সৈয়দ আমান উল্লাহ্, স্টাফ রিপোর্টারঃ
স্থানীয় সরকারে দক্ষ নেতৃত্ব নাকি গণতান্ত্রিক অধিকারে হস্তক্ষেপ—উঠছে নানা প্রশ্ন। ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান পদে নির্বাচনের জন্য বর্তমানে কোনো নির্দিষ্ট শিক্ষাগত যোগ্যতার প্রয়োজন নেই। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এ পদে ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণের দাবি নতুন আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
বিষয়টি শুধু প্রশাসনিক দক্ষতার ক্ষেত্রেই নয়; বরং চেয়ারম্যানের ওপর অর্পিত গ্রাম আদালত-সংক্রান্ত দায়িত্বও এই বিতর্কের একটি কারণ হয়েছে।
স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান দেশব্যাপী অন্তনিচ কর্মের প্রধান সমন্বয়কারীদের একজন। উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন, সরকারি বরাদ্দের পর্যবেক্ষণ, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন, নাগরিক সেবা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং সরকারি বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে সমন্বয়সহ নানা দায়িত্ব তার ওপর থাকে। এসব দায়িত্ব পালন করতে প্রশাসনিক দক্ষতা ও নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এর বাইরেও, চেয়ারম্যানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হচ্ছে গ্রাম আদালতের কার্যক্রম পরিচালনায় পালন করা। গ্রাম আদালত আইন অনুযায়ী স্থানীয় পর্যায়ের নির্দিষ্ট কিছু বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য গঠিত আদালতের কার্যক্রমে চেয়ারম্যান নেতৃত্ব দেন এবং নির্ধারিত আইনি কাঠামোর মধ্যে বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে সহায়তা করেন।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের দায়িত্ব পালনে আইন, বিধি-বিধান ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে মৌলিক ধারণা থাকা কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য সহায়ক হতে পারে।
আরোও পড়ুন
| সিলেটে ভয়ংকর রপ নিয়েছে ‘হানি ট্র্যাপ’ বা ‘মধুফাঁদ’ চক্র |
এ কারণে কিছু মহল মনে করছে, ইউপি চেয়ারম্যান পদে অন্তত একটি ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ করা বোধগম্য হতে পারে। তাদের বক্তব্য, আধুনিক প্রশাসন এখন অনেকটা প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল। সরকারি চিঠিপত্র, প্রকল্প ব্যবস্থাপনা, আর্থিক নথি, ডিজিটাল সেবা এবং আইনগত প্রক্রিয়া বোঝার জন্য প্রার্থীর ন্যূনতম শিক্ষাগত সক্ষমতা থাকা জনস্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
তবে এ দাবির বিরোধিতা অনেক আছে। অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও স্থানীয় সরকার গবেষকের মতে, জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের ক্ষেত্রে জনগণের ভোটই সবচেয়ে বড় যোগ্যতার মাপকাঠি। শিক্ষাগত যোগ্যতার বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হলে গ্রামীণ সমাজের অনেক অভিজ্ঞ, সৎ এবং জনপ্রিয় ব্যক্তি নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে পারেন।
তাদের মতে, নেতৃত্ব, সততা, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা এবং জনআস্থার মূল্য কোনো সনদের চেয়ে কম নয়।
বর্তমান আইনেও ইউপি চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হওয়ার জন্য নির্দিষ্ট শিক্ষাগত যোগ্যতার কোনো শর্ত নেই। ফলে ভবিষ্যতে এমন কোনো বিধান কার্যকর করতে হলে আইন সংশোধন বা নতুন আইন প্রবর্তন করতে হবে। আদালতে এ বিষয়ে কোনো রিট বা জনস্বার্থমূলক আবেদন হলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়াই অনুসরণ করতে হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রশ্নটি কেবল একজন চেয়ারম্যান কতটা শিক্ষিত—তা নয়; বরং স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে কীভাবে আরও কার্যকর, জবাবদিহিমূলক এবং জনগণের আস্থার জায়গায় নিয়ে যাওয়া যায়, সেটিই এখন মূল বিবেচ্য। একদিকে বিচার সংক্রান্ত দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা নিশ্চিত করার যুক্তি, অন্যদিকে জনগণের অবাধ নির্বাচনী অধিকার—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য খুঁজে বের করা হবে ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
ফলে ইউপি চেয়ারম্যান পদে শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণের বিতর্ক এখন শুধুমাত্র একটি প্রশাসনিক প্রস্তাব নয়; এটি স্থানীয় সরকার সংস্কার, আইনের শাসন, সুশাসন এবং গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ—এই চারটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নকে একত্রে গেঁথে জাতীয় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।

