প্রিন্ট এর তারিখ: আগস্ট ৩১, ২০২৬, ৬:৪৯ পি.এম. || প্রকাশের তারিখ: আগস্ট ৭, ২০২৬, ৪:০৮ পি.এম.

ওভারটেকিং এর প্রতিযোগিতায় আবারও রক্তাক্ত মহাসড়ক

সৈয়দ আমান উল্লাহ, স্টাফ রিপোর্টারঃ

‘ইউনিক’ নাকি ‘বেঙ্গল’—কাউনের বেপরোয়া চালনায় ঝরল ৮ প্রাণ? তদন্তে মিলবে উত্তর

বাংলাদেশের মহাসড়কে যেন মৃত্যু এখন নিত্যসঙ্গী। অতিরিক্ত গতি, বেপরোয়া ওভারটেকিং, চালকদের অসুস্থ প্রতিযোগিতা এবং ট্রাফিক আইন অমান্যের ভয়াবহ পরিণতি আবারও দেখল দেশ। দুটি যাত্রীবাহী বাসের ওভারটেকিংকে কেন্দ্র করে ঘটিত মারাত্মক সড়ক দুর্ঘটনায় অন্তত ৮ জন নিহত এবং বহু যাত্রী আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে নারী ও পুরুষ উভয়েই রয়েছেন। আহতদের কিছুজনের অবস্থার কারণে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন।

দুর্ঘটনার পর মুহূর্তেই ঘটনার স্থলে সৃষ্টি হয় হৃদয় বিদারক দৃশ্য। দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া যানবাহনের ভেতরে আটকে পড়া যাত্রীদের আর্তনাদ, স্বজনদের আহাজারি এবং চারদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ব্যক্তিগত মালামাল যেন এক বিভীষিকাময় চিত্রের সৃষ্টি করে। স্থানীয় বাসিন্দারা নিজেদের ঝুঁকি নিয়ে উদ্ধার কাজে অংশগ্রহণ করেন। পরে ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ ও অন্যান্য উদ্ধারকারী সংস্থার সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে আহতদের উদ্ধার করে বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠান।

প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, দুর্ঘটনার আগে ইউনিক পরিবহন ও বেঙ্গল পরিবহন-এর দুটি বাস দ্রুত গতিতে একে অপরকে ওভারটেক করার চেষ্টা করছিল। সেই প্রতিযোগিতায় এক পর্যায়ে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ভয়াবহ দুর্ঘটনার সূত্রপাত ঘটে। তবে দুর্ঘটনার জন্য ঠিক কোন বাস বা চালকের অবহেলা দায়ী, সে বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত বক্তব্য দেয়নি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। বিষয়টি তদন্তের আওতাধীন।

দুর্ঘটনার পর মহাসড়কে দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়। পুলিশ দুর্ঘটনাকবলিত যানবাহন সরিয়ে যান চলাচল স্বাভাবিক করে। একই সঙ্গে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে প্রয়োজনীয় আলামত সংগ্রহ এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য গ্রহণ করা হচ্ছে।

সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে অধিকাংশ ভয়াবহ বাস দুর্ঘটনার পেছনে রয়েছে অতিরিক্ত গতি, বেপরোয়া ওভারটেকিং, চালকদের দীর্ঘ সময় বিরতিহীন গাড়ি চালানো, ফিটনেসবিহীন যানবাহন এবং দুর্বল তদারকি ব্যবস্থা। অনেক পরিবহনের চালক যাত্রী ওঠানো এবং নির্ধারিত সময়ের আগে গন্তব্যে পৌঁছানোর প্রতিযোগিতায় ঝুঁকিপূর্ণভাবে গাড়ি চালান, যা প্রায়ই প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, মহাসড়কে প্রতিদিনই পরিবহনগুলোর মধ্যে ওভারটেকিংয়ের প্রতিযোগিতা চলে। প্রশাসনের চোখের সামনে এসব ঘটনা ঘটলেও কার্যকর ব্যবস্থা খুব কমই দেখা যায়। দুর্ঘটনার পর কিছুদিন অভিযান পরিচালিত হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই কার্যক্রম শিথিল হয়ে পড়ে। ফলে একই ধরনের দুর্ঘটনা বারবার ঘটছে।

নিহতদের স্বজনরা এ ঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং আহতদের সর্বোচ্চ চিকিৎসা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি তারা মহাসড়কে কঠোর নজরদারি, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা এবং পরিবহন খাতে জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানান।

প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটনে তদন্ত চলছে। তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের পর দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তাই তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কোনো নির্দিষ্ট পরিবহন বা চালককে দায়ী করে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যুক্তিযুক্ত নয়।

দেশের প্রতিটি সড়ক দুর্ঘটনা শুধু কয়েকটি প্রাণহানির ঘটনা নয়; এটি একেকটি পরিবারের স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার ইতিহাস। নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, পরিবহন মালিক-শ্রমিক, চালক এবং যাত্রী—সবার সম্মিলিত দায়িত্বশীল ভূমিকা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।