Site icon দৈনিক নবদিগন্ত

তারাতলায় নির্মাণাধীন লোহার শেড ধস, হতাহত একাধিক শ্রমিক

তারাতলায় নির্মাণাধীন লোহার শেড ধস, হতাহত একাধিক শ্রমিক

সৌরভ দত্ত, কলকাতা :

কলকাতার ব্যস্ততম শিল্পাঞ্চল হিসেবে পরিচিত তারাতলা থানা এলাকার ব্রেস ব্রিজের কাছে এক ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে গেল।

বুধবার ভরদুপুরে আচমকাই একটি নির্মীয়মাণ বিশাল গুদামের বা গোডাউনের তিনতলার ওপরের ভারী লোহার শেড ও ছাদের একাংশ বিকট শব্দ করে ভেঙে পড়ে। মুহূর্তের মধ্যে পুরো এলাকা এক বিধ্বংসী রূপ ধারণ করে এবং চারপাশ ঘন ধুলোর চাদরে ঢেকে যায়। এই আকস্মিক ও মর্মান্তিক ঘটনায় এলাকায় তীব্র চাঞ্চল্য এবং আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি হয়েছে।

প্রাথমিক সূত্র থেকে জানা যাচ্ছে, ধ্বংসস্তূপের নিচে এবং বিশাল লোহার বিমের তলায় অনেক শ্রমিক আটকে পড়েছেন। বেশ কয়েকজন শ্রমিকের মৃত্যুর আশঙ্কা করা হচ্ছে এবং বহু মানুষ অত্যন্ত গুরুতর জখম হয়েছেন।

স্থানীয় বাসিন্দা এবং ওই কারখানায় কর্মরত অন্যান্য শ্রমিকদের সূত্রে জানা গেছে, তারাতলার ট্রান্সপোর্ট ডিপো রোডের সংলগ্ন ব্রেস ব্রিজ সংলগ্ন এলাকায় একটি নামী চায়ের কোম্পানির বিশাল আকারের গোডাউন তৈরির কাজ চলছিল বিগত প্রায় এক বছর ধরে। তিনতলা বিশিষ্ট এই পরিকাঠামোটির আধুনিকীকরণ এবং পুনর্নির্মাণের কাজ চলছিল বেশ কিছুদিন ধরে। বুধবার দুপুর ১টা ৩০ মিনিট নাগাদ যখন শ্রমিকরা প্রতিদিনের মতো সেখানে নিজেদের কাজে ব্যস্ত ছিলেন, ঠিক তখনই এই বিপর্যয়টি ঘটে।

প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, তিনতলা বিল্ডিংয়ের ওপরের দুই তলার ঢালাইয়ের কাজ আগেই সম্পন্ন হয়ে গিয়েছিল এবং ঘটনার সময় একদম নিচের তলার ছাদ ঢালাইয়ের কাজ করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন শ্রমিকরা। তখনই আচমকা ওপরের সম্পূর্ণ লোহার কাঠামো এবং টিনের শেডটি হুড়মুড়িয়ে হুড়মুড়িয়ে নিচের তলার দিকে ভেঙে পড়ে। হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ে গোটা পরিকাঠামোটি সরাসরি নিচে কর্মরত শ্রমিকদের ওপর আছড়ে পড়ে।

বিপর্যয়টি ঘটার সঙ্গে সঙ্গেই ওই চত্বরে হুড়োহুড়ি ও ব্যাপক কান্নাকাটি শুরু হয়ে যায়। ঘটনাস্থলে উপস্থিত সাধারণ মানুষ ও অন্যান্য কর্মীরা জানান, ঘটনার সময় গুদামের ভেতরে ২৫ থেকে ৩০ জন, আবার অনেকের মতে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ জন শ্রমিক উপস্থিত ছিলেন, যার মধ্যে মহিলারাও ছিলেন। ছাদ ধসে পড়ার পর থেকেই ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে আটকে থাকা মানুষদের বাঁচানোর জন্য তীব্র চিৎকার ও কাতর আর্জি ভেসে আসতে থাকে। বাইরে থাকা সহকর্মী ও স্থানীয় বাসিন্দারা ভেতর থেকে আটকে থাকা মানুষদের নাম ধরে ধরে ডেকে সাড়া পাওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা চালাতে থাকেন। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে যে, লোহার বিমের নিচে চাপা পড়ে থাকা বহু মানুষের হাত, পা এবং মাথা পুরোপুরি থেঁতলে গিয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। অনুমান করা হচ্ছে, বেশ কয়েকজনের মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।

