সৌরভ দত্ত, কলকাতা:
রবিবার সকালে রেড রোডে এক নতুন দৃশ্য চাক্ষুষ হলো। সেনাবাহিনীর কুচকাওয়াজ, দুর্গাপুজোর উৎসব এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সময়ে ইদের জামাত ছাড়া আর কোন অনুষ্ঠান এখানে অনুষ্ঠিত হয়নি।
রবিবার আন্তর্জাতিক যোগ দিবসকে সামনে রেখে এক অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়েছিল। উপস্থিতির এই ছবি অনেকের কাছে খুবই আকর্ষণীয় মনে হয়েছে। রবিবারের যোগ-মঞ্চের ছবি রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে অনেক আলোচনা সৃষ্টি করেছে। কারণ, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সাথে যোগ-মঞ্চে রাজ্যপাল এন কে রবি এবং আয়ুষ মন্ত্রী প্রতাপরাও গণপতরাও যাদব ছাড়া বাংলা থেকে শুধুমাত্র মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ছিলেন।
যোগ-অনুষ্ঠানের আয়োজন মোদী সরকারের আয়ুষ মন্ত্রক দ্বারা করা হয়েছিল। নবান্নের সূত্রে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয় এই মঞ্চে কাকে রাখা হবে তা নির্ধারণ করেছিল। একটি বড় বিষয় হচ্ছে, কেন্দ্রের তরফে বাংলা থেকে দুই প্রতিমন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার ও শান্তনু ঠাকুরকে ওইদিন মঞ্চে আমন্ত্রিত করা হয়নি। কেন্দ্রীয় শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী সুকান্ত বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগ অনুষ্ঠানে ছিলেন। অন্যদিকে, জাহাজ প্রতিমন্ত্রী শান্তনু ঠাকুর বনগাঁ স্টেডিয়ামে যোগাসন করেছিলেন।
পশ্চিমবঙ্গ থেকে রাজ্যসভার সাংসদদের মধ্যে বর্তমান বিজেপি সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য ও প্রাক্তন সভাপতি রাহুল সিনহা রয়েছেন। কেন্দ্রের সরকারি অনুষ্ঠানে প্রায়ই সাংসদদের নিমন্ত্রণ করা হয়ে থাকে। কিন্তু শমীক বা রাহুলের উপস্থিতি সেখানে ছিল না।
কলকাতায় প্রধানমন্ত্রী প্রকাশিত আবেগময় বার্তা, যোগ দিবসে ‘এক্স’ হ্যান্ডেলে শহরের জনগণের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কি লেখালিখির বিষয়।
‘আমার শক্তি বিশ্বের মুক্ত বাজার নয়,’ ভারতকে প্রতিরক্ষায় ‘নির্মাতা’ হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য উপ মুখ্যমন্ত্রী নিয়ে আলোচনা এবং দিল্লির ‘একক ক্ষমতার’ নীতি
বাংলায় বিজেপির বিশাল জয় লাভের পর অনেকের মধ্যে একটি ধারণা ছড়িয়েছিল যে, রাজ্যে কমপক্ষে দুইজন উপ মুখ্যমন্ত্রী তৈরি হবে। প্রথমত, সাংবিধানিকভাবে উপ মুখ্যমন্ত্রী পদটি কোনো স্বীকৃতি পায় না, এটি শুধুমাত্র একটি মর্যাদা বা অলঙ্কার। দ্বিতীয়ত, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে— বাংলায় মুখ্যমন্ত্রী ও পৃথক কোনো ক্ষমতার কেন্দ্র তৈরি করতে মোদী-অমিত শাহরা রাজি নন। এমনকি সরকারের সাথে দলীয় পরিচালনার মধ্যে সমান্তরাল কোনো ক্ষমতার কেন্দ্র তৈরি করতেও দিল্লির ইচ্ছা নেই।
একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী যে দলকে অবহেলা করছেন, তা নয়। উল্টো তিনি সভা-অনুষ্ঠানে রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের নাম উঠলে তাকে যথাযথ সম্মান দিয়ে কথা বলেন। তিনি এমনও বলেছেন যে, তিনি শমীকবাবুর মতামত নেয়ার ব্যাপারে ‘যত্নবান’। কিন্তু অনেকের মতে, এটি আসলে রাজনৈতিক সৌজন্য বা ওপরে ওঠানোর কৌশল। সরকার ও দল তথা পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পরিকল্পনা— সবকিছুই ঠিক করছেন শুভেন্দু অধিকারী। এই বিষয়ে দিল্লির কাছে তার উপর পূর্ণ আস্থা রয়েছে।
প্রশাসনিক থেকে সংবিধান গোটা ক্ষেত্রেই শুভেন্দু।
কিছুদিন আগে দেখা গেছে যে বাংলায় তৃণমূল বিধায়কদের একটি আলাদা ব্লক সৃষ্টি হয়েছে। ওই ব্লককে বৈধতা দেওয়ার মাধ্যমে বিরোধী দলনেতা নির্বাচনের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে। বিধানসভার স্পিকারের অফিসে সেই বিধায়কদের সঙ্গে একদিন বৈঠকে ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। আবার দিল্লিতেও তৃণমূলের বিদ্রোহী ২০ জন সাংসদের সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকেও বৈঠক করতে দেখা গেছে। তা কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও পশ্চিমবঙ্গের তদারককারী ভূপেন্দ্র যাদবের আবাসে হোক বা শতাব্দী রায়ের ফ্ল্যাটে। সন্দেহ নেই, এই কৌশল শুভেন্দুর সংসদের প্রভাব ও শক্তি দুইয়ে অবদান রেখেছে।
প্রশ্ন উঠতে পারে, শমীক ভট্টাচার্য সেখানে কোথায় থাকলেন? শুধু তা-ই নয়, মুখ্যমন্ত্রীকে দেখা যাচ্ছে যথেষ্ট ফ্রিক্কি হিসেবে দিল্লিতে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী অমিত শাহ বা ভূপেন্দ্র যাদবের সঙ্গে দেখা করতে।
বিজেপির ‘হিমন্ত-যোগী’ মডেল ও রেড রোডের বার্তা বিজেপির ধরণে রাজনৈতিক নেতৃত্বে মুখ্যমন্ত্রী ভিত্তিক প্রশাসন এবং দলের কাঠামো নতুন কিছু নয়। এক্ষেত্রে অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মার প্রভাব ও পরিচিতি লক্ষ্যণীয়, তবে রাজ্য সভাপতি দিলীপ সাইকিয়া তার তুলনায় অনেকটাই কম পরিচিত। উত্তরপ্রদেশের প্রশাসন এবং রাজনীতিতে যোগী আদিত্যনাথের অবস্থানই চূড়ান্ত। মহারাষ্ট্রে দেবেন্দ্র ফড়নবিশই সরকার এবং দলের সকল কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই কারণে রবিবার রেড রোডের দৃশ্যটির গুরুত্ব বিচ্ছিন্ন বলার মতো নয়। বরং, এটি বিজেপির জাতীয় রাজনৈতিক দর্শনের মৌলিক নীতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। বাংলায় প্রশাসন এবং দলের বিষয়গুলিতে শুভেন্দু অধিকারীর বক্তব্য এখন কলকাতা ও দিল্লিতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাচ্ছে এবং রেড রোডে যোগ-মঞ্চের পরিস্থিতি সেই প্রাধান্যের আরেকটি নির্ভরযোগ্য প্রমাণ।

