রাকিবুল হাসান, শ্যামনগর প্রতিনিধি:
শ্যামনগর উপজেলার মুন্সীগঞ্জ জেলেখালী এলাকার প্রায় ২৫ একর কৃষিজমির মধ্যে একটি খাল বেসরকারি উদ্যোগের মাধ্যমে খনন করা হয়েছে।
খালটি খনন শেষ হওয়ার আগেই স্থানীয় দখলদাররা পুনরায় মাছ ছাড়া দিয়ে খালটি দখল করে নিয়েছে বলে অভিযোগ করেন স্থানীয় অধিবাসীগণ।
এলাকার কৃষকরা জানিয়েছেন, মাটির নিচে লবণাক্ত পানি থাকার কারণে আমন মৌসুমের শস্য চাষ করতে পারছেন তারা। কৃষকেরা একক ফসলের ওপর নির্ভরশীল হয়ে জীবিকা নির্বাহ করে থাকেন। বছরের অন্যান্য সময় দিনমজুরির জন্য শহরের ইটভাটাসহ বিভিন্ন স্থানে যেতে হয়। অঞ্চলে মিষ্টি পানির অভাবের ফলে কৃষকরা শুধু আমন ধানই চাষ করেন।
জেলেখালী খালের ব্যাপারে বোরো মৌসুমে ২ থেকে ৩ ফুট পানি থাকার কথা বলা হচ্ছে, কিন্তু বেশি সময় পানি সঙ্কটের মুখোমুখি হয়ে অনেক সময় দুই ফসল ফলানোর সুযোগ হয়ে ওঠেনা। যার ফলে অনেক বোরো ফসলের নষ্ট হতে দেখা যায়।
গ্রাম দিয়ে বয়ে যাওয়া জেলেখালী খালটির দীর্ঘতা ২.২ কিমি। স্থানীয় কৃষকেরা জানান, সেই খালটি খনন করা হয়েছে।বর্ষাকালে কৃষি জমির পানি নিষ্কাশনের জন্য খালটির উন্মুক্ত থাকা কতটা প্রয়োজনীয়। কিন্তু খালটি ভরাট হয়ে যাওয়ার কারণে প্রতিবছর জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে, ফলে পানি নিষ্কাশন না হলে গত কয়েক বছর ফলন ও বীজতলায় ব্যাপক ক্ষতির কারণ হয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে খালের পানি না থাকায় বেশিরভাগ স্থান খালি থাকে, এই অবস্থায় এলাকাবাসী ও স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ খালটি খোলা রাখার দাবিতে জেলেখালী গ্রামের স্থানীয় জনগণ স্বাক্ষর করে উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের কাছে তাদের প্রত্যাশা তুলে ধরে।
জনগণের দাবি অনুসারে প্রশাসন ও বেসরকারি সংগঠনের প্রতিনিধি খাল খননের পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। যার দাগ নম্বর ২৩৯, ২৮১ এবং জনগণের দাবি ও আইনগত মতামতের ভিত্তিতে উপজেলা প্রশাসনের অনুমতি নিয়ে, সুইডেনের দূতাবাস ঢাকা কর্তৃক অর্থায়িত সিএনআরএস-বিফরআরএল প্রকল্পের মাধ্যমে এই খালটির পুনঃখননের কাজ শুরু হলো।
এই খাল খননের উদ্বোধন করেন মাননীয় সাংসদ আলহাজ্ব গাজী নজরুল ইসলাম।
খালখননের কাজ শুরু হলে পূর্বের দখলদার ইসাক আলী পাড় ও তার সহযোগী সুশান্ত সরদার, অরুণ সরদার, দীপাঞ্জন মন্ডল এবং আরও কিছু ভূমি দখলকারী স্থানীয় মানুষদের হুমকি দিয়ে খালের খনন প্রক্রিয়ার শেষের দিকে কিছু রুই জাতের মাছের পোনা ছেড়ে দেয়।
