Site icon দৈনিক নবদিগন্ত

তৃণমূলের অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে আর্থিক লেনদেন স্থগিত

তৃণমূলের অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে আর্থিক লেনদেন স্থগিত

সৌরভ দত্ত, বিশেষ প্রতিনিধি কলকাতা:

তৃণমূলের অস্থির অবস্থা। নির্বাচনের পর দলের মধ্যে অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। বহু সাংসদ এবং বিধায়ক বিদ্রোহ করে দল ত্যাগ করেছেন। দলের বেশ কয়েকজন নেতা, মন্ত্রী, কাউন্সিলর এবং বিধায়ক পুলিশ দ্বারা আটক হয়েছেন। ২৮ জন সাংসদের মধ্যে ২০ জন এবং ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে ৫৮ জন প্রকাশ্যে দলের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। বিশৃঙ্খলার কোনো অন্তকে দেখা যাচ্ছে না।

এখন দলের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ‘সিজ’ করার আবেদন জানিয়ে ব্যাংকের ব্যবস্থাপককে চিঠি দিয়েছেন তৃণমূলের কোষাধ্যক্ষ অরূপ বিশ্বাস। তিনি দলের অ্যাকাউন্টে সব লেনদেন বন্ধ করার জন্য অনুরোধ করেছেন।

কারণ এই অস্থিরতার কারণে দলের ভবিষ্যৎ কীভাবে পরিচালিত হবে, তা নিয়েও যথেষ্ট অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। এই অবস্থায় দলের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট কোন পক্ষ পরিচালনা করবে, তা নিয়েও বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে। তাই একটি বেসরকারি ব্যাংকের শাখার ব্যবস্থাপককে চিঠি লিখে দলের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ‘সিজ’ করার দাবি জানিয়েছে অরূপ বিশ্বাস। তাঁর উদ্বেগ, এই বিপর্যয়ের মাঝে দলের অফিসে থাকা এবং তাঁর স্বাক্ষরিত ব্যাংক চেকগুলোর অপব্যবহার হতে পারে।

আর্থিক নিরাপত্তার বিষয়টি আরও গুরুতর করে কোষাধ্যক্ষ তাঁর চিঠিতে এক শক্তিশালী আশঙ্কা জানিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন যে, দলের অফিসে তাঁর অগ্রিম স্বাক্ষরিত কিছু ব্যাংক চেক নিরাপদে রাখা রয়েছে।

দলের বর্তমান বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে কেউ বা কোনো গোষ্ঠী এই চেকগুলোর অপব্যবহার করে দলের তহবিল আত্মসাৎ করতে পারে। এই কারণে দলের সঞ্চিত বিপুল পরিমাণ অর্থ সুরক্ষিত রাখার স্বার্থে সব ধরনের লেনদেন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার খুবই প্রয়োজন বলে তিনি মত প্রকাশ করেছেন।

তাঁর পরিষ্কার কথা হলো, দলের ভেতরের এই নেতৃত্বগত সংকট এবং অভ্যন্তরীণ অচলাবস্থা আইনগতভাবে না মিটলে ব্যাংক কাউকেই টাকা তোলার অনুমতি না দেবে।

কোষাধ্যক্ষের এই চিঠির ফলে তৃণমূলের কয়েকশো কোটি টাকার বিশাল আর্থিক তহবিল এখন আইনি জটিলতায় আটকা পড়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। দলের সর্বশেষ নিরীক্ষা রিপোর্ট অনুযায়ী, ব্যাংকের সাধারণ অ্যাকাউন্টে সঞ্চিত অর্থের পরিমাণ প্রায় ৬২৫ কোটি ৭৯ লক্ষ ৮৭ হাজার ২৬৪ টাকা। এ ছাড়াও বিভিন্ন ব্যাংকে দলের নামে স্থায়ী আমানত হিসেবেও রয়েছে প্রায় ২৫০ কোটি ৭৭ লক্ষ ২৮ হাজার ৩২২ টাকা। এই দুই খাত মিলিয়ে ব্যাংকে মোট অর্থের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮৭৬ কোটি ৫৭ লক্ষ ১৫ হাজার ৫৮৬ টাকা। তার বাইরে ৫০ কোটি টাকার সমমূল্যের চেক দলের দপ্তরে রয়েছে এবং কেন্দ্রীয় ও আঞ্চলিক অফিসে নগদ রয়েছে প্রায় ৩১ লক্ষ ২৮ হাজার ২৮ টাকা। এর ফলে এই বিপুল সম্পদের উপর ব্যাংক নিষেধাজ্ঞা জারি হলে দলের দৈনিক রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করা কঠিন হবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক নির্বাচনের পর থেকেই দলের ভিতরে ভাঙন স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে দলগুলি নিজেদের মধ্যে ঐক্য বজায় রাখার চেয়ে বিভক্তির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এমনকি দলের সর্বোচ্চ নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের একচ্ছত্র নেতৃত্বও এখন দলের অন্দরে বড় চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়েছে।

এই পরিস্থিতিতে দলের এই বিপুল অর্থভাণ্ডার নিয়ে নতুন আইনগত জটিলতা উত্পন্ন হয়েছে। ওয়াকিবহাল মহলে আন্দাজ করা হচ্ছে, অরূপ বিশ্বাস কি শীর্ষ নেতৃত্বের নির্দেশ বা সুপারিশ অনুসরণ করে এই পদক্ষেপ নিয়েছেন, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো গভীর রাজনৈতিক পরিণতি লুকিয়ে রয়েছে।

এই ব্যাংক অ্যাকাউন্ট সম্পর্কিত বিতর্কের পাশাপাশি অরূপ বিশ্বাসের ব্যক্তিগত আইনি সমস্যাও বিদ্যমান পরিস্থিতি আরো জটিল করে তুলেছে। কলকাতায় ফুটবল তারকা লিওনেল মেসির আগমনের সঙ্গে জড়িত একটি বিতর্কিত অনুষ্ঠানের আয়োজনকারী শতদ্রু দত্ত প্রাক্তন ক্রীড়ামন্ত্রীর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন। তাঁর বক্তব্য, মেসির অফিসিয়াল টিম ইতিমধ্যেই বিধাননগর পুলিশের কাছে ই-মেলের মাধ্যমে একটি অভিযোগ দাখিল করেছে, যেখানে এই অব্যবস্থাপনার জন্য সরাসরি প্রাক্তন ক্রীড়ামন্ত্রীকে অভিযোগকারী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

অরূপ বিশ্বাসের আইনি সুরক্ষা নির্দেশের বিরুদ্ধে কলকাতা হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চে মামলা দায়ের করা হয়েছে, যার শুনানি কিছু দিনের মধ্যেই অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। এই দুটি সংকটের কারণে শাসক দলের অভ্যন্তরের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এখন এক চরম নাটকীয় পর্যায়ে গিয়ে উপস্থিত হয়েছে।

Exit mobile version