মো: আল-মাহফুজ শাওন:
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ১৬ মে একটি বিশেষ এবং গুরুত্বপূর্ণ তারিখ। ১৯৭৬ সালের এই দিনে দেশের ন্যায্য পানির অধিকার পূরণের লক্ষ্যে পরিচালিত হয়েছিল কিংবদন্তি “ফারাক্কা লংমার্চ।”
ভারত সরকারের নির্মিত ফারাক্কা বাঁধের ক্ষতিকর প্রভাবের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে লাখো মানুষের সমাগমে অনুষ্ঠিত এই লংমার্চের তত্ত্বাবধানে ছিলেন মজলুম জননেতা।
সে সময় ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী সরকারের বিরুদ্ধে সাধারণ জনগণের মাঝে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। রাজশাহীর কানসাট হাইস্কুল মাঠে অনুষ্ঠিত একটি বিশাল সমাবেশে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মওলানা ভাসানী মন্তব্য করেন, “ফারাক্কা আমাদের জন্য অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।” তাঁর নেতৃত্বে হাজার হাজার জনতা ভারত বিরোধী শ্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে এবং গঙ্গার পানির ন্যায্য বণ্টনের দাবিতে সংগঠিত আন্দোলনে অংশ নেয়।
তথ্য অনুযায়ী, ভারতের পশ্চিমবঙ্গে গঙ্গা নদীর উপর ফারাক্কা বাঁধের নির্মাণ পরিকল্পনা ১৯৬১ সালে শুরু হয়। পরে ১৯৭৪ সালে স্বাক্ষরিত ইন্দিরা-মুজিব চুক্তির আওতায় বাঁধটি কার্যকর হয়। তবে এর ফলস্বরূপ বাংলাদেশের গঙ্গা এবং এর শাখা নদীগুলোর পানির প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অংশে বহু নদী নাব্যতা হারাতে শুরু করে, যা কৃষি, মৎস্য এবং পরিবেশের উপর ক্ষতিকারক প্রভাব ফেলে।
বিশ্লেষকদের মতে, ফারাক্কা বাঁধের কারণে বাংলাদেশের কপোতাক্ষ নদ প্রায় মৃতপ্রায় অবস্থায় চলে এসেছে। একই সঙ্গে মহানন্দা, পাগলা ও পুনর্ভবা নদীতে পানি সংকট মারাত্মক মাত্রা ধারণ করেছে। নদীগুলোর মধ্যে চর উঠা, পানির প্রবাহের হ্রাস ও শুষ্ক মৌসুমে তীব্র সংকটের ফলে উত্তর অঞ্চলে মরুকরণের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
এ প্রসঙ্গে, এক প্রবন্ধে তিনি উল্লেখ করেন যে, ফারাক্কা বাঁধের কারণে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বিঘ্নিত হয়েছে এবং নদীর তলায় ব্যাপক চর জেগে উঠছে। তিনি সতর্ক করে দিয়েছেন যে, চলমান পরিস্থিতি যদি অব্যাহত থাকে, তবে ২০৩০ সালের মধ্যেই বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের একটি বড় অংশ মরুভূমিতে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতামত হলো, ফারাক্কা লংমার্চ বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রথম বৃহৎ জনসমাগম ভিত্তিক ভারতবিরোধী রাজনৈতিক ঘটনা। এই আন্দোলনের মাধ্যমে দেশের পানির অধিকার, পরিবেশ এবং সার্বভৌম স্বার্থ সুরক্ষার ক্ষেত্রে জনগণের ঐক্যবদ্ধ অবস্থান বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরা হয়। এরপর থেকে প্রতিবছর ১৬ মে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও পরিবেশবাদী সংগঠন দিবসটি স্মরণ করে আসছে।

