ইলিয়াস হোসেন মাঝিঃ
বাংলাদেশে প্রতি বছর সড়ক দুর্ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে কেন? এর কারণ কি আইনের দুর্বলতা, জনগণের অবহেলা, নাকি চালকদের অতি গতির কারণে?
প্রতিদিন খবরের কাগজ খুললেই বা সোশ্যাল মিডিয়ায় নজর রাখলেই যে খবরটি আমাদের সচরাচর বিস্মিত করে তা হলো সড়ক দুর্ঘটনা। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় বরং এটি একটি মারণ ফাঁদ। প্রতিদিন নিয়মিতভাবে কারো না কারো বাবা-মা, ভাই-বোন, ছেলে-মেয়ে, স্বামী-স্ত্রী অথবা আত্মীয়-স্বজন সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যাচ্ছেন। কেড়ে নেওয়া হচ্ছে কারো উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ, কেউ হারাচ্ছেন কর্মক্ষমতার শেষ সম্ভল। আমরা কি কখনো ভেবে দেখেছি যে এই মৃত্যুর জন্য দায়ী কে?
মহাসড়কে যেভাবে দুর্ঘটনা ঘটছে এবং দুর্ঘটনার সংখ্যা যেভাবে বাড়ছে, তা যদি দ্রুত রোধ করার বিষয়ে কার্যকর ও যথাযথ ব্যবস্থা না নেয়া হয় বা যথাযথ সতর্কতা না অবলম্বন করা হয় তাহলে আগামীতে সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যা ও হতাহতের হার আরো বাড়বে। সড়কে অকাল মৃত্যু শুধু একজনের নয় বরং পুরো পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রের উন্নয়নের জন্য ক্ষতি।
এই দুর্যোগ হঠাৎ করে আসেনি। অনেক বছর ধরেই আমাদের জীবনে নিয়মিত হয়ে উঠেছে। সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতের সংখ্যা আমাদের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। মানুষ মরছে, আমরা শিরোনাম দেখছি, আবার মানুষ মরছে, আবার শিরোনাম হচ্ছে। আমাদের রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান, সমাজ, পরিবার সবাই মৃত্যুর এই ঘটনার সাথে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। এটাই সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয়। আমাদের মন যেন এতটাই অনুভূতীনির্ভর হয়ে গেছে যে, আমরা বুঝতেই পারি না চেষ্টা করলে আমরা এই ব্যক্তিদের বাঁচিয়ে রাখতে পারতাম।
আমরা এই মৃত্যু মেনে নিয়েছি, কারণ যারা মারা যান তারা বেশিরভাগই সাধারণ মানুষ – শ্রমিক, শিক্ষার্থী, নিম্ন মধ্যবিত্ত, গ্রাম থেকে শহরে কাজ খুঁজতে আসা, মোটরসাইকেল চালক, বাসে করে বাড়ি ফেরত যাওয়া মানুষ। এই মৃত্যুর খবর হচ্ছে কিন্তু আমরা শোকাহত হচ্ছি না। নীতিনির্ধারক ও আইন প্রয়োগকারীদের মনে কোন প্রভাব ফেলে না। মৃত্যুগুলো অদ্ভুতভাবে অবহেলিত থাকে। প্রতি মাসে প্রায় একই সংখ্যায় মানুষ মারা যাচ্ছে কিন্তু আমরা নিশ্চুপ।
সড়ক দুর্ঘটনা কেবল দুর্ঘটনা নয়, এটি অনেক ক্ষেত্রে হত্যাকাণ্ড। যেমন অপরিকল্পিত রাস্তা, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, অদক্ষ বা লাইসেন্সবিহীন চালক এবং ট্রাফিক আইন অমান্য করার প্রবণতা। এসবই আমাদের নিয়মিত মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে। মহাসড়কে দ্রুত গতির গাড়ি, ওভারটেকিংয়ের অস্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার শিথিলতা এই পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে।
প্রতিটি দুর্ঘটনার পরে তদন্ত কমিটি গঠিত হয়। দীর্ঘশ্বাস ফেলা হয়, মানববন্ধন হয়, কিন্তু কার্যত কিছুই হয় না। বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে অপরাধীরা পার পেয়ে যায় আর সাধারণ মানুষ সড়কে রক্ত দিয়ে যায়।

