লবণাক্ততার বাধা পেরিয়ে কৃষিতে উদ্ভাবনের আলো ছড়াচ্ছে কয়রার শিক্ষার্থীরা

লবণাক্ততার বাধা পেরিয়ে কৃষিতে উদ্ভাবনের আলো ছড়াচ্ছে কয়রার শিক্ষার্থীরা

এসকে এম মহসিন রেজা,উপজেলা প্রতিনিধি (খুলনা):

সাগরের নিকটবর্তী লবণাক্ত অঞ্চলের নাম খুলনার কয়রা। জলবায়ু পরিবর্তন এবং লবণাক্ততার প্রভাবে এই এলাকার কৃষি সেক্টর দীর্ঘকাল ধরে বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। কিন্তু এই চ্যালেঞ্জই সম্ভাবনা  তৈরি করতে উদ্যত হয়েছে কয়রার যুব উদ্ভাবকরা।

কয়রায় অনুষ্ঠিত ‘স্টার্টআপ, সায়েন্স প্রজেক্ট অ্যান্ড ইনোভেশন আইডিয়া শোকেসিং প্রোগ্রাম’-এ শিক্ষার্থীদের একটি অসাধারণ উদ্যোগ সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। কৃষিতে লবণাক্ততা দূর করার মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধির বিষয়ে চিন্তা করে কয়রার বড়বাড়ি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকেরা তাদের উদ্ভাবনী প্রকল্পটি তৈরি করেছেন। প্রকল্পটিতে উপস্থাপন করা হয়, বৃষ্টির জল সংরক্ষণ করে কৃষিকাজে কীভাবে প্রয়োগ করা সম্ভব। যখন বৃষ্টির জল ফুরিয়ে যায়, তখন নদীর লবণাক্ত পানি পরিশোধন করে তা কীভাবে পরিচ্ছন্ন পানিতে রূপান্তরিত করা যায়, সেই পদ্ধতিও উৎসর্গ করা হয়েছে প্রকল্পে। আর পলিথিন দিয়ে নির্মিত বিশেষ ঘরের মাধ্যমে অসময়ের ফসলের উৎপাদনের অনুসন্ধানও ক্ষমতায়িত করা হয়েছে।

এছাড়া, অতিবৃষ্টির ক্ষতিকর প্রভাব থেকে সুরক্ষিতভাবে কার্যকর বীজতলা তৈরি করতে সক্ষম হওয়ার প্রকৃত চিত্রও উপস্থাপন করেছেন তারা। ইঁদুর এবং পশুপাখির ক্ষতির হাত থেকে ফসল রক্ষার বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

স্থানীয় প্রেক্ষাপট থেকে উদ্ভূত এই সৃষ্টিশীল ধারণা মেলা গমনের দর্শকদের এবং অতিথিদের মূলভাবনায় গভীর প্রভাব ফেলে। তাদের বিশ্বাস, শিক্ষার্থীদের এই উদ্যোগ উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার সূচনা করবে।

এবারের শোকেসিং প্রোগ্রামে কয়রা উপজেলার ১০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অধিকার করে বড়বাড়ি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, দ্বিতীয় স্থান খায়রাদ মদিনাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় অর্জন করে এবং তৃতীয় স্থান পায় জাকারিয়া শিক্ষা নিকেতন।

১২ জুন শুক্রবার, কয়রা মদিনাবাদ সরকারি মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে এই কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হয়। এডুকেশনাল এক্সিলেন্স সাপোর্ট স্কিম (EESS), এসইডিপি এবং মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর, ঢাকার সহযোগিতায় এবং কয়রা উপজেলা প্রশাসন ও উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের বাস্তবায়নে এই মেলা অনুষ্ঠিত হয়।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন খুলনা-৬ (কয়রা-পাইকগাছা) আসনের সংসদ সদস্য মাওলানা মো. আবুল কালাম আজাদ। সভাপতিত্ব করেন কয়রা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আব্দুল্লাহ আল বাকী। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ। অতিথিরা শিক্ষার্থীদের প্রকল্পগুলি পরিদর্শন করে তাদের উৎসাহিত করেন।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে সংসদ সদস্য জানান, আমি আমার এলাকার ছাত্র-ছাত্রীর উদ্ভাবন, প্রকল্প ও উপস্থাপনা দেখে সত্যিই অভিভূত হয়েছি। আল্লাহ তাদের অসাধারণ মেধা দিয়েছেন। তাদের চিন্তা-ভাবনা, উদ্ভাবন ও উপস্থাপনের শক্তি তাক লাগিয়েছে।

তিনি উল্লেখ করেন, আমাদের মেধাবী সন্তানদের অনেকেই বিদেশে চলে যাচ্ছে। আমাদের প্রিয় সন্তানেরা বিদেশে অবস্থান করছে, সেখানে তাদের দারুণ প্রতিভা প্রদর্শন করছে। আমাদের দেশে তাদের মেধা বিকাশের পাশাপাশি কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। আমরা একসঙ্গে প্রচেষ্টা চালাবো, এসব মেধাকে কাজে লাগিয়ে দেশের জনসম্পদে পরিণত করবো।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন কয়রা কপোতাক্ষ কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ওলিউল্লাহ, কয়রা আমিনিয়া কামিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা ইউনুস আলী, কয়রা উপজেলা জামায়াতের আমির মাওলানা মিজানুর রহমান, ঘুগরাকাটি ফাজিল ডিগ্রি মাদ্রাসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মাওলানা সুজাউদ্দিন, কয়রা মদিনাবাদ মডেল সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ইসমাইল হোসেন এবং বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, বিশিষ্টজন এবং স্থানীয় সংবাদকর্মীরা।
আয়োজনকর্তারা বলছেন, শিক্ষার্থীদের মাঝে গবেষণা প্রকল্পের চিন্তাভাবনা, সৃজনশীল দক্ষতা এবং সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা গড়ে তোলা উদ্দেশ্যে এই কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে। উপকূলের কঠিন পরিবেশে বেড়ে ওঠা শিক্ষার্থীদের এই ধরনের সৃজনশীল উদ্যোগ ভবিষ্যতের উন্নতির নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। এই মেলায়, যা শিক্ষার্থী এবং শিক্ষকদের

অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হয়েছে, তরুণদের বৈজ্ঞানিক চিন্তার দৃষ্টিভঙ্গি, উদ্ভাবনমূলক ধারণার পাশাপাশি স্থানীয় সমস্যা সমাধানের নানা উদ্যোগ পরিলক্ষিত হয়েছে। তাদের মতে, এমন উদ্যোগ স্থানীয় সমস্যার স্থানীয় সমাধান তৈরিতে বিশাল ভূমিকা পালনে সক্ষম হবে।