প্রিন্ট এর তারিখ: আগস্ট ৩১, ২০২৬, ৫:৩৫ পি.এম. || প্রকাশের তারিখ: আগস্ট ২১, ২০২৬, ৯:২৯ পি.এম.

ধর্ষণ কোন ভুল নয়, এটি একটি জঘন্য অপরাধ – ইলিয়াস হোসেন মাঝি

নিজস্ব প্রতিনিধি:

বিচারের বার্তা নিভৃতে কাঁদে রাষ্ট্রের ব্যর্থতায়। অপরাধের সামাজিক প্রতিরোধে ঘাটতির দায় সমাজের। ব্যক্তির দোষ অনেকটাই পরিবারের। ধর্ষণের দায় ও নিতে হবে এই তিন পক্ষকেই।

ধর্ষণ হল সম্মতি ছাড়া বল প্রয়োগের মাধ্যমে ঘটিত একটি জঘন্য যৌন নিপীড়ন ও অপরাধ। যা মানবতার চরম লঙ্ঘন। এটি কেবল শারীরিক নির্যাতন নয় বরং শিকারীর মানসিক ও সামাজিক জীবনকে চিরতরে ধ্বংস করে দেয়। সমাজ থেকে এই অপরাধ রোধে কঠোর আইন প্রয়োগ, নৈতিক শিক্ষা ও সামাজিক সচেতনতা অপরিহার্য।

অপরাধী সে যে বয়সেরই হোক, তাকে পাকড়াও করার দায়িত্ব পুলিশের। বিচার করবেন আদালত। তাই শুধুই বাবা-মায়ের দোষ খুঁজলে কর্তব্য শেষ হয়ে যায় না। কারণ অপরাধ হয়ে গেলে দায়িত্ব চলে আসে নিরাপত্তা প্রশাসন ও বিচারালয়ের হাতে। তাই ধর্ষকের মতো অপরাধী ধরার বিষয়ে দক্ষতার পরিচয় দিতে হবে পুলিশকে। করতে হবে যথাযথ তদন্ত। আর অপরাধ চূড়ান্ত করবে আদালত। ধর্ষকের সাজা কেমন হবে সেটার এখতিয়ার ও তাদের। কিন্তু অপরাধীকে যদি ধরাই না যায় কিংবা তদন্ত ও বিচার কাজ যদি বছরের পর বছর চলে যায় তবে তার ভুক্তভোগীর ভোগান্তির মাত্রা লম্বাই হতে থাকে।

পুলিশ ও আদালতের ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে প্রধান ভূমিকা রাখতে হবে রাষ্ট্রকে। কারণ বর্তমান ব্যবস্থায় সবকিছু সার্বভৌম রাষ্ট্রের অধিকারে। ধর্ষণের দায় ও তাই কোনভাবেই এড়াতে পারে না তারা। কারণ ধর্ষক ও তার নাগরিক। তাকে সঠিক নাগরিক করতে না পারার ব্যর্থতা পরিবার ও সমাজের পাশাপাশি রাষ্ট্রেরও।

ধর্ষণ মানব সভ্যতার ইতিহাসে এক কলঙ্কজনক অধ্যায়। এটি ব্যক্তির স্বাধীনতা, সম্মান এবং মৌলিক মানবাধিকারের ওপর সরাসরি আঘাত। দিন দিন এই সামাজিক সমস্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় আজ নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।

একাত্তরে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর মধ্যে ছিল অনেক ধর্ষক ও। তাদের শিকার হয় অন্তত দুই লক্ষ ত্রিশ হাজার নারী। নিপীড়িত এই নারীদের সম্মান জানানোর সময় এদেশের অনেক বক্তার দল প্রায়ই সম্ভ্রমহানি শব্দটি প্রয়োগ করে থাকেন। এখানে সম্ভ্রামহানি আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় ধর্ষকের লজ্জার ভাগ নিতে হয় ধর্ষণের শিকার নারীকেই। অথচ অন্যান্য অপরাধের ক্ষেত্রে দোষ বলুন, লজ্জা বলুন সবই অপরাধীর।

ধর্ষণের কারণ –

১/ নৈতিকতার অবক্ষয়: সমাজের ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার অভাব অপরাধ প্রবণতা বাড়িয়ে দিচ্ছে।
২/ আইনের প্রয়োগের দীর্ঘসূত্রতা: বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও অপরাধীদের সময়মতো শাস্তি না হওয়া।
৩/ পর্নোগ্রাফি ও অপসংস্কৃতি: অবাধ তথ্য প্রযুক্তির অপব্যবহার এবং অশ্লীল বিনোদন যুব সমাজকে বিপথগামী করছে।
৪/ পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা: নারীর প্রতি অবমূল্যায়ন এবং ক্ষমতার অপব্যবহার করার মানসিকতা।

সমাজের প্রভাব –

১/ শারীরিক ক্ষতি: শিকারকে মারাত্মক শারীরিক আঘাত, জটিল রোগ এবং অনেক ক্ষেত্রে অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণের শিকার হতে হয়।
২/ মানসিক ট্রমা: ভুক্তভোগী আজীবন ভয়, লজ্জা, বিষন্নতা, মানসিক অবসাদ এবং মানসিক চাপ বা ট্রমার মধ্যে থাকে।
৩/ সামাজিক অবক্ষয়: সমাজ অনেক সময় অপরাধীকে বাদ দিয়ে ভুক্তভোগীকে দোষারোপ করে যা পরিস্থিতি আরো জটিল করে তোলে।

প্রতিকার ও প্রতিরোধ –

১/ কঠোর আইন ও দ্রুত বিচার: ধর্ষণ রোধে বিদ্যমান আইনের নিরপেক্ষ ও দ্রুত প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
২/ সামাজিক আন্দোলন: অপরাধীদের সামাজিক এবং আইনগতভাবে বয়কট করতে হবে এবং প্রতিবাদ গড়ে তুলতে হবে।
৩/ সচেতনতা বৃদ্ধি: পরিবার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছোটবেলা থেকেই নৈতিক শিক্ষা ও নারীর সম্মান শেখাতে হবে।

ধর্ষণ একটি সাধারণ অপরাধ নয় এটি মানবতা বিরোধী অপরাধ। এই সমস্যা থেকে সমাজকে মুক্ত করার জন্য সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে এবং একটি নিরাপদ বাসযোগ্য দেশ গঠন করতে হবে।