শাহাদাত হোসেন রাসেল, নোয়াখালী প্রতিনিধিঃ
নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার সদ্য সাবেক সহকারী কমিশনার (ভূমি) রুবাইয়া বিনতে কাশেম। দায়িত্ব গ্রহণের এক বছর পূর্তি ও বিদায় উপলক্ষে দেওয়া একটি দীর্ঘ বার্তায় তিনি ভূমি অফিসকে দালালমুক্ত, ঘুষমুক্ত ও জনবান্ধব করতে যে উদ্যোগ নিয়েছেন এবং এক বছরে কি কি কাজ করেছেন তা তুলে ধরেছেন।
সোমবার (১৭ই আগষ্ট) সন্ধ্যায় একটি ফেইসবুক স্ট্যাটাসে রুবাইয়া বিনতে কাশেম বলেছেন, গত বছরের ঠিক এই দিনে কোম্পানীগঞ্জে সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছিলেন। দায়িত্ব নেওয়ার পর সেবা নেওয়া মানুষের সঙ্গে কর্মকর্তাদের দূরত্ব কমাতে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করেন।
ভূমি অফিসের বিভিন্ন স্থানে নোটিশ টাঙিয়ে অবৈধ লেনদেন থেকে বিরত থাকার এবং দালাল ছাড়া সেবা নেওয়ার বিষয়ে জনগণকে সচেতন করার উদ্যোগ নেন।
তিনি জানিয়েছেন, গত এক বছরে কয়েক হাজার নামজারি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত আবেদনকারীদের সামনে এসে এক দিনে প্রায় ২১ থেকে ৫৪টি নামজারি ও জমা খারিজ মামলার শুনানি করেছেন। সরকার নির্ধারিত ২৮ দিনের মধ্যে নামজারি শেষ করার চেষ্টা করেছেন বলেও জানাচ্ছেন।
এছাড়া ২০১৯ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত প্রায় ৩৫০-৪০০টি মিস কেস ও রিভিউ আবেদনের শুনানিও করেছেন। এর মধ্যে প্রায় ৬২টি মিস কেস চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী সপ্তাহে একদিন মিস কেস শুনানি হবার কথা থাকলেও তিনি প্রতিদিন ২ থেকে ৬টি মিস কেস শুনানির চেষ্টা করেছেন বলে জানিয়েছেন।
ভূমি অফিসকে দালালমুক্ত করার গুরুত্ব দিয়ে রুবাইয়া বিনতে কাশেম বলেছেন, জনগণ যাতে সরকার নির্ধারিত ১১৭০ টাকার সরকারি ফি দিয়েই নামজারি করতে পারেন, সে লক্ষ্যে কাজ করেছেন। শুনানির সময় সেবা নিতে আসা কাউকে অতিরিক্ত টাকা দিতে না হওয়ার জন্য সরাসরি সতর্ক করতেন। তার উদ্যোগের ফলে কিছু দালাল সেবা নিতে আসা মানুষের কাছ থেকে নেওয়া টাকা ফেরতও দিয়েছেন বলে দাবি করেন।
রুবাইয়া বলেন, দালালমুক্ত ও ঘুষমুক্ত ভূমি অফিস গড়ে তুলতে গিয়ে তাকে নানা ধরনের ষড়যন্ত্র ও প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হয়েছে। বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ ও নানা পরিস্থিতির সৃষ্টি হলেও তিনি সেগুলো মহান আল্লাহর ওপর ছেড়ে দিয়েছেন।
এক বছরের দায়িত্ব পালনের সময়ে অফিসের নির্ধারিত সময়ের বাইরেও সেবা দিতে থাকার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রতিদিন সকালে ৯টার আগে অফিসে যেতে চেষ্টা করেছেন। সন্ধ্যা ৬টা, ৭টা কিংবা রাত ৮টা পর্যন্ত সেবা নিতে আসা মানুষ তার কাছে সেবা পেয়েছেন।
তিনি জানান, গত এক বছরে প্রায় ২০০টি মোবাইল কোর্ট ও অভিযান পরিচালনা করেছেন। এর মধ্যে অবৈধ বালু উত্তোলন, ড্রাম ট্রাক চলাচল, ভেজাল খাদ্য, ফার্মেসিতে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে চিকিৎসাসেবা, লাইসেন্স ছাড়াই ব্যবসা, মাটির টপসয়েল কাটা, বাজার মনিটরিং এবং মাদকবিরোধী অভিযানের মতো বিভিন্ন কার্যক্রম ছিল। অফিস সময়ে জনগণের সেবা যেন বিঘ্নিত না হয়, তা জন্য অধিকাংশ মোবাইল কোর্ট বিকেলের, সন্ধ্যার বা রাতের সময়ে পরিচালনা করার চেষ্টা করেছেন বলেও জানিয়েছেন।
এছাড়া জাতীয় দিবস, বিভিন্ন সরকারি অনুষ্ঠান, অভিভাবক সমাবেশ, কুইজ ও বিতর্ক প্রতিযোগিতা, বিজ্ঞান মেলা, এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র বিতরণ, ম্যজিস্ট্রেসি দায়িত্ব পালন, নদীতে মাছের অভিযান, ভূমিহীনদের যাচাই-বাছাই, দখল পরিদর্শন, মব নিয়ন্ত্রণ, পূজার দায়িত্ব পালন এবং বিভিন্ন আন্দোলন-সমাবেশ নিয়ন্ত্রণসহ নানা সরকারি দায়িত্ব পালনের কথা উল্লেখ করেন।
জাতীয় নির্বাচন-২০২৬ উপলক্ষে কোম্পানীগঞ্জের ৭০টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ৬৮টি কেন্দ্র পরিদর্শন এবং নির্বাচনের দিন চর এলাহী ও চর ফকিরাতে ম্যজিস্ট্রেসি দায়িত্ব পালন করার কথাও জানান বিদায়ী এই কর্মকর্তা। সরকারের রাজস্ব সংগ্রহ নিয়ে কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছিলেন উল্লেখ করে রুবাইয়া বিনতে কাশেম গত তিন বছরের রাজস্ব সংগ্রহের তুলনামূলক চিত্র সংযুক্ত করার কথা জানান।
বিদায় বার্তায় কোম্পানীগঞ্জের মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তিনি বলেন, প্রবাসী সহ সকল স্তরের মানুষ তাকে যে পরিমাণ সহায়তা ও ভালোবাসা দিয়েছেন, তা তার কাছে অকল্পনীয়। একই সঙ্গে নোয়াখালী-৫ আসনের সংসদ সদস্য, দুইজন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, সাংবাদিক, শিক্ষক-শিক্ষিকাসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান তিনি।
রুবাইয়া বিনতে কাশেম বলেন, মানুষের প্রত্যাশা অনুযায়ী ন্যায্য কাজ করতে চেষ্টা করেছেন। সময়ের অভাব কিংবা নীতির বাইরে হওয়ায় যেসব অনুরোধ রাখতে পারেননি, সেজন্য দুঃখ প্রকাশ করেন তিনি।
বিদায়ী বার্তার শেষ অংশে কোম্পানীগঞ্জের মানুষের কাছে নিজের জন্য দোয়া চেয়ে তিনি বলেন, ভবিষ্যতের পথ চলা যেন মহান আল্লাহ সহজ করে দেন।

