সিলেট প্রতিনিধি:
রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথমবারের মতো এক দিনের সরকারি সফরে মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) সিলেটে এসেছেন বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। হযরত শাহজালাল (রহ.) ও হযরত শাহপরান (রহ.)-এর মাজার জিয়ারত, রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতা, সিলেট সিটি করপোরেশনের নাগরিক সংবর্ধনা এবং সিলেটের উন্নয়ন ও গণতন্ত্র নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্যের মধ্য দিয়ে ব্যস্ত একটি দিন কাটিয়েছেন তিনি। রাতেই ঢাকার উদ্দেশে সিলেট ছাড়ার কথা রয়েছে রাষ্ট্রপতির।
নির্ধারিত সফরসূচি অনুযায়ী সকালে ঢাকা থেকে সিলেটের উদ্দেশে রওনা হন রাষ্ট্রপতি। তবে মাঠপর্যায়ের প্রতিবেদনে দেখা যায়, সকাল ১১টা ২৭ মিনিটে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর বিশেষ ফ্লাইটে সিলেট এমএজি ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেন তিনি।
বিমানবন্দরে রাষ্ট্রপতিকে স্বাগত জানান বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, শ্রম ও প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি ও সিসিক প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী, জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও সংসদ সদস্য এমরান আহমদ চৌধুরী, মহানগর বিএনপির সভাপতি নাসিম হোসাইন, সাধারণ সম্পাদক এমদাদ হোসেন চৌধুরী, সিলেটের জেলা প্রশাসক আব্দুল্লাহ আল মামুনসহ রাজনৈতিক ও প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
বিমানবন্দর থেকে মোটরকেডযোগে রাষ্ট্রপতি সিলেট সার্কিট হাউসের উদ্দেশে রওনা হন।
সিলেট সার্কিট হাউসে পৌঁছানোর পর রাষ্ট্রপতিকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গার্ড অব অনার গ্রহণ করেন। রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে তিনি পরবর্তী কর্মসূচিতে অংশ নেন।
সার্কিট হাউস থেকে রাষ্ট্রপতি প্রথমে হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজারের উদ্দেশে রওনা হন। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে মাজারে পৌঁছে তিনি জিয়ারত করেন, তাসবিহ পাঠ করেন এবং দেশ ও জনগণের শান্তি, অগ্রগতি ও সমৃদ্ধি কামনা করে মোনাজাত করেন।
এরপর তিনি হযরত শাহপরান (রহ.)-এর মাজারে যান। নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী দুপুর ১টা ২৫ মিনিটের দিকে সেখানে পৌঁছে জিয়ারত করেন রাষ্ট্রপতি। দুই মাজার জিয়ারত শেষে তিনি সিলেট সার্কিট হাউসে ফিরে আসেন।
মাজার জিয়ারত শেষে সার্কিট হাউসে রাষ্ট্রপতির জন্য সিলেটের স্থানীয় ঐতিহ্যকে গুরুত্ব দিয়ে দুপুরের খাবারের আয়োজন করা হয়।
রাষ্ট্রপতির দুপুরের খাবারের তালিকায় ছিল সাতকরা দিয়ে খাসির মাংস, পাবদা মাছের তরকারি, কাতলা মাছের তরকারি, চিংড়ি ছাড়া লাউয়ের তরকারি, মুরগির তরকারি, আলু ভর্তা ও টাকি মাছের ভর্তা—মোট সাত পদ। সিলেট জেলা প্রশাসনের সহকারী কমিশনার রেজা ই রাব্বি খাবারের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
দুপুরের কর্মসূচি শেষে বিকেল ৩টা ২৫ মিনিটে সার্কিট হাউস থেকে সংবর্ধনাস্থলের উদ্দেশে রওনা হন রাষ্ট্রপতি। বিকেল ৩টা ৪০ মিনিটের দিকে তিনি সিলেট সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে নগর ভবন প্রাঙ্গণে আয়োজিত নাগরিক সংবর্ধনা ও সুধী সমাবেশে পৌঁছান।
রাষ্ট্রপতিকে স্বাগত জানান সিসিক প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী, সিসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ রেজাই রাফিন সরকার, বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির ও শ্রম ও প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীসহ সংশ্লিষ্টরা।
