বাগেরহাট প্রতিনিধি
দারিদ্র্যের কবলে সব কিছু হারিয়েছেন, শেষ আশ্রয় এখন রেললাইন। জমি তাদের বাড়ি আর আকাশ তাদের সুরক্ষার ছাদ। দুই সন্তান নিয়ে কঠোর পরিশ্রম করছেন তিনি। শেষমেষ মাথার চুল বিক্রি করে ঘরভাড়া দিয়েছেন একটি নারী।
বলছি বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার সন্তোষপুর গ্রামের রেললাইনের কাছে খোলা আকাশের নিচে থাকা রেহানা খাতুনের গল্প।দুই সন্তানের জন্য তার জীবন সংগ্রাম আবারো প্রমাণ করেছে, মাতৃত্বের শক্তির কাছে পৃথিবীর সব দুঃখ যেন অর্থহীন।
জানা গেছে, রেহানা একটি ভাড়া ঝুপড়ি ঘরে থাকতেন। কিন্তু ভাড়া দিতে না পারায় তার আশ্রয় এখন রেললাইন। রেলব্রিজের পাশে সরকারি জায়গায় স্থানীয়দের সহায়তায় বাঁশ খাঁটিয়ে ঘর বানানোর চেষ্টা করছেন। কিন্তু যেখানে এক বেলার খাবার জোটেনা, সেখানে ঘর তো তাদের জন্য স্বপ্ন। কয়েক মাস ধরে বাঁশ খুঁটির উপস্থিতি থাকলেও মাথাগোঁজার জায়গা হয়নি। রূপান্তরিত উত্তাপ ও বৃষ্টির কান্না আসে যায়, কিন্তু হাসি তাদের জীবনে কি কখনো আসে?
ফেরদৌসী বেগম নামের এক নারী জানান, আশ্রয়ের অভাবে তিনি পার্শ্ববর্তী একটি বাড়িতে ছিলেন। যার ভাড়া ৫০০ টাকা দিতে চুল বিক্রি করেছেন রেহানা।
ফেরদৌসী বলেন, আমি একদিন হঠাৎ দেখলাম রেহানার মাথায় চুল নেই। আমি বললাম, “তোর চুল কি হয়েছে? “ তখন রেহানা কেঁদে বলল, “ও বু কাউরে কইওনা, আমি ঘরের ভাড়া দিতে ৫০০ টাকায় চুল বেচে দিয়েছি”।
এমন পরিস্থিতিতে স্থানীয়দের মতে, রেহানাকে সরকারি আবাসন প্রকল্পের সুবিধা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি সমাজের ধনী ও মানবিক মানুষদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন তারা। আবু তালেব শেখ নামের এক বয়োজ্যেষ্ঠ বলেন, রেহানার যে অবস্থা, তাতে সে একটা ঘর পেলে ভালো হবে, সরকারকে বলবো যেন দ্রুত একটা ঘর দেওয়া হয়।
এদিকে সরেজমিনে দেখা যায়, খুলনা মোংলা রেল লাইনের পাশের সন্তোষপুর গ্রায়ের প্রবেশ পথে একটি বাঁশের ফ্রেম রয়েছে। যেখানে রেহানা এবং তার দু সন্তানকে থাকার জায়গা দেওয়া যেতে পারে বলে জানান ওই গ্রামের মহিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, বাঁশের ফ্রেম তো আছে, এখন টিন এবং বেড়ার খরচ যোগাতে পারলেই রেহানার জন্য ব্যবস্থা হবে। তাই এলাকার ধনীদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
দুই সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে প্রতিদিন নতুন করে বেঁচে থাকার সংগ্রাম করেন রেহানা। রেল লাইনের পাশে দুঃসহ জীবনযাপন করছেন তিনি। তার স্বপ্ন খুব বড় নয়—মাথার ওপরে একটি টিনের ছাউনি, যেখানে বৃষ্টি হলে সন্তানদের ভিজতে হবে না এবং রাতে নিশ্চিন্তে ঘুমাবে এই নিষ্পাপ দুটি মুখ। ছোট দুটি বাচ্চার মাথা গোঁজার একটু জায়গা পেতে শেষ সম্বল মাথার চুল বিক্রি করেন রেহানা, সঙ্গে ক্ষুধার যন্ত্রণা তো আছেই।
রেহানা কান্নাভেজা কন্ঠে বলেন, দুই সন্তানের মুখের দিকে তাকাতে পারি না, একদিকে ঘর নেই, অন্যদিকে ক্ষুধার যন্ত্রণা। নিরুপায় হয়ে চুল বিক্রি করেন। তাই তিনি সরকার ও ধনীদের থেকে সাহায্য চান। নারীর গর্ব, তার শেষ সম্বল মাথার চুল বিক্রি করে দারিদ্র্যের কাছে হার মানলেও সন্তানদের প্রতি ভালোবাসা তাকে হারাতে পারেনি।
এখন প্রশ্ন একটাই—একজন মাকে আর কত ত্যাগ স্বীকার করতে হবে মাথা গোঁজার জন্য এক টুকরো জায়গা পেতে?

