মোহাম্মদ হোসাইন, টেকনাফ (কক্সবাজার) প্রতিনিধি:
গণতন্ত্রের ভিত্তি হচ্ছে জনগণের অভিব্যক্তির স্বাধীনতা, সরকারের প্রতি জবাবদিহি এবং তথ্য পাওয়ার অধিকার। এই তিনটি উপাদান কার্যকর রাখতে যে বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, তা হলো স্বাধীন সাংবাদিকতা। একজন স্বাধীন এবং দায়িত্বশীল মিডিয়া শুধু খবর প্রকাশ করে না, বরং রাষ্ট্র, প্রশাসন এবং সমাজের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমের নজরদারি করে জনগণের কাছে প্রকৃত তথ্য উপস্থাপন করে। এই কারণেই সাংবাদিকতাকে গণতন্ত্রের “চতুর্থ স্তম্ভ” হিসেবে গণ্য করা হয়।
বর্তমান বিশ্বের তথ্যপ্রযুক্তির ব্যাপক প্রসারের ফলে সংবাদ সংক্রমণে বিপুল পরিবর্তন ঘটে। সামাজিক মাধ্যম, অনলাইন নিউজ পোর্টাল এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের কারণে তথ্য এখন খুব দ্রুত মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। তবে এই তাড়াতাড়ি গতির যুগে সাংবাদিকতার স্বাধীনতা নতুন সুযোগ তৈরি করার পাশাপাশি বিভিন্ন চ্যালেঞ্জও হাজির করেছে। পরীক্ষিত তথ্য, গুজব, বিভ্রান্তিকারী প্রচারণা এবং রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে প্রায়শই মৌলিক সত্য লুকিয়ে যায়।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে স্বাধীন সাংবাদিকতা জনসাধারণের কণ্ঠস্বরের ভূমিকা পালন করে। প্রশাসন বা ক্ষমতায় থাকা ব্যক্তিদের ভুল সিদ্ধান্ত, দুর্নীতি, অনিয়ম অথবা মানবাধিকার লঙ্ঘনগুলো মিডিয়ার অনুসন্ধানী প্রতিবেদনগুলোর মাধ্যমে প্রকাশিত হয়। এর ফলে জনগণ সচেতন হয়ে ওঠে এবং জবাবদিহির পরিবেশ গড়ে ওঠে। তাই একটি মজবুত গণতন্ত্রের জন্য মিডিয়ার স্বাধীনতা সুরক্ষিত করা অত্যন্ত জরুরি।
বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশেও সাংবাদিকরা বিভিন্ন বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন। কখনো রাজনৈতিক চাপ, কখনো আর্থিক সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন, আবার কখনও নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি তাদের পেশাগত স্বাধীনতায় বিঘ্ন ঘটায়। অনেক সময় অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা করা দুরুহ হয়ে পড়ে। এর ফলে জনগণের জানার অধিকার ক্ষতির সম্মুখীন হয় এবং গণতান্ত্রিক কার্যক্রম দুর্বল হয়ে পড়ে।
তবে স্বাধীনতার সঙ্গে সাংবাদিকদের কর্তব্যও অতি গুরুত্বপূর্ণ। তথ্যের সত্যতা যাচাই করা, বস্তুনিষ্ঠতা, নৈতিকতা এবং জনগণের স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া সাংবাদিকতার মৌলিক নীতি। স্বাধীনতার অপব্যবহার বা পক্ষপাতিত্বকারী সংবাদ প্রকাশ জনগণের মিডিয়ার প্রতি আস্থা নষ্ট করে। তাই স্বাধীনতা ও দায়িত্ব—এ দুটি বিষয়ের সমন্বয় একটি সুস্থ মিডিয়া ব্যবস্থার জন্য মৌলিক।
বর্তমান পরিস্থিতিতে গণতন্ত্রকে আরও গতিশীল করতে স্বাধীন সাংবাদিকতার উন্নয়ন অপরিহার্য। মিডিয়াকে নির্ভয়ে এবং চাপমুক্ত অবস্থায় কাজ করার সুযোগ দিতে হবে, পাশাপাশি সাংবাদিকদের পেশাগত দক্ষতা এবং নৈতিকতার উন্নতির উপরেও গুরুত্ব প্রদান করতে হবে। কারণ সত্য এবং নির্ভরযোগ্য তথ্যের প্রবাহ যত বেশি শক্তিশালী হবে, গণতন্ত্র তত বেশি মজবুত এবং কার্যকর হবে।
স্বাধীন সাংবাদিকতা কেবল একটি পেশা নয়; এটি জনগণের অধিকার রক্ষায়, রাষ্ট্রের জবাবদিহি সুনিশ্চিত করতে এবং গণতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখতে একটি প্রধান শক্তি। তাই গণতন্ত্রের নিরাপত্তার জন্য স্বাধীন সাংবাদিকতার সংরক্ষণ ও বিকাশ আজকের সময়ের অপরিহার্য দাবি।
