প্রিন্ট এর তারিখ: সেপ্টেম্বর ৫, ২০২৬, ৪:৪৬ পি.এম. || প্রকাশের তারিখ: সেপ্টেম্বর ৪, ২০২৬, ৯:৫৮ পি.এম.

মানুষ ম/র/ছে, সমাজ তাকিয়ে আছে—রাষ্ট্র কি অসহায়, নাকি কাঠামোগত ব্যর্থতার নির্মম বহিঃপ্রকাশ?

মোঃ ইলিয়াস হোসেন মাঝি, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক:

একটি গণতান্ত্রিক ও কল্যাণকামী রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি হলো তার নাগরিকরা। রাষ্ট্র গঠিত হয় মানুষের জীবন, সম্পদ এবং মৌলিক অধিকার রক্ষা করার সামাজিক চুক্তির মাধ্যমে। কিন্তু যখন সমাজে একের পর এক সংকট ঘনিভূত হয়, প্রতিদিন মানুষের জীবন বিপন্ন হয় এবং সমাজ এক বুক আশা নিয়ে বুক বেঁধেও কেবল অন্ধকারের মুখোমুখি হয় তখন প্রশ্ন জাগে – রাষ্ট্র কি সত্যিই অসহায় ? এই প্রশ্নটি কেবল রাজনৈতিক নয় বরং গভীর মানবিক ও অস্তিত্ব সংকটের রূপ নিয়েছে।

রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো তার নাগরিকদের জীবনের নিরাপত্তা দেওয়া। সমাজ যখন আইন শৃঙ্খলার অবনতি, অর্থনৈতিক স্থবিরতা, স্বাস্থ্য খাতের ধস কিংবা বিচার হীনতার সংস্কৃতিতে নিমজ্জিত হয় তখন মানুষ প্রথম আশ্রয় খোঁজে রাষ্ট্রের কাছে। সমাজ আশা করে রাষ্ট্র তার শাসন যন্ত্র ব্যবহার করে সংকট দূর করবে। কিন্তু বাস্তব চিত্রে দেখা যায়, সংকটের তীব্রতায় সমাজ যখন দিশেহারা, রাষ্ট্র তখন নিষ্ক্রিয় বা ধীরগতির। এই পরিস্থিতিতে সমাজের মানুষের মনে এক তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা তৈরি হয়, যা রাষ্ট্র যন্ত্রের কার্যকারিতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে।

পুলিশ, বিচার বিভাগ, স্বাস্থ্য খাত কিংবা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এই মৌলিক প্রতিষ্ঠানগুলো যদি স্বাধীনভাবে ও দক্ষতার সাথে কাজ করতে না পারে, তবে যে কোন সংকটে রাষ্ট্র ভেঙে পড়ে। এই প্রতিষ্ঠানিক পঙ্গুত্ব রাষ্ট্রের ব্যর্থতার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।

রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো যখন দুর্নীতিতে নিমজ্জিত হয়। তখন সাধারণ মানুষের অধিকার হরণ করা সহজ হয়। সম্পদের সঠিক ব্যবহার না হয়ে তা যখন কতিপয় মানুষের পকেটে যায় তখন রাষ্ট্র জনগণের রক্ষাকর্তার ভূমিকা হারিয়ে ফেলে।

যখন সমাজ পথ চেয়ে তাকিয়ে থাকে অথচ রাষ্ট্রের কোন সাড়া মেলে না, তখন বুঝতে হবে শাসক শ্রেণী এবং সাধারণ জনগণের মধ্যে এক বিশাল দূরত্ব তৈরি হয়েছে। রাষ্ট্র তখন কেবল কাগজে-কলমে বা ক্ষমতা বানদের স্বার্থ রক্ষার হাতিয়ারে পরিণত হয়। সাধারণ মানুষের জীবন যেখানে কেবলই পরিসংখ্যান, কোন মূল্যবান সত্তা নয়। এই বিচ্ছিন্নতাই প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্র তার মূল লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয়েছে এবং এটি তার প্রশাসনিক ও নৈতিক ব্যর্থতা‌

তাত্ত্বিকভাবে রাষ্ট্র কখনোই অসহায় হতে পারে না। একটি রাষ্ট্রের হাতে থাকে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, সামরিক বাহিনী, বিশাল অর্থনৈতিক তহবিল এবং নীতি নির্ধারণের অসীম ক্ষমতা। রাষ্ট্র চাইলে যেকোনো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগ করতে পারে। কিন্তু বাস্তব চিত্র অনেক সময় ভিন্ন হয়। যখন সুশাসনের অভাব, দুর্নীতি, আমলা তান্ত্রিক জটিলতা এবং সঠিক পরিকল্পনার ঘাটতি দেখা দেয়, তখন রাষ্ট্রকে  আপাত দৃষ্টিতে অসহায় বা অকার্যকর বলে মনে হয়। মূলত রাষ্ট্রের এই অসহায়ত্ব কোন প্রাকৃতিক বা জন্মগত দুর্বলতা নয়। এটি হলো অব্যবস্থাপনার একটি রূপ।

মানুষ মরবে আর সমাজ নির্বাক দর্শক হয়ে পথ চেয়ে থাকবে – একটি সুস্থ ও স্বাধীন রাষ্ট্রে এটি কখনোই কাম্য হতে পারে না। রাষ্ট্রের হাতে যে ক্ষমতা এবং সম্পদ থাকে, তা সঠিকভাবে ব্যবহার করলে কোন পরিস্থিতিই তাকে অসহায় করতে পারে না।

রাষ্ট্রের এই তথাকথিত অসহায়ত্ব কোন নিয়ম নয়। বরং এটি সুশাসনের অভাব, নীতি হীনতা এবং জবাবদিহি হীনতার কারণে সৃষ্ট সামগ্রিক ব্যর্থতারই এক নির্মম বহিঃপ্রকাশ। রাষ্ট্রকে যদি তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হয় তবে এই ব্যর্থতা স্বীকার করে অবিলম্বে জনগণের অধিকার ও নিরাপত্তা ফিরিয়ে দেওয়ার কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। তবেই সমাজ ফিরে পাবে তার আস্থা আর রাষ্ট্র ফিরে পাবে তার আসল সার্থকতা।