Site icon দৈনিক নবদিগন্ত

বিচারহীনতার শোক ও আইনের প্রতি বিশ্বাস হারানোর ট্র্যাজেডি

বিচারহীনতার শোক ও আইনের প্রতি বিশ্বাস হারানোর ট্র্যাজেডি

এম টি রহমান মাহমুদ, গোপালগঞ্জঃ

“আমি বিচার প্রত্যাশা করছি না, কারণ আপনারা বিচার করতে সক্ষম নন। আমার মেয়েও ফিরে ফিরবে না। আপনারা যে বিচারের উদাহরণ দিতে পারবেন, তা নেই। এটি খুব বেশি ১৫ দিন চলবে, তারপর আবার কিছু ঘটবে, এবং এর পর সব কিছু চাপা পড়ে যাবে।”

রাজধানীর পল্লবী এলাকায় নির্মমভাবে খুন হওয়া একজন দ্বিতীয় শ্রেণীর শিক্ষার্থী রামিসার বাবার আবদুল হান্নান মোল্যার প্রকাশিত উক্তি সাধারণ ক্ষোভের প্রকাশ নয়। এটি একটি রাষ্ট্রের বিচারহীনতার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে একজন অসহায় পিতার রক্তাক্ত হৃদয়ের আকূতি। যে বিচার ব্যবস্থার ওপর একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র পরিচালিত হয়, যখন সেই ব্যবস্থার প্রতি একজন যন্ত্রণা ভোগী পিতার এতো গভীর অনাস্থা তৈরি হয়, তখন তা পুরো জাতির জন্য অশনি সংকেতের ভূমিকা পালন করে।

গণতান্ত্রিক সরকারের ভিত্তি হল আইন শাসন। কিন্তু যখন একের পর এক বর্বরতা ঘটে এবং মানুষ বিচার চেয়ে বছরের পর বছর হতাশায় ভুগে, তখন আবদুল হান্নান মোল্যার মতো সাধারণ মানুষের মুখ থেকে এমন করুণ সত্য বেরিয়ে আসে। বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘ আলাপচারিতা, অপরাধীর জন্য শাস্তির অভাব এবং ঘটনাগুলোর অব্যাহত পুনরাবৃত্তি সমাজকে একটি অস্বস্তিকর মানসিক অবস্থায় ফেলে দিয়েছে। মনে হয়, একটি বড় ঘটনার স্থায়িত্ব মাত্র ১৫ দিন; এরপর মিডিয়ার শিরোনাম পরিবর্তিত হয়, গণমনে ট্র্যাজেডির চিহ্ন মুছে যায় এবং বিচার বহুদিনের অন্ধকারে চলে যায়।

রামিসার বাবার অভিযোগে একটি ভয়াবহ ভবিষ্যতের সংকেত রয়েছে। তিনি উল্লেখ করেছেন, নীতি নির্ধারকেরা যদি এখন সচেতন না হন, তবে মানুষ আইন নিজ হাতে নিতে ইচ্ছুক হতে পারে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অধীনে আইন নিজের হাতে নেওয়ার কোনো সাংবিধানিক অধিকার নেই। তবে যদি রাষ্ট্র নাগরিকদের নিরাপত্তা ও সুবিচারের অধিকার রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়, তখন মানুষ প্রচলিত আইন ছেড়ে প্রতিশোধের পথ গ্রহণকে শেষ উদ্ধার খুঁজে পেতে শুরু করে।

এখন নীতিনির্ধারকদের নিজেদের মুখ আয়নায় দেখার সময় এসেছে। রামিসা নামে সাত বছরের এই নিষ্পাপ শিশুর মৃত্যুর ফলে দেশজুড়ে বিবেকের দানা দানা হয়েছে। কিন্তু শুধুমাত্র তাত্ক্ষণিক ক্ষোভ, তদন্তের প্রতিশ্রুতি বা উদ্বোধনী পদক্ষেপ দিয়ে এই গভীর ক্ষত নিরাময় সম্ভব নয়। বিচার ব্যবস্থাকে এমন জায়গায় নিয়ে যেতে হবে, যাতে কোনো পিতাকে বলতে না হয়- ‘আপনারা বিচার করতে পারবেন না’! যদি প্রক্রিয়াগুলি চাপা দেওয়ার আগে পদক্ষেপ নেওয়া হয়, যদি দ্রুত এবং দৃশ্যমান বিচার নিশ্চিত করা হয়, এবং যদি শিশু নিরাপত্তাকে রাজনৈতিক উপহাস না করা হয়- তবেই এই হতাশার আগুন নিভানো সম্ভব। নচেৎ একদিন হয়তো আরো অনেক পিতা-মাতা একই কথাই উচ্চারণ করবেন। আর সেই মুহূর্তে আর কোনো কথাবার্তা ফল দেবে না।

রাষ্ট্র ও সরকারকে অবিলম্বে বিচারহীনতার এই চক্র ভেঙে ফেলতে হবে। আইন শাসন এবং সুবিচারকে শুধু কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ রেখে নয়, বাস্তবে কার্যকর করতে হবে, যাতে অপরাধীরা শাস্তির ভয় অনুভব করে এবং ভুক্তভোগীরা তাদের হারানো বিশ্বাস পুনরুদ্ধার করতে পারে। অন্যথায়, আইনের প্রতি এই অসন্তোষ একদিন পুরো সমাজকে বিশৃঙ্খলার অন্ধকারে নিমজ্জিত করবে। রামিসার বাবার যে সতর্কবাণী তা রাষ্ট্রকে শুনতেই হবে। অবশেষে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান রামিসার বাসায় গিয়ে বিচারের আশ্বাস প্রদান করেছেন এবং তার বোনের সব দায়িত্ব নেয়ার ঘোষণাও দিয়েছেন। এই মহান দায়িত্বে জাতি আশার বার্তা পাচ্ছে এবং একটি নিঃশ্বাস নিচ্ছে! সত্যিই কি বিচার হবে…? অপেক্ষায় রইলাম দেশের মানুষের আশা নিয়ে!

এই হত্যাকাণ্ডে নিজের স্ত্রীর সাথে সহযোগিতা করায় কঠিন শোক অনুভব হচ্ছে! বিবেক আজ কোথায়..? তিনি তো একজন মা ছিলেন! তবে কেন এই নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ড…?

Exit mobile version