দুর্ঘটনার খবর পাওয়া মাত্রই অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে ঘটনাস্থলে পৌঁছায় তারাতলা থানার পুলিশ প্রশাসন । এরপর পরিস্থিতির ভয়াবহতা আঁচ করে কলকাতা পুলিশের বিশেষ বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী দমকলের একাধিক ইঞ্জিন এবং উদ্ধারকারী দল দ্রুত উদ্ধারকাজে হাত লাগায়। লোহার বিশালাকার কাঠামো এবং কংক্রিটের ধ্বংসস্তূপ সরানোর জন্য দ্রুত একাধিক বুলডোজার বা জেসিবি এবং বড় বড় হাইড্রোলিক ক্রেন ঘটনাস্থলে নিয়ে আসা হয়েছে। ভারী লোহার বিম এবং টিনের শেড কেটে আটকে থাকা শ্রমিকদের সুরক্ষিতভাবে বের করে আনার জন্য নিয়ে আসা হয়েছে আধুনিক গ্যাস কাটার সরঞ্জাম। অত্যন্ত যুদ্ধকালীন তৎপরতায় ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ চালানো হচ্ছে, যাতে প্রতিটা মুহূর্তকে কাজে লাগিয়ে আটকে থাকা প্রাণগুলোকে দ্রুত বাঁচানো সম্ভব হয়। উদ্ধারে নামানো হয়েছে ভারতীয় সেনা, এনডিআরআফ, কলকাতা পুলিশ, পুরসভা এবং দমকলকে।

উদ্ধারকাজ শুরু হওয়ার পর থেকেই ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে একে একে আহত শ্রমিকদের উদ্ধার করে বাইরে আনা হতে থাকে। দুর্ঘটনাস্থলে একের পর এক অ্যাম্বুল্যান্স এসে পৌঁছায়। যে সমস্ত শ্রমিকদের গুরুতর জখম অবস্থায় বের করা সম্ভব হয়েছে, তাঁদের চিকিৎসার জন্য অবিলম্বে স্থানীয় এবং কলকাতার পিজি বা এসএসকেএম হাসপাতালে পাঠানো হচ্ছে। আহতদের মধ্যে বেশ কয়েকজনের অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক বলে জানা গেছে চিকিৎসকদের সূত্রে।

এই ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই রাজনৈতিক মহলেও আলোড়ন তৈরি হয়েছে। জানা গেছে, পরিস্থিতির তদারকি করতে এবং উদ্ধারকার্য খতিয়ে দেখতে রাজ্য সরকারের মন্ত্রী তথা স্থানীয় নেতৃত্ব দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছাচ্ছেন। একই সাথে প্রশাসনের তরফ থেকে গোটা ঘটনার ওপর কড়া নজরদারি চালানো হচ্ছে এবং নবান্নের পক্ষ থেকে একটি বিশেষ কন্ট্রোল রুমও খোলার তোড়জোড় করা হচ্ছে। দুর্ঘটনাস্থলে এসেছেন রাজ্যের মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল, ইন্দ্রনীল খাঁ।

এই ভয়াবহ দুর্ঘটনাটি ঘটার পর থেকেই স্থানীয় মহলে এবং শ্রমিক সংগঠনের মধ্যে ক্ষোভের পারদ চড়তে শুরু করেছে। অভিযোগ উঠছে, এই বিশাল আকৃতির তিনতলা গোডাউনটি নির্মাণের ক্ষেত্রে আদৌ সমস্ত প্রয়োজনীয় সুরক্ষা বিধি মানা হয়েছিল কি না, তা নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন চিহ্ন দেখা দিয়েছে।

স্থানীয় কিছু সূত্রের দাবি, কিছু দিন আগে নির্মাণের সময়ই এই পরিকাঠামোর একটি অংশ হালকা ভেঙে পড়েছিল, কিন্তু সেটিকে সঠিকভাবে মজবুত না করেই তড়িঘড়ি জোড়াতালি দিয়ে আবার কাজ শুরু করে দেওয়া হয়। যার ফলশ্রুতি হিসেবেই আজকের এই চরম বিপর্যয়। এই নির্মাণকাজটি সম্পূর্ণ আইনসম্মতভাবে এবং পুরসভার অনুমোদন মেনে করা হচ্ছিল কি না, নাকি এর পেছনে কোনো বড়সড় গাফিলতি বা বেআইনি নির্মাণচক্র জড়িয়ে রয়েছে, তা নিয়ে পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন উপস্থিত সাধারণ মানুষ ও স্থানীয় নেতৃত্বরা।

ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান করতে পুলিশ এবং ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ দল পরবর্তীতে তদন্ত প্রক্রিয়া এগিয়ে নিয়ে যাবে বলে জানা গেছে

Exit mobile version