নলডাঙ্গা (নাটোর) প্রতিনিধি:
নাটোরের নলডাঙ্গা উপজেলায় সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যা দিন দিন উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষত, ব্যাটারিচালিত অটোভ্যান ও অটোরিকশার অকার্যকর চলাচল, দক্ষ চালকের অভাব, ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন এবং প্রশাসনিক তদারকির অভাবের কারণে এই উপজেলার সড়কগুলো ক্রমশ মৃত্যুর ফাঁদে পরিণত হচ্ছে।
গত এক সপ্তাহের মধ্যে বিভিন্ন সড়কে ঘটে যাওয়া একাধিক দুর্ঘটনায় একজন জীবন হারিয়েছে এবং সাংবাদিক, শিক্ষক, রাজনৈতিক নেতা ও সাধারণ নাগরিকসহ অন্তত ১৫ জন গুরুতর আহত হয়েছেন। এসব ঘটনা থেকে স্থানীয় জনগণের মধ্যে গভীর উদ্বেগ ও বিচলনার সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নলডাঙ্গা-পাটুল সড়ক, হাঁপানিয়া-নলডাঙ্গা সড়ক, বাঁশভাগ সুইচগেট থেকে বেলু কামারের মোড়, নলডাঙ্গা-মাধনগর সড়ক, নলডাঙ্গা-নাটোর আঞ্চলিক মহাসড়ক, বাঁশিলা কালিতলা চার রাস্তার মোড়, মাধনগর বাজার ও বাসস্ট্যান্ডের মতো উপজেলার প্রায় সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ সড়কে প্রতিদিন শত শত ব্যাটারিচালিত অটোভ্যান ও অটোরিকশার চলাচল চলছে। অধিকাংশ চালকের কাছে বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স বা প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের অভাব রয়েছে।
অনেক ক্ষেত্রে কিশোর বয়সের ব্যক্তিরাও এই যানবাহন চালাচ্ছেন। অতিরিক্ত গতিতে চালানো, অতিরিক্ত বোঝা তোলা, উল্টো পথে চলা, মোবাইল ফোন ব্যবহার করা এবং ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের কারণে দুর্ঘটনার সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
সম্প্রতি উপজেলার নানা স্থানে কয়েকটি ধারাবাহিক দুর্ঘটনায় শুক্রবার অটোভ্যান ও মোটরসাইকেলের সংঘর্ষে সাগর (২০) নামের এক তরুণ নিহত হয়। এছাড়া আলাদা দুর্ঘটনায় নাটোর প্রেস ক্লাবের সাহিত্য ও পাঠাগার সম্পাদক সাংবাদিক আরিফুল ইসলাম, জামায়াত নেতা ডা. ফজলুল হক নান্নু, শিক্ষক রওশন আরা, রবিউল ইসলাম, বিএনপির কর্মী রাফিউল কনকসহ অন্তত ১৫ জন গুরুতর আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে কয়েকজন রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে বাধ্য হয়েছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ রয়েছে, দুর্ঘটনাগুলোর পর প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাঝে মাঝে ভ্রাম্যমাণ আদালত এবং অভিযান পরিচালনা করা হলেও তা ধারাবাহিক নয়। কিছুদিন অভিযান চালানোর পর পরিস্থিতি আবার আগের অবস্থায় ফিরে যাচ্ছে। ফলে বেপরোয়া চালকরা সর্বদা ঝুঁকিপূর্ণভাবে গাড়ি চালাতে কোন ভয় বা চাপ অনুভব করছে না।
সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত বাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে কোন ট্রাফিক ব্যবস্থা ছাড়াই এসব যানবাহন চলছে। এতে সাধারণ মানুষ, শিক্ষার্থীদের এবং মোটরবাইক চালকসহ অন্যান্য যানবাহনের চালকদের অব্যাহত জীবনের ঝুঁকি নিতে হচ্ছে। বিশেষ করে স্কুল-কলেজের ছুটির সময় এবং বাজারের দিনে দুর্ঘটনার সম্ভাবনা আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
অটোভ্যান চালক মামুন রশিদ জানান, “সকল চালক একরকম নয়। আমরা অনেকেই নিয়ম মেনে গাড়ি চালানোর চেষ্টা করি। কিন্তু কিছু অদক্ষ এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক চালকের বেপরোয়া আচরণে সমস্ত অটোভ্যান চালক সমাজের বদনাম হচ্ছে। যদি সরকার প্রশিক্ষণ ও নিবন্ধনের ব্যবস্থা করে, তাহলে দুর্ঘটনা অনেকটাই কমবে।”
নলডাঙ্গা পৌর বিএনপির নেতা এসে এম সান্টু মন্তব্য করেন, “দৈনিক দুর্ঘটনা ঘটলেও কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি এবং রাজনৈতিক নেতাদের সমন্বয়ে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। মানুষের জীবন নিয়ে আর অবহেলা করা যাবে না।”
নিরাপদ সড়ক চাই, নলডাঙ্গা শাখার সভাপতি লতিফুর রহমান লতিফ বলেন, “দুর্ঘটনার প্রধান কারণ অদক্ষ চালক, অবৈধ যানবাহন ও ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন। নিয়মিত অভিযান, চালকদের প্রশিক্ষণ এবং জনসচেতনতা ছাড়া আমরা এই সমস্যার সমাধান করতে পারব না।”
নাটোর জেলা শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি ও নলডাঙ্গা উপজেলা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক মো. শফিকুল ইসলাম বুলবুল বলেন, “যারা বৈধভাবে গাড়ি চালান, তাদের প্রতি কোনও আপত্তি নেই। কিন্তু লাইসেন্সবিহীন ও প্রশিক্ষণহীন চালকদের কারণে দুর্ঘটনা বাড়ছে। সবার জন্য আইনকে সমানভাবে প্রয়োগ করা নিশ্চিত করতে হবে।”
নলডাঙ্গা উপজেলা জামায়াতের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অধ্যক্ষ মাওলানা মোহাম্মদ আবু নওশাদ নোমানী মন্তব্য করেছেন, “মানুষের সুরক্ষায় সড়কে শৃঙ্খলা পুনরুদ্ধার করা এখন আবশ্যক। প্রশাসন, নির্বাচিত প্রতিনিধিরা এবং সাধারণ মানুষকে রাজনৈতিক দলাদলি পেছনে ফেলে একত্রে কাজ করতে হবে।”
সড়ক দুর্ঘটনার কারণে মারাত্মকভাবে আহত হয়ে বর্তমানে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন নাটোর প্রেস ক্লাবের সাহিত্য ও পাঠাগার সম্পাদক সাংবাদিক এম. এম. আরিফুল ইসলাম বলেছেন, “একটি বেপরোয়া অটোভ্যানের ধাক্কায় আমার ডান পায়ের দুটি হাড় ভেঙে গেছে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধি হিসেবে আমি চাই, আর কোনো পরিবার যাতে এই ধরনের দুর্ঘটনার শিকার না হয়। প্রশাসনের উদ্দেশ্যে আবেদন, অবৈধ ও বেপরোয়া যানবাহনের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হোক।”
বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক এবং নলডাঙ্গা উপজেলা পরিষদের প্রাক্তন ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. জিয়াউল হক বলেছেন, “সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের এবং প্রশাসনের দায়িত্বে পড়ে। চালকদের প্রশিক্ষণ, যানবাহনের নিবন্ধন এবং আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে জনসাধারণকেও সচেতন হতে হবে।”
সচেতন নাগরিকদের দৃষ্টিতে, দুর্ঘটনা প্রতিরোধের জন্য অবৈধ এবং অযন্ত্রিত যানবাহনের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান, চালকদের প্রশিক্ষণ এবং নিবন্ধন নিশ্চিতকরণ, ট্রাফিক আইন বাস্তবায়ন, গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ট্রাফিক পুলিশ নিয়োগ, স্পিড ব্রেকার, সড়ক সাইন এবং সড়ক চিহ্ন স্থাপন করা, পাশাপাশি ব্যাপক জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি।
এই সম্পর্কে নলডাঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. নূরের আলম বলেছেন, “সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে পুলিশ নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে। ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। জনগণের সহযোগিতা পেলে দুর্ঘটনার সংখ্যা আরো কমানো সম্ভব।”
নলডাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আল এমরান খাঁন জানান, “সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য উপজেলা প্রশাসন নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করছে। অবৈধ ও অযন্ত্রিত যানবাহনের বিরুদ্ধে উদ্যোগ আরও বাড়ানো হবে। সেইসাথে সচেতনতামূলক কার্যক্রমের পরিধিও বৃদ্ধি করা হবে।”

