খুলনায় রেলওয়ের ৭৬ একর জমি অবৈধ দখলে, থামছে না স্থাপনা নির্মাণ

খুলনায় রেলওয়ের ৭৬ একর জমি অবৈধ দখলে, থামছে না স্থাপনা নির্মাণ খুলনায় রেলওয়ের ৭৬ একর জমি অবৈধ দখলে, থামছে না স্থাপনা নির্মাণ

মো: আল-মাহফুজ শাওন, খুলনা:

খুলনা শহরে বাংলাদেশ রেলওয়ের জমি অবৈধভাবে দখল করে নির্মাণ কাজ বেড়ে যাওয়ায় উদ্বেগ বাড়ছে। শহরের বড় বাজার, কদমতলা, ৪, ৫ ও ৬ নম্বর ঘাট, জোড়াগেট থেকে দৌলতপুর পর্যন্ত রেলপথের দুই পাশে একাধিক অবৈধ স্থাপনা উঠছে। রেলওয়ের তথ্য থেকে জানা যায়, খুলনা ১৮ নম্বর কাছারির আওতাধীন প্রায় ৭৬ দশমিক ০৫ একর জমি বর্তমানে দখল হয়ে আছে, যেখানে দুইশর বেশি স্থাপনা নির্মিত হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে রাজনৈতিক স্ক্যান্ডালের কারণে এই জমি উদ্ধার কাজ বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

তথ্য অনুসন্ধান করে জানা যায়, পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের আওতাধীন খুলনা জেলার অত্যधिक সরকারি জমি দীর্ঘদিন ধরে দখলে রয়েছে। কার্যকরী উচ্ছেদ অভিযান না হওয়ার এবং তদারকির অভাবে রেলের পতিত জমিগুলো এখন বিভিন্ন প্রভাবশালীদের বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, ২০২৪ সালে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে নতুন আরও অনেক অবৈধ নির্মাণ শুরু হয়েছে। রাতারাতি বাজার, মার্কেট, আবাসিক কলোনি এবং অন্যান্য বাণিজ্যিক স্থাপনা গড়ে ওঠার ঘটনা বেড়ে গেছে।

রেলওয়ের ভূ-সম্পত্তি বিভাগ ও স্থানীয় কানুনগো কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, রূপসা থেকে ফুলতলা পর্যন্ত রেলওয়ের মোট জমির পরিমাণ ১৪ হাজার ১৩৩ একর। এর মধ্যে ৪৬৪ দশমিক ৪০ একর জমি রেলস্টেশন, কারিগরি ও অন্যান্য কাজে নিবেদিত। বাণিজ্যিকভাবে ইজারা দেওয়া জমির পরিমাণ ১৬ দশমিক ৮৯ একর, আর কৃষি এবং জলাশয় হিসেবে রয়েছে ২১৬ দশমিক ৪০ একর জমি। এছাড়া ৬১৫ দশমিক ৮২ একর জমি অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। রেলওয়ের হিসাব অনুযায়ী ৭৬ দশমিক ০৫ একর জমি অবৈধ দখলে থাকলেও স্থানীয়দের দাবি, প্রকৃত দখলকৃত জমির পরিমাণ অনেক বেশি।

শহরের বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে দেখা গেছে, খুলনা মহানগরী এবং আশপাশের এলাকায় তিনটি মূলভাবে রেলের জমি দখল করা হচ্ছে। প্রথমত, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও প্রভাবশালীরা অবৈধভাবে বাণিজ্যিক মার্কেট ও দোকান তৈরি করছেন। দ্বিতীয়ত, আবাসিক প্লট নির্মাণ করে সেগুলি বিক্রি করা হচ্ছে। তৃতীয়ত, পুকুর ও জলাশয় দখল করে মাছ চাষের জন্য অথবা ভরাট করে স্থাপনা নির্মাণ করা হচ্ছে।

নগরীর পাওয়ার হাউস মোড়ে বিশিষ্ট এরশাদ শিকদারের পুরনো ‘সাদ মনি মার্কেট’-এর জায়গায় নতুন মার্কেট নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া পুরানো রেলস্টেশনের সামনে সেনাবাহিনীর মালামাল নামানোর জন্য বরাদ্দকৃত স্থানে কমপক্ষে ১২টি নতুন পাকা দোকান নির্মাণ করে ভাড়া দেওয়া হয়েছে। নগরীর ৬ নম্বর ঘাট এলাকায় কেসিসির পার্কের কাছে অর্ধশতাধিক ব্যবসায়িক স্থাপনা গড়ে উঠেছে।

অন্যদিকে, জোড়াগেটের মন্টুর কলোনির এলাকায় রেলের জমি অবৈধভাবে প্লট আকারে ভাগ করে বিক্রি করা হচ্ছে। রেলওয়ে কলোনির ভেতরে কিছু পুকুরও দখল করে মাছ চাষ করছে। অনেক ক্ষেত্রে আবর্জনা ফেলে জলাশয় ভরাট করে স্থাপনা নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, কানুনগো কার্যালয়ের কিছু অসৎ কর্মকর্তারা আর্থিক সুবিধা নিয়ে দখলদারদের নির্মাণ কর্মকাণ্ডে পরোক্ষ সহায়তা করছেন। ফলে বারবার অভিযোগ ওঠা সত্ত্বেও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব হচ্ছে না।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ে (পশ্চিমাঞ্চল) পাকশী বিভাগের ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তা আরিফুল ইসলাম বলেন, “অবৈধ দখলদারদের চিহ্নিত করে ধাপে ধাপে নোটিশ দেওয়া হচ্ছে। ২০২৪ সালের শেষের দিকে মন্ত্রণালয়ের কঠোর নির্দেশনার পরও স্থানীয় সমস্যা-এর কারণে উচ্ছেদ কার্যক্রম সম্পন্ন হয়নি। তবে সরকার থেকে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট ও উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।”
রেলওয়ের বৃহৎ ভূখণ্ড দীর্ঘকাল ধরে অবৈধভাবে দখল হয়ে থাকার কারণে সরকারি সম্পদের রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুনভাবে সংশয় সৃষ্টি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত ও কার্যকরভাবে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা না করা এবং দখলদারদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত পদক্ষেপ না নিলে রেলওয়ের বাকি জমিগুলোও দখল মুক্ত রাখা কঠিন হয়ে যাবে।