প্রিন্ট এর তারিখ: জুলাই ১, ২০২৬, ১০:০৮ পি.এম. || প্রকাশের তারিখ: জুলাই ১, ২০২৬, ৬:৫২ পি.এম.

হোলি আর্টিজান হামলার ১০ বছর: স্মরণে এখনও সেই ২০ নিরপরাধ প্রাণ

মো: আল-মাহফুজ শাওন:

বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা হিসেবে পরিচিত গুলশানের হোলি আর্টিজান বেকারি হামলার ১০ বছর পূর্ণ হলো আজ, ১ জুলাই।

২০১৬ সালের এই দিনে রাজধানীর গুলশান-২ এর কূটনৈতিক এলাকায় অবস্থিত হোলি আর্টিজান বেকারিতে সংঘটিত নৃশংস হামলায় দেশি-বিদেশি ২০ জন নিরপরাধ মানুষ নিহত হন। রাতভর জিম্মি সংকট, হত্যাযজ্ঞ এবং পরদিন ভোরে সেনাবাহিনীর কমান্ডো অভিযানের মধ্য দিয়ে ওই ভয়াবহ ঘটনার অবসান ঘটে।

 ২০১৬ সালের ১ জুলাই ইফতারের পর একদল সশস্ত্র তরুণ গুলশান-২ এর ৭৯ নম্বর সড়কে অবস্থিত হোলি আর্টিজান বেকারিতে প্রবেশ করে উপস্থিত অতিথি ও কর্মীদের জিম্মি করে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভাষ্য অনুযায়ী, হামলাকারীরা নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন নব্য জেএমবির সদস্য ছিল।

 রাতভর জিম্মি পরিস্থিতির পর ২ জুলাই ভোরে সেনাবাহিনীর বিশেষ কমান্ডো দল অভিযান পরিচালনা করে। অভিযানে পাঁচ হামলাকারী নিহত হয়। তারা হলেন— নিবরাজ ইসলাম, শফিকুল ইসলাম (উজ্জ্বল), মীর সামেহ মোবাশ্বের, রোহান ইবনে ইমতিয়াজ এবং খায়রুল ইসলাম (পায়েল)। হামলার কয়েকদিন আগেই তারা নিজ নিজ বাসা থেকে নিখোঁজ হয়েছিলেন বলে তদন্তে উঠে আসে।

 হামলাকারীদের হাতে নিহত হন ৯ জন ইতালীয়, ৭ জন জাপানি, একজন ভারতীয়, দুজন বাংলাদেশি এবং একজন বাংলাদেশি-আমেরিকান নাগরিক। এছাড়া হামলা প্রতিরোধে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে দুই পুলিশ কর্মকর্তা জীবন উৎসর্গ করেন।

নিহত ওই দুই পুলিশ কর্মকর্তার স্মরণে গুলশান থানার সামনে নির্মিত ‘দীপ্ত শপথ’ ভাস্কর্যটি ২০২৪ সালের আন্দোলনের সময় ভেঙে ফেলা হয়। এক বছর পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত ভাস্কর্যটি পুনর্নির্মাণ করা হয়নি।

 হামলার পরবর্তী কয়েক বছর ধরে প্রতিবছর নিহতদের স্মরণে বাংলাদেশ পুলিশ, ইতালি দূতাবাস ও জাপান দূতাবাস পৃথকভাবে শ্রদ্ধা নিবেদন করে আসছিল। তবে গত বছর ঘটনাস্থলে এমন কোনো আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি দেখা যায়নি। এ বছর ইতালি দূতাবাসের উদ্যোগে বিভিন্ন দেশের দূতাবাসের সমন্বয়ে একটি স্মরণসভা আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে হোলি আর্টিজানের মূল ঘটনাস্থলে কোনো আনুষ্ঠানিক শ্রদ্ধা নিবেদনের কর্মসূচি রাখা হয়নি।

 এই হামলায় বিপুলসংখ্যক বিদেশি নাগরিক নিহত হওয়ায় ঘটনাটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয় এবং বাংলাদেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়।

ঘটনার পর গুলশান থানায় দায়ের হওয়া মামলার তদন্ত শেষে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া শেষে ২০১৯ সালের ২৭ নভেম্বর ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনাল সাত আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেন।

 তবে ২০২৩ সালের ৩০ অক্টোবর ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের রায়ে হাইকোর্ট তাদের সবার মৃত্যুদণ্ড বাতিল করে আমৃত্যু কারাদণ্ডে রূপান্তর করেন।

 আমৃত্যু কারাদণ্ডপ্রাপ্ত সাতজন হলেন— জাহাঙ্গীর হোসেন (রাজীব গান্ধী), আসলাম হোসেন (র‌্যাশ), হাদিসুর রহমান, রাকিবুল হাসান (রিগ্যান), আব্দুস সবুর খান, শরিফুল ইসলাম (খালেদ) এবং মামুনুর রশিদ রিপন।

 এদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি অনুযায়ী, হামলার মূল পরিকল্পনাকারীদের অধিকাংশই পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন অভিযানে নিহত হয়েছেন।

 এক দশক পেরিয়ে গেলেও হোলি আর্টিজান হামলা বাংলাদেশের ইতিহাসে সন্ত্রাসবাদের ভয়াবহতার এক বেদনাদায়ক অধ্যায় হিসেবে স্মরণীয় হয়ে রয়েছে। নিহতদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে দেশবাসী সন্ত্রাস ও উগ্রবাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ থাকার প্রত্যয় পুনর্ব্যক্ত করছে।