মোঃ আলমগীর হোসাইন, স্টাফ রিপোর্টারঃ
কুড়িগ্রামের বিস্তৃত চর এলাকাগুলোতে ঈদের খুশি যেন ক্রমেই চাপা পড়ছে। নদী ভাঙন, দারিদ্র্য এবং অনিশ্চিত জীবনের মোকাবিলা করতে গিয়ে অনেকের জন্য কোরবানি পুরোপুরি স্বপ্নের মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোথাও কোরবানির পশু কেনার সামর্থ্য নেই, আবার বহু পরিবার ঈদের দিন এক কেজি মাংসও হাতে পাবে না, এমন একটা বাস্তবতা দেখা যাচ্ছে জেলার বিভিন্ন চরাঞ্চলে।
সরাসরি পরিদর্শনে গিয়ে কুড়িগ্রামের ব্রহ্মপুত্র নদ সংলগ্ন ‘মাঝের চর’ এলাকায় চারপাশে সংগ্রামের পটভূমি নেই। এই এলাকায় এখনও সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা স্থাপন হয়নি। যাত্রাপুর নৌঘাটে পৌঁছাতে নৌকায় প্রায় এক ঘণ্টা সময় লাগে। চার বছর আগে জেগে ওঠা এই চরটিতে নদী ভাঙনে বিপুল ক্ষতির শিকার হয়ে অন্তত ৭০টি পরিবার নতুনভাবে বসতি গড়েছে। তবে তাদের জন্য মাথা গোঁজার স্থান পাওয়া সত্ত্বেও জীবনের চ্যালেঞ্জগুলির পরিবর্তন ঘটেনি।
চরটির বাসিন্দা আরমান আলী এবং তাঁর স্ত্রীর মানবেতর দারিদ্র্যের জীবনযাপন করছেন চার সন্তানের নিয়ে। জীবিকার প্রয়োজনেই আরমান আলী সিরাজগঞ্জের একটি তাঁত কারখানায় কাজ করেন। তবে দীর্ঘদিন বিদ্যুৎ বিভ্রাট এবং অনিয়মিত কাজের কারণে এই বছর তাঁর আয় যথাযথ হয়নি। এর ফলসে, সন্তানের নতুন পোশাক কিনি দূরের কথা, ঈদের দিনে সামান্য মাংস কেনার সামর্থ্যও নেই।
আরমান আলী জানান,
তাঁতের কাজ বিদ্যুৎ ছাড়া সম্ভব নয়। এবার কাজের পরিমাণ কম হয়েছে। হাতে কোনো টাকা নেই। বাচ্চাদের নতুন জামা কিনতে পারিনি। ঈদের দিনে মাংস দিতে পারবেন কিনা সেটাও অজানা।
একই ভাবে হতাশা প্রকাশ করেছেন জেসমিন আক্তার। তিনি বললেন,
আমাদের মাঝে কোরবানির প্রচলন প্রায় নেই। ঈদের দিনে যদি শিশুরা একটু মাংস পেতে পারে তবে ভালো লাগবে।
চরের আরেক বাসিন্দা রাজু মিয়া মন্তব্য করেন,
এখানের অধিকাংশ মানুষ দারিদ্র্যের শিকার। কেও কোরবানি দিতে পারে না। কারো কারো সামর্থ্য থাকলেও তারা বাজার থেকে অল্প মাংস কিনে খাবে, আর বাকিরা সেটাও পাবে না।
মাঝের চরের অধিকাংশ লোক কৃষিকাজের উপর নির্ভর করেন। ধান, কাউন এবং ভুট্টা সহ বিভিন্ন ফসল উৎপাদন করেই তারা ভালোভাবে সংসার চালান। তবে উৎপাদন খরচ মেটানোর পর হাতে বাড়ন্ত সমৃদ্ধির জন্য খুব সামান্য আয় থাকে। সেই আয় দিয়ে পুরো বছরের জন্য জীবনযাপন করা তাঁদের জন্য এক চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে।
স্থানীয়দের মতে, বসতি গড়ার পর গত তিন বছরে এই অঞ্চলে কেও গরু কোরবানি করতে পারেনি। আগের বছর একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন কিছু মাংস বিতরণ করেছিল। এ বছরও অনেকে আশা করছেন, হয়তো কেউ তাদের সহায়তা করবে।
শুধু মাঝের চরই নয়, সদর উপজেলার পোড়ার চর, আইড়মারী, অষ্টআশির চর, উলিপুরের মুসারচর, জাহাজের আলগা ও দইখাওয়ার চরসহ জেলার সাড়ে চার শতাধিক চরের অধিকাংশ মানুষের পরিস্থিতি একই রকম। নদী ভাঙন এবং দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে প্রতি দিনই যুদ্ধ করে তাদের জীবন চলছে।
জানা গেছে, কুড়িগ্রামের ৯টি উপজেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত ১৬টি নদ-নদীর অববাহিকায় প্রায় ৪৬৯টি চর বিদ্যমান। এসব চরে থাকার জন্য পাঁচ লক্ষাধিক মানুষ বাস করছে। তাঁরা শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং যোগাযোগের আবাদী সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি দারিদ্র্যের মুখোমুখি হচ্ছেন।
কুড়িগ্রাম চর উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন পরিষদের আহ্বায়ক শফিকুল ইসলাম বেবু বলেন,
চরবাসীদের কাছে ঈদ এখন আনন্দের পরিবর্তে টিকে থাকার সংগ্রাম হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সামনে বন্যার ঝুঁকিও রয়েছে। তাই অনেক পরিবার ঈদের চেয়ে ভবিষ্যতের চিন্তায় বেশি কষ্ট পাচ্ছে।
তিনি আরো বলেন, সমাজের বিত্তশালী যদি ঈদের হাসি ভাগাভাগি করে চরবাসীদের সহায়তা করেন, তাহলে অসংখ্য অসহায় পরিবারের মুখে হাসি ফুটবে।
এ বিষয়ে সোহেল হোসনাইন কায়কোবাদ ব্যাখ্যা করেছেন, ঈদ উপলক্ষে নিচু শ্রেণীর মানুষের জন্য ভিজিএফ চাল বরাদ্দ করা হয়েছে। এ ছাড়া কম দামে টিসিবির পণ্যও বিক্রি হচ্ছে। কিন্তু চরাঞ্চলবাসীর জীবনযাত্রা খুবই কঠিন উল্লেখ করে তিনি সমাজের অবস্থাপন্নদের প্রতি সহযোগিতার আহ্বান জানান।
