মোঃ আলমগীর হোসাইন, স্টাফ রিপোর্টার:
রংপুরে প্রায় ৩১ কোটি টাকা খরচে নির্মিত ১০০ শয্যার আধুনিক শিশু হাসপাতালটি ছয় বছর পেরিয়েও সম্পূর্ণরূপে চালু হয়নি।
অত্যাধুনিক অবকাঠামো ও বিশালমূল্যের চিকিৎসা সরঞ্জাম থাকা সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় কর্মীর অভাব এবং প্রশাসনিক জটিলতার কারণে হাসপাতালটি কার্যত অচল রয়েছে। এর ফলে উত্তরাঞ্চলের লক্ষাধিক শিশুর বিশেষায়িত চিকিৎসার আশা এখনও পূর্ণ হয়নি।
রংপুর শহরের পুরাতন সদর হাসপাতাল এলাকার স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে এই হাসপাতালটির নির্মাণ কাজ ২০২০ সালে শেষ হয়। বহুতল ভবনটিতে শিশুর আধুনিক চিকিৎসার জন্য আইসিইউ, বিশেষ ওয়ার্ড, চিকিৎসক এবং কর্মচারীদের জন্য ডরমেটরি এবং অন্যান্য অপরিহার্য সুবিধা থাকার পরেও, এটি দীর্ঘদিন ধরে অব্যবহৃত অবস্থায় রয়েছে।
করোনা মহামারির সময় ২০২১ সালে হাসপাতালে সাময়িকভাবে ‘করোনা ডেডিকেটেড স্পেশালাইজড হাসপাতাল’ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল। সেই সময়ে ১৫ শয্যার আইসিইউসহ প্রায় ৩০টি শয্যায় চিকিৎসা সেবা প্রদান করা হয়। তবে করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে হাসপাতালের কার্যক্রম আবারও থেমে যায়। গত চার বছর ধরে ভবনটি প্রায় পরিত্যক্ত ধারণায় রয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে সরেজমিন পরিদর্শন করে দেখা যায়, ঝকঝকে আধুনিক ভবনের ভেতরে রোগীদের কোন আড্ডা কিংবা চিকিৎসার ক্ষেত্রে কোন কাজ করছে না। হাসপাতালের বিভিন্ন ইউনিটে পড়ে থাকা অত্যাধুনিক চিকিৎসা যন্ত্রপাতি দীর্ঘ সময় ধরে অচল ও ব্যবহার না হওয়ার কারণে ক্ষয়িষ্ণু হওয়ার আশঙ্কা বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষভাবে আইসিইউ ইউনিটের দামি সরঞ্জামগুলো রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অকেজো হয়ে পড়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, হাসপাতালটি চালু করতে বিপুল সংখ্যক চিকিৎসক, নার্স, প্রযুক্তিবিদ, আয়া এবং পরিচ্ছন্নতাকর্মী প্রয়োজন। প্রয়োজনীয় কর্মী নিয়োগ এবং প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে উঠতে পারেনি, যা হাসপাতালটি চালুর পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমনকি বর্তমানে সমস্ত কার্যক্রম শুরু হলে হাসপাতালটিকে সম্পূর্ণরূপে সচল করতে অন্তত এক বছর লাগতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অভিমত।
রংপুর বিভাগের স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সরকার প্রধান তারেক রহমানের নির্দেশের পর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় হাসপাতালটির বর্তমান অবস্থা, জনবল এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের চাহিদা সম্পর্কে তথ্য জানতে চেয়েছে। ইতোমধ্যে বিভাগীয় স্বাস্থ্য অফিস থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য ও চাহিদাপত্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
রংপুর বিভাগের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক ডা. ওয়াজেদ আলী বলেন,
সরকারপ্রধানের নির্দেশনার পর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে একটি নির্ধারিত ফরমেট অনুযায়ী তথ্য চাওয়া হয়েছিল। আমরা প্রয়োজনীয় জনবল এবং সরঞ্জামের চাহিদাসহ সকল তথ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি। আশা করছি, দ্রুত হাসপাতালটির কর্মকাণ্ড শুরু করার জন্য ইতিবাচক সিদ্ধান্ত আসবে।
অন্যদিকে, রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগে রোগীর চাপ ক্রমশ বাড়ছে। হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আশিকুর রহমান জানান, শিশু ওয়ার্ডের ধারণক্ষমতার কয়েক গুণ বেশি রোগী ভর্তি থাকার কারণে অনেক সময় এক বিছানায় দুই থেকে তিনজন শিশুকে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। সংক্রামক রোগে আক্রান্ত শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত আইসোলেশন সুবিধার অভাবও রয়েছে।
তিনি বলেন, বিশেষায়িত ১০০ শয্যার শিশু হাসপাতালটি চালু হলে উত্তরাঞ্চলের শিশুদের আধুনিক চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা সহজ হবে। পাশাপাশি রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপর অতিরিক্ত চাপও অনেকাংশে কমে আসবে।
স্থানীয় সমাজ সচেতন মহল প্রশ্ন তুলছে, কোটি কোটি টাকার খরচে নির্মিত একটি বিশেষায়িত হাসপাতাল বছরের পর বছর বন্ধ থাকবে কেন, দ্রুত জনবল নিয়োগ ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে হাসপাতালটি চালুর দাবি জানাচ্ছেন অভিভাবক এবং স্বাস্থ্যসেবা প্রত্যাশীরা।
