সৌরভ দত্ত, বিশেষ সংবাদাতা কলকাতা:
ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের মোট ৪,০০০ কিলোমিটার সীমান্তের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গেই ২,২০০ কিলোমিটার অবস্থিত। এই দীর্ঘ সীমান্তের মধ্যে প্রায় ১,৬০০ কিলোমিটার এলাকায় কাঁটাতার স্থাপন করা থাকলেও, ভৌত ও রাজনৈতিক কারণে প্রায় ৬০০ কিলোমিটার সীমান্ত এখনও উন্মুক্ত এবং অরক্ষিত রয়েছে।
পূর্ববর্তী তৃণমূল সরকারের সময় বিএসএফ বারবার জমির জন্য অনুরোধ করার পরও ‘তুষ্টিকরণ’ রাজনীতির কারণে ৫৫৫ কিলোমিটারের বেশি জমিতে কাঁটাতার দেওয়ার অনুমতি পাওয়া যায়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে রাজ্যে ক্ষমতার পরিবর্তনের পর সীমান্ত নিরাপত্তার বিষয়ে প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠকেই গুরুত্বপূর্ণ অনুমোদন প্রদান করেছেন শুভেন্দু অধিকারীর সরকার।
বুধবার, নবান্নে বিএসএফ-এর ডিরেক্টর জেনারেল এবং আইজি পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে বিএসএফ-এর পক্ষ থেকে ফুলের তোড়া এবং স্মারক দিয়ে নতুন মুখ্যমন্ত্রীকে সমাদৃত করা হয়। বৈঠকের পর এক যৌথ সাংবাদিক সম্মেলনে মুখ্যমন্ত্রী জানান যে, সীমান্তের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে প্রথম পর্যায়ে অত্যন্ত সংবেদনশীল মালদা, মুর্শিদাবাদ, নদিয়া এবং উত্তর ২৪ পরগনার প্রায় ২৭ কিলোমিটার সীমান্ত এলাকাকে সুরক্ষিত করার জন্য প্রয়োজনীয় জমি হস্তান্তরের কাজ শুরু করেছে রাজ্য সরকার।
আগের সরকারের জমি প্রদানের বিরুদ্ধে একগুঁয়ে নীতি সমালোচনা করেন শুভেন্দু অধিকারী। তিনি বলেন, “পূর্ববর্তী সরকারের সদিচ্ছার অভাবের কারণে আজ আমাদের প্রিয় রাজ্য একটি ভয়াবহ আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছে। রাজ্যে সাম্প্রতিককালে যে প্রকৃতির আইনশৃঙ্খলাজনিত অপরাধ, লাভ জিহাদ, ধর্মান্তর এবং নারী সুরক্ষার প্রশ্নে অসামাজিক কার্যকলাপ বৃদ্ধি পেয়েছে, তার তদন্তে দেখা গেছে যে অপরাধীদের একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যা বাংলাদেশ থেকে আসা অবৈধ অনুপ্রবেশকারী। এই অনুপ্রবেশ চিরতরে বন্ধ করতে আমরা কাঁটাতার স্থাপনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।”
মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্টভাবে নির্দেশ দিয়েছেন যে, আগামী ৪৫ দিনের মধ্যে বিএসএফের প্রয়োজন অনুযায়ী সকল জমি হস্তান্তরের কাজ সম্পূর্ণ হওয়া উচিত। এই বৃহৎ প্রকল্পের দায়িত্ব সরাসরি রাজ্যের মুখ্যসচিব এবং ভূমি ও ভূমি রাজস্ব বিভাগের সচিবকে দেওয়া হয়েছে। আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে কর্মকর্তারা জমির একটি বড় অংশ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের মাধ্যমে বিএসিএফের হাতে দেওয়ার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছেন। রাজ্যের কর্মকর্তাদের এবং দেশপ্রেমিক জনসাধারণের সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে দেশের সুরক্ষার জন্য এই কাজটি সম্পন্ন হবে বলে মুখ্যমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেছেন।
অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিতকরণ ও দেশ ছাড়া করার বিষয়ে মুখ্যমন্ত্রী ঐতিহাসিক একটি নীতি ঘোষণা করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, ২০২৫ সালের ১৪ মে কেন্দ্রীয় সরকার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চিঠি রাজ্যকে পাঠিয়েছিল, যেখানে নির্দেশ ছিল যে, ধৃত অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের সরাসরি বিএসএফের কাছে হস্তান্তর করতে হবে। তবে পূর্বতন তৃণমূল সরকার ভোটব্যাংকের স্বার্থের জন্য সিএএ’র বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল এবং সেই নির্দেশনা গোপন করে রেখেছিল।
জামালপুরে যেন আর এক সন্দেশখালি! ক্ষমতা পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তৃণমূল নেতা তাবারকের বালির লুটের সাম্রাজ্য উন্মোচন করেছেন গ্রামবাসীরা। গোপন ডেরায় মধ্যরাতে হানা! শাহজাহানের দুটি বিশ্বস্ত নেত্রীকে পুলিশ খাঁচায় বন্দী করেছে।
শুভেন্দু অধিকারী ঘোষণা করেন, “পূর্ববর্তী সরকার কেন্দ্রের সেই গুরুত্বপূর্ণ আইন কার্যকর করেনি, আমরা তা আজ থেকেই রাজ্যে কার্যকর করছি। যারা সিএএ বা নাগরিকত্ব সংশোধন আইনের আওতায় আবেদন করেছেন, তারা সম্পূর্ণ নিরাপদ। পুলিশ তাঁদের কোথাও বিরক্ত বা হেনস্থা করতে পারবে না। তবে যারা সিএএ’র আওতার বাইরে রয়েছেন, তারা সম্পূর্ণ অবৈধ অনুপ্রবেশকারী। রাজ্য পুলিশ এখন থেকে তাদের প্রত্যক্ষভাবে গ্রেফতার করতে পারে।”
মুখ্যমন্ত্রী অনুপ্রবেশকারীদের তাড়ানোর জন্য তাঁর সরকারের কঠোর ‘৩ডি’ নীতি তুলে ধরেছেন, যা হল- চিহ্নিতকরণ, নথি বাতিল এবং দেশ থেকে বিতাড়ন। রাজ্য পুলিশ এই সমস্ত অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের গ্রেফতার করার পর, বিএসএফ-এর সঙ্গে আইনি দিক থেকে সমন্বয় করবে এবং দ্রুত তাদের পুশব্যাক বা স্বদেশে বিতাড়নের ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। নতুন সরকারের এই চূড়ান্ত ঘোষণা সীমান্তে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে।

