এম টি রহমান মাহমুদ, স্টাফ রিপোর্টার:
গোপালগঞ্জ ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে আবাসিক ভবন পড়ে আছে। অব্যবহৃত-সেবা থেকে বঞ্চিত রোগীরা, রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার।
সরকারি চিকিৎসকদের আবাসিক সুবিধা নিশ্চিত করতে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয়েছিল আবাসিক ভবন। উদ্দেশ্য ছিল-হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স ও সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্যকর্মীরা হাসপাতালের কাছাকাছি থাকবেন, জরুরি প্রয়োজনে দ্রুত রোগীর পাশে দাঁড়াবেন এবং সরকারি চিকিৎসাসেবা আরও কার্যকর হবে। কিন্তু বাস্তবে গোপালগঞ্জ ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের সরকারি আবাসিক ভবনগুলোর বড় একটি অংশ পড়ে আছে অনেকটাই অকার্যকর অবস্থায়।
অভিযোগ রয়েছে, চিকিৎসক ও নার্সদের একটি বড় অংশ হাসপাতালের সরকারি কোয়ার্টারে না থেকে বাইরে ব্যক্তিগত বাসা ভাড়া করে বসবাস করছেন। ফলে একদিকে সরকারের বিপুল অর্থে নির্মিত আবাসিক স্থাপনাগুলো যথাযথভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে না, অন্যদিকে হাসপাতালের চিকিৎসক ও নার্সরা কর্মস্থলের বাইরে অবস্থান করায় জরুরি সময়ে রোগীরা দ্রুত চিকিৎসাসেবা পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন কয়েকজন রোগী ও তাদের স্বজন।
হাসপাতালের একটি ভবনে ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার, ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল। গোপালগঞ্জ আবাসিক তত্ত্বাবধায়ক ডা: জীবিতেষ বিশ্বাস বলেন আমাদের ও কষ্ট হয়। একদিকে ভবন পড়ে আছে জরাজীর্ণ অবস্থায়। ভবনের মালামাল চুরি হচ্ছে। কিন্তু এসব সরকারি আবাসিক স্থাপনার কতটি বর্তমানে ব্যবহারযোগ্য, কতটিতে চিকিৎসক-নার্স বসবাস করছেন এবং কতটি পরিত্যক্ত বা সংস্কার প্রয়োজন-এ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ ও হালনাগাদ তথ্য প্রকাশের দাবি উঠেছে।
সরকারি আবাসিক ভবন নির্মাণের মূল উদ্দেশ্য ছিল হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মস্থলের কাছাকাছি থাকার সুযোগ তৈরি করা। বিশেষ করে হাসপাতালের চিকিৎসকদের ক্ষেত্রে এ সুবিধার গুরুত্ব আরও বেশি। কারণ হাসপাতাল ২৪ ঘণ্টা চালু থাকে এবং জরুরি বিভাগে দিন-রাত যেকোনো সময় চিকিৎসকের প্রয়োজন হতে পারে।
কিন্তু অনুসন্ধানে সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে জানা গেছে, সরকারি কোয়ার্টারের অনেকগুলোতে বর্তমানে চিকিৎসক বা নার্সরা নিয়মিত বসবাস করেন না। কেউ কেউ কোয়ার্টারের জরাজীর্ণ অবস্থা, সংস্কারের অভাব ও বসবাসের অনুপযোগিতার কথা বলছেন। আবার কারও দাবি, সরকারি আবাসনে থাকার খরচ অনেক ক্ষেত্রে বাইরে বাসা ভাড়া নেওয়ার চেয়েও বেশি পড়ে।
সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের ভাষ্য, সরকারি কোয়ার্টারে থাকলে ভাড়া, বিদ্যুৎ, পানি, রক্ষণাবেক্ষণসহ বিভিন্ন খাতে যে অর্থ ব্যয় হয়, তা অনেক সময় বাইরে তুলনামূলক কম খরচে বাসা নিয়ে থাকার চেয়ে বেশি হয়ে যায়। এ কারণে তারা হাসপাতালের বাইরে বাসা ভাড়া নিয়ে বসবাস করছেন। তবে এর ফলে যে প্রশাসনিক ও জনসেবা-সংক্রান্ত সমস্যা তৈরি হচ্ছে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
সরকারি অর্থে নির্মিত একটি আবাসিক ভবন যদি দীর্ঘদিন ব্যবহার না হয়, তাহলে শুধু ভবনটি ফাঁকা পড়ে থাকে না-সঙ্গে নষ্ট হয় রাষ্ট্রের বিনিয়োগও।
অব্যবহৃত ভবন ধীরে ধীরে জরাজীর্ণ হয়ে পড়ে। দরজা-জানালা, বৈদ্যুতিক সংযোগ, পানি সরবরাহ, স্যানিটেশনসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নষ্ট হতে থাকে। পরে সেটিকে আবার ব্যবহারযোগ্য করতে প্রয়োজন হয় নতুন করে সরকারি অর্থ।
অর্থাৎ আজ যে ভবনটি ব্যবহার না করে ফেলে রাখা হচ্ছে, কয়েক বছর পর সেটি সংস্কারে আবার জনগণের করের টাকা ব্যয় করতে হতে পারে।
তাই প্রশ্ন উঠছে-কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সরকারি আবাসিক ভবন যদি ব্যবহারই না হয়, তাহলে এগুলো নির্মাণের উদ্দেশ্য কী ছিল?
হাসপাতালে ভর্তি কয়েকজন রোগী ও তাদের স্বজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চিকিৎসকের নিয়মিত উপস্থিতি নিয়ে তাদের মধ্যে নানা ধরনের অসন্তোষ রয়েছে। বিশেষ করে রাতের বেলায় জরুরি প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসককে দ্রুত পাওয়া নিয়ে ভোগান্তির অভিযোগ করেছেন কেউ কেউ।
একজন ভর্তি রোগীর স্বজন বলেন, হাসপাতালে রোগী ভর্তি থাকার পর রাতের বেলায় হঠাৎ শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসককে দ্রুত পাওয়া নিয়ে পরিবারের সদস্যদের দুশ্চিন্তায় থাকতে হয়।
আরেক রোগীর স্বজনের অভিযোগ, রোগীর অবস্থা খারাপ হলে নার্সরা প্রাথমিকভাবে সহযোগিতা করলেও প্রয়োজনীয় চিকিৎসকের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। সরকারি হাসপাতাল হওয়ায় দূর-দূরান্ত থেকে আসা দরিদ্র রোগীদের জন্য বিষয়টি আরও কষ্টকর।
অন্য এক রোগীর ভাষ্য, হাসপাতালের ভেতরে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের আবাসিক ব্যবস্থা থাকলে জরুরি সময়ে দ্রুত সেবা পাওয়ার সুযোগ বাড়ত বলে তারা মনে করেন।
আরেকজন ভর্তি রোগী বলেন, সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকদের কাছ থেকে ২৪ ঘণ্টা সেবা পাওয়ার প্রত্যাশা নিয়েই মানুষ এখানে আসে। তাই চিকিৎসকরা যদি কর্মস্থলের কাছাকাছি থাকেন, তাহলে রোগীদের জন্য তা বড় সুবিধা হবে।
সরকারি কোয়ার্টারে না থাকার কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ ভবনগুলোর জরাজীর্ণ অবস্থার কথা জানিয়েছেন। তাদের দাবি, দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় অনেক আবাসিক ভবন বসবাসের উপযোগিতা হারিয়েছে।
যদি সত্যিই সরকারি আবাসিক ভবনগুলো বসবাসের অনুপযোগী হয়ে থাকে, তাহলে সেগুলো বছরের পর বছর ফেলে না রেখে সংস্কার করা জরুরি। আর যদি সংস্কারের পরও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সেখানে থাকতে আগ্রহী না হন, তাহলে কেন আগ্রহী নন-তার কারণও প্রশাসনের খতিয়ে দেখা দরকার।
কারণ সমস্যাটি শুধু ‘কেউ কোয়ার্টারে থাকছেন না’-এতটুকুতে সীমাবদ্ধ নয়।
এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সরকারি সম্পদের ব্যবহার, হাসপাতালের জরুরি সেবা এবং জনগণের অর্থের সঠিক ব্যবস্থাপনা।
সরকারি কোয়ার্টারগুলো যদি ব্যবহার না হয়, তাহলে একদিকে ভবনগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে নির্ধারিত আবাসিক সুবিধা থেকে সরকার যে রাজস্ব বা ভাড়া পেতে পারে, সেটিও যথাযথভাবে আদায় হচ্ছে কি না-তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
আবার কোনো সরকারি কর্মকর্তা সরকারি কোয়ার্টার বরাদ্দ নিয়ে সেখানে না থেকে বাইরে থাকলে, তার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ভাড়া, আবাসন সুবিধা কিংবা অন্যান্য আর্থিক বিধি যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে কি না-সেটিও প্রশাসনিকভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
কোন কর্মকর্তা কোন কোয়ার্টার বরাদ্দ পেয়েছেন, কে সেখানে থাকছেন, কে থাকছেন না এবং না থাকার কারণ কী-এমন একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ ও যাচাই করা হলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।
চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত আবাসন পছন্দের অধিকার অবশ্যই রয়েছে। বাইরে বাসা নেওয়ার বাস্তব কারণও থাকতে পারে। কিন্তু সরকারি হাসপাতালের ক্ষেত্রে জরুরি সেবার বিষয়টি আলাদা গুরুত্ব বহন করে।
বিশেষ করে রাতে কোনো রোগীর শারীরিক অবস্থার আকস্মিক অবনতি হলে দ্রুত চিকিৎসকের উপস্থিতি জীবন-মৃত্যুর ব্যবধান তৈরি করতে পারে।
তাই হাসপাতালের আবাসিক ভবনগুলো যদি চিকিৎসক ও নার্সদের কর্মস্থলের কাছাকাছি রাখার উদ্দেশ্যে নির্মিত হয়ে থাকে, তাহলে সেগুলো কেন ব্যবহার হচ্ছে না-এ বিষয়ে স্বাস্থ্য প্রশাসনের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রয়োজন। শুধু গোপালগঞ্জ নয় বিভিন্ন সূএে জানা যায় দেশের বিভিন্ন সরকারি কোয়াটার কেহই ব্যাবহার করে না! এর সঠিক তথ্য দিয়ে সরকারের জবাবদিহি একান্ত জরুরি। আমরা চাই সরকারের রাজস্ব আয়! সুন্দর একটা বাংলাদেশ চাই!