অনুষ্ঠানে মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, রাজনৈতিক নেতা, জনপ্রতিনিধি, প্রশাসনের কর্মকর্তা, পেশাজীবী, ব্যবসায়ী, সাংবাদিক ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিশিষ্ট নাগরিকরা উপস্থিত ছিলেন। জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়।
নাগরিক সংবর্ধনায় সিলেট সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রপতিকে সিলেটের ঐতিহ্যের স্মারক হিসেবে শীতল পাটি, চা গাছের রেপ্লিকা ও চা পাতা উপহার দেওয়ার আয়োজন করা হয়। রাষ্ট্রপতির স্ত্রী ফার্স্ট লেডির জন্য রাখা হয় মণিপুরী শাড়ি।
সিসিকের পক্ষ থেকে জানানো হয়, স্থানীয় ঐতিহ্য, চা-শিল্প, লোকজ সংস্কৃতি ও মণিপুরী সম্প্রদায়ের তাঁতশিল্পকে তুলে ধরতেই এসব উপহার নির্বাচন করা হয়েছে।
নাগরিক সংবর্ধনায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম ও ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত গণতান্ত্রিক পরিবেশকে এখন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া এবং তা রক্ষা করাই দেশের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।
তিনি বলেন, শুধু নির্বাচন আয়োজন করলেই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয় না; গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর করতে হয়। সংসদকে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে এবং সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও তা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে হবে।
রাষ্ট্রপতি বলেন, আগামী দিনের বড় দায়িত্ব হচ্ছে দেশ পুনর্গঠন, গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য দেশ গড়ে তোলা।
জাতীয় স্বার্থে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্যের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি। পাশাপাশি বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রশংসা করে এই সম্প্রীতি ও ঐক্য ধরে রাখার আহ্বান জানান।
রাষ্ট্রপতির বক্তব্যে উঠে আসে সিলেটের সমৃদ্ধ ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য। তিনি হাসন রাজা, রাধারমণ দত্ত, শাহ আবদুল করিম, হেমাঙ্গ বিশ্বাস ও সৈয়দ মুজতবা আলীর মতো গুণী ব্যক্তিত্বদের স্মরণ করেন। মুক্তিযুদ্ধে সিলেটের গুরুত্বপূর্ণ অবদানের কথাও তুলে ধরেন তিনি।
সিলেটের মানুষের অতিথিপরায়ণতা ও শান্তিপ্রিয়তার পাশাপাশি অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার ঐতিহ্যেরও প্রশংসা করেন রাষ্ট্রপতি।
সিলেটের সঙ্গে নিজের দীর্ঘ রাজনৈতিক সম্পর্কের কথাও স্মরণ করেন তিনি। অতীতে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে সঙ্গে নিয়ে সিলেটে বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া এবং গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সিলেটবাসীর ভূমিকার কথাও তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে।
নাগরিক সংবর্ধনায় বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির সিলেটের উন্নয়নে নেওয়া বিভিন্ন প্রকল্পের কথা তুলে ধরেন।
তিনি জানান, সিলেট বিভাগের গ্রামীণ সড়ক উন্নয়নে ৩২৬ কোটি টাকার একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটি অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। অনুমোদন হলে চলতি শীত মৌসুমেই বিভিন্ন এলাকায় গ্রামীণ সড়কের উন্নয়নকাজ ব্যাপকভাবে শুরু করার আশা রয়েছে।
নগরের দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। প্রকল্পটির বৈদেশিক অর্থায়নের অনুমোদন পাওয়া গেছে এবং শিগগিরই কাজ শুরু হবে বলে আশা প্রকাশ করেন।
