দখল-দূষণে সংকুচিত নদী, করতোয়া–বাঙালীর অস্তিত্ব সংকট

দখল-দূষণে সংকুচিত নদী, করতোয়া–বাঙালীর অস্তিত্ব সংকট

বাধন কর্মকার কৃষ্ণ, বগুড়া প্রতিনিধি: নদী আছে, কিন্তু নেই তার প্রাণ। এক সময় যে করতোয়া ও বাঙালী নদী ছিল উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকার অবলম্বন, আজ সেই নদীগুলোই নাব্যতা সংকট আর দূষণের চাপে ধুঁকছে নিঃশব্দে। স্রোত হারিয়ে ফেলা এই নদী এখন যেন কেবলই স্মৃতির ভার বহন করছে।

বগুড়ার শেরপুর উপজেলার কাশিয়াবালা গ্রামের অমলেশ হাওয়ালদার ছোটবেলা থেকেই নদীর সঙ্গে বড় হয়েছেন। বাবার কাছেই শিখেছিলেন মাছ ধরা। করতোয়া আর বাঙালী নদী ছিল তার জীবনের অংশ, আয়ের উৎস। কিন্তু সময় বদলেছে। বর্ষা মৌসুমে কিছু মাছ মিললেও বছরের বড় একটা সময় নদী হয়ে পড়ে প্রায় মাছশূন্য। নাব্যতা সংকট আর দূষণের কারণে তার মতো অসংখ্য জেলের জীবিকা এখন অনিশ্চয়তায়।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বগুড়া কার্যালয়ের তথ্য বলছে, শেরপুর উপজেলার প্রধান দুটি নদী করতোয়া ও বাঙালী। করতোয়া নদীর উৎপত্তি গাইবান্ধার কাটাখালী নদী থেকে; প্রায় ১২৩ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে এটি শেরপুরের কল্যাণী ঘাট এলাকায় এসে বাঙালী নদীর সঙ্গে মিলেছে। অন্যদিকে বাঙালী নদী গাইবান্ধার আলাই নদী থেকে উৎপন্ন হয়ে প্রায় ২১৭ কিলোমিটার প্রবাহিত হয়ে সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জে গিয়ে ‘ফুলজোর’ নাম নেয় এবং শেষে হুরাসাগরে মিশে যায়।

বর্তমানে সরেজমিনে দেখা যায়, এক সময়ের প্রমত্তা এই নদীগুলো অনেক জায়গায় সরু, ভরাট এবং নাব্যতাহীন হয়ে পড়েছে। কোথাও কোথাও এতটাই সংকুচিত যে শুষ্ক মৌসুমে হেঁটে পার হওয়াও সম্ভব। খানপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা আলম প্রামাণিক বলেন, “আগে বড় বড় নৌকা চলত, এখন শুকনো মৌসুমে মানুষ হেঁটে নদী পার হয়।”

নদীর এই দুরবস্থার পেছনে যেমন প্রাকৃতিক পরিবর্তন রয়েছে, তেমনি রয়েছে মানুষের অসচেতনতা ও অব্যবস্থাপনা। শিল্পকারখানার বর্জ্য, পৌরসভার অনিয়ন্ত্রিত বর্জ্য ফেলা এবং কৃষিতে অতিরিক্ত রাসায়নিক ব্যবহারে নদীর স্বাভাবিক পরিবেশ ভেঙে পড়েছে। শেরপুর পৌর এলাকার বিপুলসংখ্যক মানুষের পয়োনিষ্কাশনের পানি সরাসরি করতোয়া নদীতে গিয়ে পড়ছে। পাশাপাশি আবর্জনা ফেলে নদীর অংশবিশেষ ভরাট করার অভিযোগও রয়েছে।

স্থানীয়ভাবে দই-মিষ্টির কারখানা, রেস্তোরাঁ, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বর্জ্যও নদীতে মিশছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এতে নদীর পানি দিন দিন আরও দূষিত হয়ে উঠছে।

উত্তর সাহাপাড়া এলাকার বাসিন্দা আশুতোষ সরকার বলেন, “কারখানার বর্জ্য আর ড্রেনের পানিতে করতোয়ার পানি একেবারে নষ্ট হয়ে গেছে। কিছুদিন আগে নদীতে মাছ ছাড়া হয়েছিল, কিন্তু পরদিনই সব মরে ভেসে ওঠে।”

বারদুয়ারী হাট এলাকার বাসিন্দা আকরাম শেখ জানান, এক সময় করতোয়া নদী ছিল গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। “ধান, গবাদিপশু, মাটির জিনিস, নারিকেল, সবই নৌকায় আনা-নেওয়া হতো। এখন নদী ভরাট হয়ে গেছে, নৌকা চলে না,” বলেন তিনি।

এদিকে স্থানীয়দের অভিযোগ, শেরপুরের এসআর কেমিক্যাল লিমিটেড ও মজুমদার প্রডাক্টস নামের দুটি প্রতিষ্ঠানের বর্জ্য সরাসরি করতোয়া ও বাঙালী নদীতে ফেলা হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ এলাকায় প্রবাহিত ফুলজোর নদীতেও, যেখানে এ নিয়ে আন্দোলনের কথাও শোনা যাচ্ছে। তবে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

মজুমদার প্রডাক্টসের এইচআর অ্যাডমিন রঞ্জন চক্রবর্তী বলেন, “ইটিপিতে পরিশোধনের পরই নদীতে পানি ছাড়া হয়, তাই দূষণের প্রশ্ন নেই।”
এসআর কেমিক্যাল লিমিটেডের কেমিস্ট ফারুখ আকন্দ জানান, “আমাদের অধিকাংশ বর্জ্য পুনঃব্যবহার বা বিক্রি করা হয়। অবশিষ্ট অংশ ইটিপিতে পরিশোধন করে পুনরায় ব্যবহার করা হয়। নদীতে বর্জ্য ফেলার অভিযোগ সঠিক নয়।”

শেরপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মাহমুদুল হাসান বলেন, “নাব্যতা সংকট ও দূষণের কারণে করতোয়া ও বাঙালী নদী এখন প্রায় মৃতপ্রায়। পানি উন্নয়ন বোর্ড, জেলা প্রশাসন ও পৌরসভাসহ সংশ্লিষ্টদের সমন্বিত উদ্যোগ থাকলে নদীগুলোকে আবারও আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *