টানা বৃষ্টি এবং বিভিন্ন অঞ্চলের বন্যার প্রভাব পড়েছে দেশের বেশিরভাগ কাঁচাবাজারে। সবজি, মাছ, ডিম, পেঁয়াজ, কাঁচামরিচসহ অনেক নিত্যপণ্যের দাম দ্রুত বেড়েছে। এর ফলে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছেন নিম্ন ও নির্দিষ্ট আয়ের লোকেরা।
দেশের কৃষি ও খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা মৌসুমি আবহাওয়ার ওপর প্রধানত নির্ভর করে। বন্যা, অতিবৃষ্টি অথবা সড়ক যোগাযোগে সমস্যা হলে উৎপাদন ও পরিবহনে চাপ আসে। কৃষকের ফসল নষ্ট হলে বাজারে প্রভাব পড়ে।
অন্যদিকে সড়ক অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলে পণ্য পরিবহনের খরচ বাড়ে। পাশাপাশি এই বিষয়টি সত্য যে, সংকটের সুযোগ নিয়ে মাঝের প্রতিষ্ঠানের লোকেরা অনেক সময় অতিরিক্ত মুনাফা করেন, যা পরিস্থিতি আরও কঠিন করে তোলে। উৎপাদনস্থলে দাম যতটা বেড়ে, ভোক্তা পর্যায়ে অনেক সময় তার থেকেও বেশি বৃদ্ধি পায় মাঝের লোকেদের কারণে।
এ ধরনের পরিস্থিতি আমাদের খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থার কাঠামোগত সীমাবদ্ধতাও সামনে নিয়ে আসে। দেশে কৃষিপণ্য উৎপাদনের ক্ষমতা যথেষ্ট হলেও সংরক্ষণব্যবস্থা অপর্যাপ্ত। দ্রুত পরিবহন, বাজার সম্পর্কিত তথ্যের বিনিময় এবং সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় এখনও অনেক ঘাটতি রয়েছে। কোনো অঞ্চলে উৎপাদন কমে গেলে অন্য অঞ্চল থেকে দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিত করার মতো সমন্বিত ব্যবস্থাও সবসময় কার্যকর হয় না।
বাজার তদারকি অনেক সময় কেবল খুচরা বিক্রেতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। দাম বাড়ানোর আসল উৎস কোথায়, কোন পর্যায়ে অস্বাভাবিক মুনাফা হচ্ছে বা কোথায় সরবরাহকৃত পণ্যের সমস্যা হচ্ছে তা চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া প্রায়ই হয় না। যে কারণে প্রকৃত সংকট এবং কৃত্রিম সংকট আলাদা করা কঠিন হয়ে পড়ে।
| নিরাপদ সড়ক নেই, সড়কে নিরাপত্তা দরকার – ইলিয়াস হোসেন মাঝি |
প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, সরবরাহ ব্যাহত হয়। তখন পণ্যের দাম কিছু সময়ের জন্য বাড়তে পারে। তবে বারবার দুর্যোগের জন্য যদি বাজার দীর্ঘমেয়াদী অস্থিরতায় ভোগে, তখন কেবল প্রকৃতির ওপর দোষ চাপিয়ে লাভ নেই। বাজার ব্যবস্থাপনা, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং প্রশাসনিক প্রস্তুতি তখন প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। নিত্যপণ্যের বাজার কেবল চাহিদা-উৎপাদন-সরবরাহের বিষয় নয়। সঠিক বাজার ব্যবস্থাপনাও এর সঙ্গে খুবই জড়িত।
নিত্যপণ্যের বাজারের অস্থিরতা কমাতে স্বল্পমেয়াদে উৎপাদন এলাকা থেকে বাজারে পণ্য পরিবহন নির্বিঘ্ন রাখতে প্রশাসনিক সমন্বয় বৃদ্ধির প্রয়োজন। যেসব এলাকায় বন্যার ফলে সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে, সেখানে বিকল্প পরিবহন ও দ্রুত সরবরাহের ব্যবস্থা করতে হবে। পাইকারি ও খুচরা বাজারে নিয়মিত মূল্য এবং মজুদ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে অস্বাভাবিক দাম বাড়ার কারণ প্রকাশ করতে হবে।
মধ্যমেয়াদে কৃষিপণ্যের সংরক্ষণব্যবস্থা আরো শক্তিশালী করতে হবে। উৎপাদক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত সরবরাহ শৃঙ্খলের অপ্রয়োজনীয় স্তর কমানোর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। দীর্ঘমেয়াদে জলবায়ুজনিত ঝুঁকি মোকাবিলা করতে কৃষির উৎপাদন, পরিবহন এবং বাজার ব্যবস্থাপনাকে সমন্বিত পরিকল্পনায় আনতে হবে। মৌসুমি দুর্যোগ নিত্যপণ্যের বাজারকে অস্থির করে তুলতে না পারে তার জন্য এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে।
নিত্যপণ্যের বাজার নাগরিকদের জীবনমানকে প্রভাবিত করে। সামাজিক স্থিতিশীলতার সঙ্গেও এটি গভীরভাবে সম্পর্কিত। যখন একটি পরিবারের প্রতি পদক্ষেপে প্রয়োজনের চেয়ে কম খাবার কেনে, তখন তার প্রভাব জনস্বাস্থ্য ও মানবসম্পদেও পড়ে। তাই বাজার স্থিতিশীল রাখা খুবই জরুরি। এবং এটি কোনো একক সরকারি সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নয়। সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষকে সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে।
| নিরাপদ সড়ক নেই, সড়কে নিরাপত্তা দরকার – ইলিয়াস হোসেন মাঝি |
প্রাকৃতিক দুর্যোগ এড়ানো আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। তবে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে নিত্যপণ্যের বাজারে যে সংকট ও অস্থিরতা সৃষ্টি হয়, তা থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব।