জিয়াউদ্দিন লিটন
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে সাম্প্রতিক পুশ-ইন ঘটনাগুলো নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে। সীমান্তের বিভিন্ন এলাকায় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) কর্তৃক কথিত পুশ-ইনের প্রচেষ্টা এবং বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিজিবি)-এর প্রতিরোধ শুধু সীমান্ত ব্যবস্থাপনার বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার এবং প্রতিবেশী সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।
সীমান্তের শূন্যরেখায় নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের অনিশ্চিত অবস্থায় পড়ে থাকার দৃশ্য মানবিক বিবেককে নাড়া দেয়। একই সঙ্গে কোনো রাষ্ট্রের ভূখণ্ড ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনার ওপর তার আইনগত কর্তৃত্বের প্রশ্নও সামনে আসে।
সাম্প্রতিক সময়ে লালমনিরহাট, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁওসহ বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় বিজিবি একাধিক কথিত পুশ-ইন প্রচেষ্টা প্রতিহত করার দাবি করেছে। লালমনিরহাটের বারখাতা, পৈশাট্টিবাড়ী ও দীঘলটারী সীমান্তে ৩৩ জনকে বাংলাদেশে প্রবেশ করানোর চেষ্টা প্রতিহত করার কথা জানানো হয়। একইভাবে চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার বঙ্গাবাড়ী সীমান্তে ২৮ জনসহ আরও কয়েকটি ঘটনার কথা প্রকাশ্যে আসে। এসব ঘটনায় নারী ও শিশুসহ কিছু মানুষ শূন্যরেখায় আটকা পড়েন এবং পরিচয় যাচাই ও প্রক্রিয়াগত বিষয়ে দুই সীমান্ত বাহিনীর মধ্যে আলোচনা হয়।
ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর উপজেলার মশালগাঁও সীমান্তে নারী ও শিশুসহ একটি দলকে বাংলাদেশে প্রবেশের চেষ্টা করা হলে পরিচয় যাচাই ছাড়া তাদের গ্রহণে বিজিবি আপত্তি জানায় বলে সংবাদে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব ঘটনা দেখায়, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা শুধু নিরাপত্তার বিষয় নয়; এর সঙ্গে নাগরিকত্ব যাচাই, প্রশাসনিক সমন্বয় এবং মানবিক ব্যবস্থাপনার জটিলতাও জড়িত।
২০২৬ সালের জুনে সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে অবৈধ বা জোরপূর্বক সীমান্ত পারাপার, সীমান্ত নিরাপত্তা, তথ্য বিনিময় ও সমন্বিত টহল জোরদারের বিষয়ে আলোচনা হয়। উভয় পক্ষ সীমান্তে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেয়।
তবে পুশ-ইন প্রসঙ্গকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ এই সীমান্তেই দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশি নাগরিক নিহত হয়ে আসছেন। সীমান্ত হত্যা বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের সবচেয়ে বেদনাদায়ক অধ্যায়গুলোর একটি।
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্যের বরাতে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতেও সীমান্তে প্রাণহানি অব্যাহত রয়েছে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে ৩১ জন, ২০২৪ সালে ৩০ জন এবং ২০২৫ সালে ৩৪ জন বাংলাদেশি নাগরিক বিএসএফের হাতে নিহত হওয়ার তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।
গত এক দশকে সীমান্ত হত্যার সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সংস্থার প্রতিবেদনে ভিন্নতা থাকলেও একটি বিষয় স্পষ্ট—দীর্ঘদিনের সীমান্ত সহিংসতা দুই দেশের জনগণের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে ২০০১–২০১১ সময়কালকে বিভিন্ন গবেষণা ও মানবাধিকার পর্যবেক্ষণে সীমান্ত উত্তেজনার জন্য উদ্বেগজনক সময় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
