এসকে এম মহসিন রেজা, উপজেলা (খুলনা) প্রতিনিধিঃ
খুলনার উপকূলীয় অঞ্চলের সাতটি ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত উপজেলা কয়রার উত্তর বেদকাশী ইউনিয়নের পাথরখালী গ্রামের খালপাড় এলাকা। অদৃশ্য শাকবাড়ীয়া নদীর এই পাড়ে ওয়াপদা বেড়িবাঁধ, আর অন্য পাড়ে বিস্তৃত সুন্দরবন।
একদিকে ভয়ংকর বাঘ ও লবণাক্ত পানির দৈনন্দিন লড়াই, অন্যদিকে নদীভাঙনে সব হারানো মানুষের টিকে থাকার চেষ্টা। এই দুইয়ের মাঝে ৪টি খুঁটি পুঁতে চারপাশ ও উপর পলিথিন, নেট বা চটের বস্তা এবং খড় দিয়ে তৈরি একটি পুরনো ঝুপড়ি ঘর। এই ক্ষুদ্র ভাঙা ঘরের মধ্যে নাতি-নাতনিসহ পরিবারের পাঁচ সদস্য নিয়ে কঠিন জীবনযাপন করছেন ৬৮ বছর বয়সী জরিনা খাতুন।
স্থানীয় মানুষরা বলেন, প্রায় পাঁচ-ছয় বছর আগে ঘূর্ণিঝড় ‘আম্পান’ ও শাকবাড়ীয়া নদীর বারবার ভাঙনের ফলে জরিনা খাতুনের পৈতৃক ও স্বামীর ভিটেমাটি সম্পূর্ণ নদীর তলায় বিলীন হয়ে গেছে। মাথা গোঁজার শেষ আশ্রয়টুকু হারিয়ে তিনি বাধ্য হয়ে এই বেড়িবাঁধের আশ্রয় নেন।
এর মধ্যেই চার-পাঁচ বছর আগে তার স্বামী মকবুল শেখ মারা যান, যিনি নদীতে মাছ ধরেই সংসার চালাতেন। স্বামীর মৃত্যুর পর থেকে জরিনা খাতুনের পরিবার কঠিন সমস্যায় পড়েছে।
আরোও পড়ুন
| টেকনাফে জামায়াতের যুব বিভাগের উদ্যোগে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি |
বর্তমানে পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি তার নাতি। ভয়ংকর বাঘের ভয় বাদ দিয়ে সুন্দরবনের নদী ও খালের উপর নির্ভর করে কোনোমতে পরিবারের খাবার যোগান দেয়। তবে জুনের শুরু থেকে তিন মাসের জন্য সুন্দরবনে সব ধরনের প্রবেশ নিষিদ্ধ থাকার কারণে বর্তমানে তাদের আয়ের পথ সম্পূর্ণ বন্ধ।
নদী বা খালের লবণাক্ত পানিতে মাছ না পেলে প্রায়ই অনাহারে দিন কাটছে তাদের। মাথা গোঁজার জায়গা ও উপার্জনের অভাবের পাশাপাশি এই পরিবারের জন্য একটি বড় সমস্যা হল বিশুদ্ধ খাবার পানি। এলাকায় মিষ্টি জলের অভাব থাকায় প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে খাবার পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে তাদের।
চোখে অশ্রু ও কণ্ঠে আকুলতা নিয়ে জরিনা খাতুন বলেন, “সামনে বর্ষা আসছে! এই ঝড়-ঝাপটা শুরু হওয়ার আগে যদি কেউ দুটো টিন দিতো, তাহলেই কয়ডা খুঁটি পুঁতে কিছু মাথা গোঁজার ব্যবস্থা করতে পারতাম। বর্ষাকালে রাতে একটু শান্তিতে ঘুমোতে পারতাম।”
তিনি আরও বলেন, স্বামী মারা যাওয়ার পর সরকারিভাবে তিনি মাত্র ‘বিধবা ভাতা’ পান, যা দিয়ে এই বাজারে ৫ জনের সংসার চালানো অসম্ভব।
উত্তর বেদকাশী ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য অশোক কুমার শীল জানান, “আগে একটি এনজিওর গৃহনির্মাণ প্রকল্পে তার নাম অন্তর্ভুক্ত হলেও নতুন জায়গায় তারা যেতে রাজি হননি। তবে যদি প্রশাসন বা অন্য কোনো সংস্থা থেকে নতুন আবাসন প্রকল্প আসে, তাহলে এই অসহায় পরিবারটিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করব।”
বনজ সম্পদ, মৎস্য ও জলজ প্রাণীর নিরাপদ প্রজনন, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং বন্য প্রাণীর সুরক্ষার লক্ষ্যে ১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সুন্দরবনে মাছ ও কাঁকড়া আহরণ, মধু সংগ্রহ এবং পর্যটকদের প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে বন বিভাগ। তিন মাস বন বন্ধ থাকায় আয়-রোজগারের পথ প্রায় বন্ধ হয়ে যায় এই এলাকায় বসবাসকারী মৎস্যজীবী এবং মৌয়ালদের।

