জেলে, কেউ কৃষক, কেউবা গৃহিণী। সবার চোখে একটাই বিশ্বাস ডাক্তার বাবু আছেন, সমস্যা নাই। তার কক্ষ থেকে অনেকেই ওষুধের ব্যবস্থাপত্র নিয়ে বের হচ্ছেন আবার কাউকে তিনি নিজেই ওষুধ দিচ্ছেন। রোগী দেখার বিপরীতে কারো কাছ থেকে নিচ্ছেন নামমাত্র ১০ টাকা, ২০ টাকা কেউবা সর্বোচ্চ দিচ্ছেন ৫০ টাকা ফি। আবার কারো কাছ থেকে কোনো ফিও নিচ্ছেন না। দিচ্ছেন ফ্রি ওষুধও।
রোগী দেখার ফাঁকেই কথা হয় পল্লী চিকিৎসক সুনীল কুমার মন্ডলের সঙ্গে। তিনি জানান, ছোট বেলা থেকেই তার ইচ্ছে ছিল চিকিৎসক কাকা গীরেন্দ্রনাথ মন্ডল ও বাবা অশ্বিনী মণ্ডলের মতো চিকিৎসক হয়ে মানুষের সেবা করবেন। পরে কাকা-বাবার পথ ধরে পার্শ্ববর্তী ছোট ভেটখালীর গ্রাম্য চিকিৎসক সোলাইমান হোসেনের হাত ধরে হাতে-খড়ি হয় তার। পরবর্তীতে পল্লী চিকিৎসার ওপর বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও কোর্স সম্পন্ন করে নিজ গ্রামে শুরু করেন চিকিৎসা সেবা। এভাবেই ৪০ বছর ধরে নামমাত্র ফি’তে চিকিৎসা সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। এই মানবিক বোধ নিয়েই তিনি হয়ে ওঠেন এলাকার মানুষের নির্ভরতার প্রতীক।
সুনীল কুমার মন্ডল জানান, সুন্দরবনের বাঘের আক্রমণে আহত হওয়া রোগী থেকে শুরু করে জ্বর, সর্দি, কাশ, বাতব্যাথা, প্যারালাইসিস, আঘাত লাগা, শ্বাসকষ্ট, চুলকানিসহ ছোটখাটো প্রায় সব ধরনের চিকিৎসা করেন তিনি। প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ৪০ থেকে ৭০ জন রোগী দেখেন তিনি। রোগীরা যে টাকা দেন তাই নেন। কোন সময়ের জন্য তাদের কাছ থেকে টাকা চায়ে নেওয়া হয় না। আবার কোনো রোগীর কাছে টাকা না থাকলে রোগীদের কিছু জরুরি ওষুধ বিনামূল্যে দিয়ে দেন। তার এই চিকিৎসা সেবায় অনেকেই ভালো হন এবং উপকৃত হন। তাই আজীবন এভাবেই মানুষকে সেবা দিতে চান তিনি।
তিনি আরোও জানান, তার জীবনের প্রথম রোগী ননীগোপাল নামের এক মৌয়াল। সুন্দরবনে মধু সংগ্রহ করতে গিয়ে বাঘের আক্রমণে গুরুতর আহত হন। সেই রোগীকেই চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ করে তোলেন তিনি। সর্বশেষ ২০২৪ সালের ১০ সেপ্টেম্বর রেজাউল ইসলাম নামে এক জেলে বাঘের আক্রমণে আহত হলে তাকেও চিকিৎসা দেন। এখন তিনি আবার সুন্দরবনে মাছ-কাঁকড়া ধরে জীবিকা নির্বাহ করছেন। এমন অসংখ্য গল্প ছড়িয়ে আছে তার জীবনে। যেখানে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আসা মানুষ ফিরে গেছে নতুন আশায়।
চিকিৎসার মূল দর্শন সম্পর্কে সুনীল মন্ডল বলেছেন, আমি চিকিৎসা দেই টাকার জন্য না। মানুষের দোয়া-আশীর্বাদ পাওয়ার জন্য এই পেশায় আইছি। বয়স বেড়েছে উল্লেখ করে তিনি জানান, জীবনের শেষ সময়টুকু পর্যন্ত মানুষের ভালোবাসা দোয়া ও আশীর্বাদ নিয়েই বিদায় নিতে চাই।
তার চেম্বার থেকে চিকিৎসা সেবা নিয়ে বের হলে কথা হয় আছিয়া খাতুনের সঙ্গে। এসময় তিনি বলেছেন, এই ‘ডাক্তার বাবু’ আমাগা প্রথম আর শেষ ভরসা। জঙ্গলে বাঘে ধরা হোক বা যেকোনো অসুখ-বিসুখ আমরা উনার কাছেই আসি। উনি (পল্লী চিকিৎসক সুনীল মণ্ডল) বলে, ‘হামাগুড়ি দিয়া হলেও আমার কাছ পর্যন্ত আসবা।’ এই বিশ্বাসেই আমরা আসি।
শাহাজান গাজী নামে চিকিৎসা নিতে আসা আরেক রোগী বলেছেন, ছোটবেলা থেইকা এই ডাক্তার বাবুর কাছে চিকিৎসা নেই আমি সহ আমার পরিবারের সকলে। আজও প্রেসার দেইখা ওষুধ দিল। টাকা দেই নি, উনিও চাই নি।
চিকিৎসা সেবা নিতে আসা সন্ধ্যা মন্ডল নামের এক গৃহিণী বলেছেন, বিয়ার পর থেকেই এই ২৭-২৮ বছর ধরে এই ডাক্তার বাবুর কাছে আসি। কখনো ৫ টাকা, কখনো ১০-২০ টাকা দিছি, আবার অনেক সময় কিছুই দেওয়া হয় না। কিন্তু উনি কোনদিন কিছু বলে না।
৭০ বছর বয়সি সুন্দরবনের জেলে নুর ইসলামের ভাষ্য, বিশ্বাসে অর্ধেক রোগ ভালো হয়ে যায়। ৩০ বছর ধরে আমরা এই ডাক্তার বাবুর কাছে চিকিৎসা নেই। আমাগো পরিবারের বউ, ছেলে-মেয়ে সবাই সুনীল ডাক্তারের রোগী। দূরে থাকলেও অসুখ হলে সবাই তার কাছে আসে।
তিনি আরোও বলেছেন, আমার দুই মেয়ের একজনের বিয়ে হয়েছে সাতক্ষীরা শহরে, আরেকজনের পার্শ্ববর্তী উপজেলা কালীগঞ্জে। তারাও অসুস্থ হলেই সেখান থেকে এখানে এসে এই ডাক্তার বাবুর কাছে চিকিৎসা নেয়। আমরা মনে করি, তার কাছে আসলেই যেন রোগ ভালো হয়ে যায়।
স্থানীয় ইউপি সদস্য আনোয়ারুল ইসলাম বললেন, ‘পল্লীচিকিৎসক সুনীল কুমার আমাদের এলাকার গর্ব। ৪০ বছর ধরে তিনি অত্যন্ত নিষ্ঠা, সততা ও মানবিকতার সঙ্গে দরিদ্র মানুষের চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছেন। চিকিৎসাকে তিনি কখনো ব্যবসা হিসেবে দেখেননি; বরং মানুষের সেবাকেই নিজের জীবনের ব্রত হিসেবে নিয়েছেন। এমন মানুষ সমাজে খুবই বিরল।’

