সৈয়দ আমান উল্লাহ্, স্টাফ রিপোর্টারঃ
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার রাজকান্দি সংরক্ষিত বনাঞ্চলে বন বিভাগের একটি উচ্ছেদ অভিযানের ফলে বড় বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। অভিযানের সময়ে একটি পরিবারের প্রায় ১,২০০টি ফলন্ত কমলা গাছ কেটে ফেলার ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে বিভিন্ন জায়গায় চলছে তীব্র আলোচনা-সমালোচনা। কয়েক বছরের পরিশ্রমে গড়ে ওঠা একটি বাগান মুহূর্তেই নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা, পরিবেশ সচেতন মানুষ ও কৃষি সংশ্লিষ্ট অনেকে।
ভুক্তভোগী কৃষক পরিবারের দাবি, প্রায় আট বছর ধরে কঠোর পরিশ্রম ও প্রায় ২০ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে তারা এই কমলার বাগান তৈরি করেছিলেন। আর মাত্র কয়েক সপ্তাহ পরে গাছ থেকে কমলা সংগ্রহের মৌসুম শুরু হওয়ার কথা ছিল। ঠিক সেই সময়েই পরিচালিত হয় বন বিভাগের উচ্ছেদ অভিযান।
পরিবারটির অভিযোগ, বন বিভাগের কিছু কর্মকর্তা দীর্ঘদিন ধরে তাদের কাছে নানা উপায়ে আর্থিক সুবিধা দাবি করতেন। সম্প্রতি ১০ লাখ টাকা চাঁদা চাওয়া হয়েছিল। সেই টাকা দিতে না চাইলে আক্রোশে পুরো বাগান কেটে ফেলা হয়েছে বলে তারা অভিযোগ করেছেন।
ভুক্তভোগী কৃষকের স্ত্রী কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, “সরকার সবাইকে গাছ লাগাতে বলে, পরিবেশের কথা বলে। আমরা ঋণ করে গাছ লাগালাম, ফল ধরালাম। এখন সেই গাছ কেটে আমাদের পথে বসিয়ে দেওয়া হলো। আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ এখন অন্ধকার।”
এদিকে অভিযোগের বিষয়ে বন বিভাগ সম্পূর্ণ ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছে। রাজকান্দি রেঞ্জ কর্মকর্তা প্রীতম বড়ুয়া বলেন, উচ্ছেদ করা জমিটি সংরক্ষিত বনভূমির অংশ। সরকারি বনভূমি দখলমুক্ত করতে নিয়মিত উচ্ছেদ অভিযান চলছে এবং আইন অনুযায়ী অভিযান পরিচালিত হয়েছে। তিনি চাঁদার দাবির অভিযোগও অস্বীকার করেন।
তবে ঘটনাটি নিয়ে বেড়ে উঠেছে একাধিক প্রশ্ন। যদি জমিটি সরকারি বনভূমি হয়, তাহলে ফল সংগ্রহের জন্য একটু অপেক্ষা করা যেত না? কিংবা আদালতের নির্দেশনা বা বিকল্প কোনো উপায়ে কৃষকের ক্ষতি কমিয়ে উচ্ছেদ অভিযান করার সুযোগ ছিল কি না—এসব প্রশ্ন এখন স্থানীয়দের মুখে বলা হচ্ছে।
পরিবেশবিদদের কিছু অংশের মতে, বন রক্ষা যেমন সরকারের দায়িত্ব, তেমনি পরিবেশবান্ধব ফলের বাগান ধ্বংসের সিদ্ধান্তও যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা উচিত। কারণ একটি পরিপক্ব ফলের বাগান শুধু একজন কৃষকের আয়ের উৎস নয়; এটি পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও স্থানীয় অর্থনীতিরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, চাঁদার দাবির অভিযোগ এখনও কোনো সরকারি তদন্তে প্রমাণিত নয়। একইভাবে বন বিভাগের দাবি অনুযায়ী জমিটি সংরক্ষিত বনভূমি এবং উচ্ছেদ অভিযান আইনসম্মতভাবে পরিচালিত হয়েছে কি না, তা সংশ্লিষ্ট তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
এ নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা, মানবাধিকারকর্মী ও পরিবেশবাদীরা একটি স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও উচ্চপর্যায়ের তদন্তের দাবি করেছেন। তাদের বক্তব্য, যদি চাঁদার দাবির অভিযোগ সত্য হয়, তাহলে দায়ীদের আইনের আওতায় আনতে হবে। আবার যদি বন বিভাগের অভিযান পুরোপুরি আইনসম্মত হয়, তাহলে সেটিও তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়া উচিত।
ঘটনাটি এখন কেবল একটি বাগান ধ্বংসের অভিযোগের মধ্যে নেই; এটি বন সংরক্ষণ, কৃষকের অধিকার, প্রশাসনিক জবাবদিহিতা এবং মানবিকতার প্রশ্নও সামনে নিয়ে এসেছে। তদন্তের ফলই বলবে—এটি ছিল নিয়মিত উচ্ছেদ অভিযান, নাকি ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগের পিছনে রয়েছে অন্য কোনো বাস্তবতা।