ফলে স্থানীয় জনসমাজে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। খাল খননের প্রকল্পের বাস্তবায়নের বিষয়টি স্থানীয় জনগণ সুধীজন ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের কাছে তুলে ধরা হয়। এলাকার মানুষের সঙ্গে স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিরাও খালটি উন্মুক্ত রাখার জন্য মাননীয় সংসদ সদস্যের কাছে লিখিত আবেদন জানান। পাশাপাশি শ্যামনগর উপজেলা প্রশাসন, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও উপজেলা নেতৃবৃন্দ জেলা প্রশাসক, সহকারী কমিশনার ভূমির কাছে খাল মুক্ত রাখার জন্য আবেদন পাঠান।
এক প্রশ্নের উত্তরে বসতিপ্রধান ইসহাক আলী পাড় জানালেন, এই খালের মাছ বিক্রির আয়ের একটি অংশ কিছু রাজনৈতিক ও একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য যায়। তবে তিনি বলেন, ব্যক্তিগত কোনো কাজের জন্য তিনি এর অর্থ ব্যবহার করেন না এবং তার সৃষ্টিকর্তা তাকে অনেক কিছু দিয়েছেন। খাল মুক্ত থাকলে সবাই সমর্থন করে, কিন্তু আইনগত প্রক্রিয়াটিতে অন্তরায় রয়েছে।খালটি উন্মুক্ত থাকলে আমাকে স্বাক্ষর দিতে হবে। আইনগত প্রক্রিয়া যদি বন্ধ হয়ে যায়, তবে আমাকে ১৫ দিন বা এক মাসের মধ্যে মাছগুলো ধরার সুযোগ দেওয়া হলে আমি সফল হব। এই অঞ্চলের সকল ধর্মের মানুষ, হিন্দু-মসলিম, আমার বন্ধু ও আত্মীয়বৃন্দ খালের সঙ্গে যুক্ত। তাদের ক্ষতি না করে সামঞ্জস্য ও সমন্বয়ের কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু খালের আয় যে সংস্থাকে দেওয়া হচ্ছিল, তা আর পাবে না।
আইনের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি বলেন, একটি নির্দিষ্ট কোটায় একটি ইঞ্জেকশন রয়েছে এবং তার কাগজপত্র যতদিন রায় এখানকার সমস্যার সমাধান না হবে, ততদিন সম্পর্কের উন্নতি যাতে টিকে থাকে সেদিকে নজর দেব।
খালপাড়ের বাসিন্দা ধনঞ্জয় গায়েন জানান, এই খাল আমাদের জন্য পানি নিষ্কাশনের একমাত্র উপায়। অনেক খাল খনন করা হয়েছে যাতে এলাকার কৃষকেরা সবাই বোরো ধান চাষ করতে পারেন। এই খালের খননের জন্য আমাদের কৃষকদের কাছ থেকে গণস্বাক্ষর সংগ্রহ করা হয়েছে যাতে খালের স্বচ্ছতা বজায় থাকে এবং খালের পাড়ে আমাদের জমিতে মাটি রাখতে সক্ষম হই। কৃষি জমিতে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ বিঘা জায়গায় মাটি ফেলা হয়েছে, যা আমাদের কৃষকদের স্বার্থের পাশাপাশি খালটিকে উন্মুক্ত রাখার জন্য অত্যাবশ্যক।
কৃষাণী ফুলমতি মিস্ত্রি বলেন, যদি এই খাল দখল বা ইজারা থাকে তবে স্থানীয় কৃষকেরা খালের জলটির এক ফোঁটাও ব্যবহার করতে পারবেন না। আমরা এখন মাছ ধরছি, শত শত কৃষক এবং কৃষাণীরা হলেও মাছ ধরার সুযোগ তো দূরের কথা, এক ফোঁটা পানি ব্যবহারের সুযোগও মেলেনা।
জেলেখালির গ্রামের ইউপি সদস্য দেবাশিষ গায়েন জানান, উপজেলা প্রশাসন, স্থানীয় প্রশাসন এবং ইউনিয়ন পরিষদের সকলের সহযোগিতায় খালটি খনন করা হয়েছে। আমরা খালটি উন্মুক্ত রাখার জন্য সবরকম প্রচেষ্টা চালাচ্ছি। যদি এই খাল দখল হয়ে যায় তাহলে এলাকার কৃষকদের ব্যাপক ক্ষতি হবে এবং পানি নিষ্কাশনের ক্ষেত্রে গুরুতর হুমকির মুখে পড়বে।