বাংলাদেশের বিভিন্ন সীমান্ত জেলা এসব ঘটনার কেন্দ্র হিসেবে বারবার উঠে এসেছে। লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী, পঞ্চগড়সহ উত্তরাঞ্চলের সীমান্ত এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, যশোর, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া ও সাতক্ষীরার মতো এলাকায় সীমান্ত অপরাধ, চোরাচালান ও অবৈধ পারাপারকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।
প্রশ্ন হলো, সীমান্তে মানুষ কেন মারা যায়? ভারতীয় পক্ষ সাধারণত চোরাচালান, অবৈধ অনুপ্রবেশ বা সীমান্ত আইন লঙ্ঘনের বিষয়কে এসব ঘটনার কারণ হিসেবে তুলে ধরে। অন্যদিকে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অবস্থান হলো—সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অধিকার রাষ্ট্রের থাকলেও নিরস্ত্র বেসামরিক মানুষের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগ সর্বশেষ ও ব্যতিক্রমী ব্যবস্থা হওয়া উচিত।
বাংলাদেশ বহুবার সীমান্ত হত্যা শূন্যে নামিয়ে আনার দাবি জানিয়েছে। দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকেও বিষয়টি আলোচিত হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সীমান্তে প্রাণহানি পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে কোনো ব্যক্তিকে অন্য রাষ্ট্রে ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণ করা জরুরি। নাগরিকত্ব যাচাই, প্রশাসনিক যোগাযোগ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ের মাধ্যমেই প্রত্যাবাসন সম্পন্ন হওয়ার কথা। একতরফা পুশ-ইনের অভিযোগ উঠলে তা শুধু সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন নয়, বরং আন্তর্জাতিক রীতি ও পারস্পরিক আস্থার প্রতিও চ্যালেঞ্জ তৈরি করে।
অন্যদিকে মানবিকতার প্রশ্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সীমান্তে আটকে পড়া মানুষদের মধ্যে নারী, শিশু ও অসহায় ব্যক্তিদের উপস্থিতি পরিস্থিতিকে আরও সংবেদনশীল করে তোলে। তারা কোনো রাষ্ট্রের কূটনৈতিক বিরোধের প্রতীক নয়; তারা প্রথমত মানুষ। তাই তাদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও মৌলিক অধিকার রক্ষা করা জরুরি।
বাংলাদেশের জন্য বর্তমান পরিস্থিতি একটি নীতিগত ভারসাম্যের পরীক্ষা। একদিকে সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে দৃঢ় অবস্থান রাখতে হবে, অন্যদিকে কূটনৈতিক সংলাপ ও সহযোগিতার পথও খোলা রাখতে হবে। পরিচয় যাচাই ছাড়া কাউকে গ্রহণ না করার নীতি যেমন রাষ্ট্রের বৈধ অধিকার, তেমনি সীমান্তে মানবিক সংকট তৈরি হলে দ্রুত ও কার্যকর সমাধানের ব্যবস্থাও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক শুধু সীমান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বাণিজ্য, জ্বালানি, নদী, যোগাযোগ ও আঞ্চলিক সহযোগিতার বিস্তৃত ক্ষেত্রে এই সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ। তাই সীমান্ত উত্তেজনা যেন বৃহত্তর দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত না করে, সে বিষয়ে উভয় দেশকেই দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
সীমান্ত কোনো সংঘাতের মঞ্চ নয়; এটি পারস্পরিক আস্থা, দায়বদ্ধতা ও সহাবস্থানের ক্ষেত্র। তাই পুশ-ইন ইস্যুর সমাধান কাঁটাতারের উত্তেজনায় নয়, বরং আন্তর্জাতিক আইন, কূটনৈতিক সংলাপ এবং মানবিক মূল্যবোধের ভিত্তিতেই খুঁজে নিতে হবে। একটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্রের শক্তি শুধু সীমান্ত রক্ষার সক্ষমতায় নয়, সীমান্তে মানবিক মর্যাদা রক্ষার সক্ষমতার মধ্যেও প্রকাশ পায়।
লেখক: শিক্ষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট

