প্রিন্ট এর তারিখ: আগস্ট ৩১, ২০২৬, ৯:২৬ পি.এম. || প্রকাশের তারিখ: ফেব্রুয়ারীর ২৮, ২০২৬, ৪:৫৭ পি.এম.

মানব পাচারকারী চক্রের খপ্পরে  মাদারীপুরের নিরীহ সাধারণ মানুষ

মোঃ রেজাউল করিম, মাদারীপুর জেলা প্রতিনিধিঃ

মানব পাচারকারী চক্র বেড়ে চলেছে। সাধারণ মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়ছে। নিরীহ যুবকরা জীবন দিচ্ছে— কেউ সাগর পার হতে গিয়ে, কেউ শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়ে। পরিবারগুলো সন্তান হারাচ্ছে।

মাদারীপুরে একটি চক্র—এমদাদের দালালদের বিরুদ্ধে চাঞ্চল্যকর তথ্য, ভিডিও ফুটেজ ও অডিও বার্তা এসেছে। ফুটেজ দেখলে ভয়েরশলে আসে। ভুক্তভোগী আকলিমা জানায়, মানব পাচারকারী চক্রের সদস্য এমদাদসহ এনামুল হক, লাভলু মাতুব্বর, বাবলু মাতুব্বর, ইঞ্জি বেগম (পিতা: মজিদ মাতুব্বর), সুমা আক্তার (স্বামী: এমদাদুল মাতুব্বর), মেরাজ তালুকদার (পিতা: আব্দুর রাজ্জাক তালুকদার), সাং—রাম রানাদিয়া, ঘটমাঝি, মাদারীপুর; মজিবর বেপারী (পিতা: মৃত মদন বেপারী), সাং—কুকরাইল, সর্ব সং মাদারীপুর।

আমার বড় বোনের ছেলে মোহাম্মদ হাওলাদারকে ১৬ লক্ষ টাকায় পর্তুগাল পাঠানোর প্রস্তাব দিয়ে এমদাদ দালাল পাসপোর্টের সঙ্গে ৫ লক্ষ টাকা নেয়। পরবর্তী ৫/৬ মাস পরে পারমিটের জন্য আরও ৮ লক্ষ টাকা নেয় এবং ইসলামি ব্যাংকের মাধ্যমে ১০ লক্ষ টাকা নেয়—মোট ২০ লক্ষ টাকা।

এরপর পর্তুগাল নয় বলে তালবাহানা শুরু করলে আমরা টাকা ফেরত চাই। তখন এমদাদ দালাল বলে, লিবিয়া হয়ে ইতালি পাঠাবে। এজন্য আরও ২০ লক্ষ টাকা দিতে হবে। আমরা রাজি হই এবং ২০ লক্ষ টাকা দিই।

লিবিয়ায় কাজ দেওয়ার কথা বলে এমদাদের স্ত্রী তানিয়া আক্তার ৩ লক্ষ টাকা এবং মেরাজ তালুকদার ও মজিবর বেপারী আরও ৪ লক্ষ টাকা নেন। টাকা নিয়ে আমার বোনের ছেলে মোহাম্মদ হাওলাদারকে লিবিয়ার মাফিয়াদের কাছে বিক্রি করে দেয়। মাফিয়ারা নির্মমভাবে শারীরিক নির্যাতন করে তার ভিডিও আমাদের মোবাইলে পাঠিয়ে মুক্তিপণের দাবি করে।

বোনের ছেলেকে বাঁচাতে আমরা বিভিন্ন ব্যাংকের মাধ্যমে ৩৬ লক্ষ টাকাসহ মোট ৬৬ লক্ষ টাকা প্রদান করি। তবে শারীরিক নির্যাতন শেষ হয়নি। এক পর্যায়ে আমার বোনের ছেলে বন্দী কক্ষের জানালা ভেঙে পালাতে সক্ষম হয়।

আমরা দালালদের কাছে জানতে চাইলে তারা নানা ধরনের তালবাহানা ও সময়ক্ষেপণ করে। আইন মেনে আমরা আদালতে মামলা করি। এতে দালালরা আরও রেগে আমাদের প্রাণনাশের হুমকি দেয় এবং আমাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা করে হয়রানি করে আসছে।