এ ছাড়া সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের ছয় লেনের উন্নয়নকাজ এগিয়ে চলছে এবং ২০২৮ সালের মধ্যে কাজ শেষ করার আশা রয়েছে বলে জানান বাণিজ্যমন্ত্রী। আখাউড়া-সিলেট রেললাইন উন্নয়ন এবং সিলেট-চট্টগ্রাম রেল যোগাযোগ উন্নয়নের বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানান তিনি।
নাগরিক সংবর্ধনায় শ্রম ও প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী সিলেটবাসী ও প্রবাসীদের বিভিন্ন প্রত্যাশা পূরণে রাষ্ট্রপতির সহযোগিতা কামনা করেন।
যোগাযোগব্যবস্থা, কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও অন্যান্য উন্নয়ন খাতে সিলেটবাসীর দীর্ঘদিনের প্রত্যাশার পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক প্রবাসীর বিভিন্ন দাবির কথাও তুলে ধরা হয়।
রাষ্ট্রপতির নাগরিক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে অংশ নেয়নি সিলেট মহানগর বিএনপি। যথাযথভাবে আমন্ত্রণ না পাওয়া এবং সংবর্ধনা আয়োজনের প্রক্রিয়া নিয়ে আপত্তির কথা জানিয়ে তারা অনুষ্ঠান বর্জন করে।
তবে দলটির পক্ষ থেকে এটিকে রাষ্ট্রপতির সফর বা তাঁর প্রতি অসম্মান হিসেবে নয়, বরং আয়োজকদের প্রক্রিয়া ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে আপত্তির কারণে নেওয়া সিদ্ধান্ত হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
রাষ্ট্রপতির সফরকে কেন্দ্র করে সিলেট নগরীতে নেওয়া হয় ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা। সফরের গুরুত্বপূর্ণ ভেন্যু ও কর্মসূচিকে ঘিরে মোতায়েন করা হয় বিপুলসংখ্যক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য।
সিলেট মহানগর পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, প্রায় ১ হাজার পুলিশ সদস্যের পাশাপাশি আরও ২০০ সদস্য অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করেন। এর বাইরে র্যাব, বিজিবি, বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা ও পুলিশের বিশেষ ইউনিটগুলোও নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিল। গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় পোশাকধারী ও সাদা পোশাকের সদস্য মোতায়েনের পাশাপাশি সিসিটিভির মাধ্যমে নজরদারির ব্যবস্থা রাখা হয়।
রাষ্ট্রপতির আগমন উপলক্ষে নগরের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, ডিভাইডার, কিন ব্রিজ, সার্কিট হাউস ও মাজার এলাকায় পরিচ্ছন্নতা ও সৌন্দর্যবর্ধন করা হয়।
নাগরিক সংবর্ধনা শেষে রাষ্ট্রপতির বিকেল ৫টা ১ মিনিটে সার্কিট হাউসের উদ্দেশে রওনা হয়ে ৫টা ৫ মিনিটে সেখানে পৌঁছানোর সূচি রয়েছে। এরপর সেখানে সাময়িক বিশ্রাম শেষে সন্ধ্যা ৭টা ৩০ মিনিটে ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা রয়েছে।
সফরসূচি অনুযায়ী, সন্ধ্যা ৭টা ৫৫ মিনিটে বিমানবন্দরে পৌঁছে রাত ৮টায় ঢাকার উদ্দেশে সিলেট ছাড়বেন রাষ্ট্রপতি। পরে রাত ৮টা ৪৫ মিনিটে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। সেখান থেকে বঙ্গভবনের উদ্দেশে রওনা হয়ে রাত সাড়ে ৯টার দিকে বঙ্গভবনে পৌঁছানোর মধ্য দিয়ে তাঁর এক দিনের সিলেট সফর শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।
রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের প্রথম সিলেট সফরে রাষ্ট্রীয় গার্ড অব অনার, দুই আউলিয়ার মাজার জিয়ারত, সিলেটের ঐতিহ্যবাহী খাবারে আপ্যায়ন, নাগরিক সংবর্ধনা, সিলেটের উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা এবং গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শক্তিশালী করার আহ্বান—সব মিলিয়ে দিনটি সিলেটের রাজনৈতিক ও নাগরিক পরিসরে বিশেষ তাৎপর্য বহন করেছে।

