রহমত আরিফ, ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধিঃ
আশি বছর পেরিয়ে যাওয়ার পরও শান্তির দেখা পাচ্ছেন না বৃদ্ধা সুশিলা রাণী। স্বামীর দেয়া ভিটেমাটিতে শান্তিতে বসবাস করা তো দূরের কথা, নিজের সম্পত্তি রক্ষা করতে না পেরে এক ঘর থেকে অন্য ঘরে পালাতে হচ্ছে তাকে। ক্ষমতার পরিবর্তন হলেও এই বৃদ্ধার ভাগ্য বদলায়নি, বরং পাল্টে গেছে শুধু অত্যাচারীর রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষক।
ভুক্তভোগীদের দাবি, আগে আওয়ামী লীগ সরকারে থাকাকালে রুহিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের নেতা পার্থ সারথি সেনের সহায়তায় সুশিলা রাণীর দূর সম্পর্কের ভাসতে বিকাশ চন্দ্র সরকার এসব অন্যায় কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছিলেন। সে সময় বহুবার স্থানীয়ভাবে জানানোর পরও বিচার পাননি অসহায় সুশিলা রাণী।
২৪ এর অভ’্যত্থানে রাজনৈতিক পরিবর্তন হলেও বদলায়নি সুশিলা রাণীর জীবন। অভিযোগ উঠেছে, বর্তমানে বিকাশ চন্দ্র সরকারের এই অন্যায় কর্মকাণ্ডের নতুন আশ্রয়দাতা হয়েছেন রুহিয়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল জব্বার মাস্টার। পূর্বের রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ধরে রেখে নতুন স্থানীয় নেতৃত্বকে ব্যবহার করে জমি দখলের প্রচেষ্টা এবং নির্যাতন অব্যাহত রেখেছেন বিকাশ।
এই বিষয়ে ভুক্তভোগী পরিবার তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে জানায়, দল বদলালে তাদের ওপর নির্যাতনের ধরন বদলায়নি। আগের সরকারের সময় শুরু হওয়া অন্যায়ের দায় যেন এখন নতুন করে স্থানীয় বিএনপি গ্রহণ করেছে।
সুশিলা রাণীর মেয়ে শোভা রাণী সরকার বলেন, আমি একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চাকরি করি। আমার মা আমাদের বোনদেরকে অনেক কষ্টে বড় করেছেন। আমাদের কোন অভিভাবক না থাকায় যার যার ইচ্ছে মতো আমাদের ভিটে মাটি নিয়ে অন্যায় করেছে। অনেকবার বিচার সালিশ হয়েছে, কিন্তু আমার মা ফল পায়নি। আমার কাকাতো ভাই বিকাশ এবং তার মতো যারা আছে তারা তো অন্যায় করেছেন। ভাবতে অবাক লাগে যে এই ধরনের মানুষ সব রাজনৈতিক দলে আশ্রয় পায়।
এই বিষয়ে সুশিলার ভাসতে বিকাশ চন্দ্র সরকারের কাছে জানতে চাইলে তিনি পালিয়ে যান।
বিকাশকে সহায়তা করতে অভিযুক্ত রুহিয়া উপজেলা বিএনপি সভাপতি আব্দুল জব্বার মাস্টার (০১৭১৬৯৬০৩৭৯) তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ মিথ্যে জানিয়ে বলেন, আমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ করা হয়েছে তা মিথ্যে। তারা খারাপ লোক। নিজেরাই জমির ব্যাপারে গন্ডগোল করে আমাকে জড়িয়ে ফেলেছে। তাদের বিচার সালিশেও আমি কখনো যাইনি। এটা যেহেতু তাদের জমি বিষয়ক বিরোধ, তাই আদালতের মাধ্যমেই এর সমাধান হবে।
এই বিষয়ে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক পয়গাম আলী (০১৭১৫৬৫০৯১১) জানান, যেহেতু আমার উপজেলা কমিটির সভাপতির বিরুদ্ধে অভিযোগ এসেছে, তাই আমরা মৌখিক কথা না শুনে লিখিত অভিযোগ এলে তখন সত্যতা যাচাই করবো। আর দলের ওপরে কেউ নেই, সে যত বড় পদেই থাকুক না কেন। আমরা সত্যতা যাচাইয়ের পর উপজেলা সভাপতির সম্পৃক্ততা পেলে যথাযথ পদক্ষেপ নেব।
সম্প্রতি এক বিকেলে সুশিলা রাণী তার পুরনো ঘরের দাওয়ায় বসে স্বামীর ভিটের দিকে তাকায়। তিনি ভাবেন, যে পতাকাই ওড়ানো হোক না কেন, যে দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন, তার মতো অসহায় মানুষের শেষ নিরাপত্তা কেন সবাই নিতে এক হয়ে যায়? রাজনৈতিক রঙ বদলালেও ক্ষমতার আশ্রয়ে বেড়ে ওঠা শোষণের আঘাত তো একই রকম রয়ে যায়। জীবনের এই শেষ পর্যায়ে এসে সুশিলা রাণীর একটাই প্রশ্ন, এই অবিরাম অন্যায় আর ক্ষমতার অশুভ মেলামেশার কি কোনো শেষ নেই? সুশিলা রাণী নিজের মনে এসব ভাবেন আর মেয়ে শোভা রাণী মা এর মাথার চুল বিলি কেটে চিরনি করে দেন খুব যত্নে।
নিজের ভিটেমাটিতে শান্তিতে শেষ নিঃশ্বাস ফেলার আবেদন জানিয়ে প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন অসহায় সুশিলা রাণী। এ ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্ত ও অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারাও।