ভুক্তভোগী নুরজাহান বেগম বলেন, আমার ছেলে নুর ইসলাম মাতুব্বরকে ২১ লক্ষ টাকার বিনিময়ে লিবিয়া হয়ে ইতালি পৌঁছাবার কথা বলেন। আমরা সহজে রাজি হই এবং পাসপোর্টের সঙ্গে এমদাদ দালাল গংদের হাতে (এসমোতারা বেগম, মজিবর বেপারী, ফুলি বেগম ও পপি আক্তার) ১৫ লক্ষ টাকা দিই।

কিছুদিন পর দুবাই নিয়ে লিবিয়ার কথা বলে আরও ৫ লক্ষ টাকা নেন। লিবিয়ায় আমার ছেলেকে কোনো কাজ না দিয়ে মাফিয়ার কাছে বিক্রি করে দেয়। মাফিয়ারা নির্যাতনের ভিডিও ধারণ করে ৩০ লক্ষ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে।

ছেলেকে বাঁচাতে ব্যাংক লোন, এনজিও লোন এবং সুদে টাকা এনে ৩০ লক্ষ টাকা পরিশোধ করি। সর্বমোট ৫১ লক্ষ টাকা আমাদের কাছ থেকে বিভিন্নভাবে ছিনিয়ে নেয় এমদাদ দালাল গং।

এত টাকা দেওয়ার পরও মাফিয়ারা আমার ছেলেকে নানা ভাবে নির্যাতন করে ফেলে রেখে যায়। আমি দালালদের টাকা ফেরত চাইলে তারা রেগে বলে, “টাকা নিতে পারলে নিয়ে নিস।” আইন মেনে আদালতে মামলা করলে দালালরা আমাদের পরিবারের ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে হুমকি দিতে থাকে এবং পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা করে হয়রানি করছে। আমি আইনের কাছে সঠিক বিচারের দাবি জানাই এবং দালালদের কঠোর শাস্তির দাবি করছি।

ভুক্তভোগী নুসরাত জাহান এনি বলেন, মেরাজ তালুকদার, মজিবর বেপারী, এসমোতারা, ফুলি বেগম ও পপি আক্তার—এরা সকলেই এমদাদ দালালের সহায়ক। এরা আমার ছেলে শাহরিয়ার মাহমুদ তুষারকে ১০ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে লিবিয়া হয়ে ২০ লক্ষ টাকায় ইতালিতে পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে পাসপোর্টের সঙ্গে ১৬ লক্ষ টাকা নেয়। ১০ দিন পরে দুবাই নিয়ে লিবিয়ার কথা বলে বাকি ৪ লক্ষ টাকা নিয়ে যায় এবং আমার ছেলেকে লিবিয়ার দালালদের কাছে দেয়।

আমার ছেলেকে শারীরিক নির্যাতন করে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ভয়েস বার্তা পাঠিয়ে বলে ১৫ লক্ষ টাকা না দিলে তাকে মেরে ফেলবে। ছেলের জীবন বাঁচাতে গরু-বাছুরসহ সব বিক্রি করে ১৫ লক্ষ টাকা পাঠাই। ছেলেকে দেশে না পাঠিয়ে আবার নির্যাতন করে ২০ লক্ষ টাকা দাবি করে। ছেলের জীবন বাঁচাতে জমি, স্বর্ণালংকার ও ব্যাংকের ঋণের মাধ্যমে ২০ লক্ষ টাকা পাঠাই। মোট ৫৫ লক্ষ টাকা নেওয়ার পর আমার ছেলেকে মুমূর্ষু অবস্থায় ফেলে রাখে।

পরে আমি অন্য লোকের মাধ্যমে আমার ছেলেকে উদ্ধার করে ইতালিতে পাঠাই। পুনরায় এমদাদ দালালদের কাছে টাকা ফেরত চাইলে তারা অস্বীকার করে। এরপর আমি আদালতে মামলা করি। মামলা করার পর দালালরা আমার নামে মিথ্যা মামলা করে এবং পরিবারের সদস্যদের প্রাণনাশের হুমকি দিচ্ছে।

ভুক্তভোগীরা বলেন, আমরা আইনকে শ্রদ্ধা করি। আইনের কাছে আমাদের আবেদন—আমরা যেন সঠিক বিচার পাই। এমদাদ দালালদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে বিচার করা হোক।

০৬/১২/২৫ সংবাদ সম্মেলন।