সৌরভ দত্ত, কলকাতা:
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী নবান্নে প্রথম ক্যাবিনেট বৈঠকে অংশগ্রহণ করেন। সেখানে পাঁচটি নবনির্বাচিত মন্ত্রীর উপস্থিতি ছিল। এর পাশাপাশি প্রশাসনিক কিছু দায়িত্বশীল ব্যক্তিরাও ছিলেন। ক্যাবিনেট বৈঠকের পর প্রথমবার সাংবাদিকদের সামনে এসে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা করেন।
তিনি উল্লেখ করেন, “আমরা প্রথম ক্যাবিনেট বৈঠক সম্পন্ন করেছি। মন্ত্রিসভায় আমার সঙ্গে পাঁচজন সহযোগী ছিলেন, যারা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ডবল ইঞ্জিন সরকার সকলের জন্য কাজ করার জন্য সংকল্পবদ্ধ। দীর্ঘ সময় পর পৃথিবী একটি মুক্ত এবং ভয়মুক্ত নির্বাচনের সাক্ষী হলো। ভোটকর্মী, গণনা কর্মী, রাজ্য পুলিশ, কলকাতা পুলিশ, নির্বাচনে প্রার্থিতা পাওয়া রাজনৈতিক দল এবং প্রার্থীদের প্রতি আমি কৃতজ্ঞতা জানাই।”
শুভেন্দু স্পষ্টীকরণ করেন, “সরকারি প্রকল্পের সুবিধা স্থগিত হবে না। তবে প্রতিটি ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বজায় রাখা হবে। মৃত ব্যক্তি প্রকল্পের সুবিধা পাবেন না। একইভাবে কোনো ‘অভারতীয়’ সামাজিক প্রকল্পের সুবিধা গ্রহণ করবেন না।”
লক্ষ্মীর ভাণ্ডার এবং স্বাস্থ্যসাথী পূর্ববর্তী সরকারের সামাজিক প্রকল্পগুলো কি বন্ধ হবে? বাংলায় সরকার পরিবর্তনের পর এটি এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। তবে নবান্নে প্রথম ক্যাবিনেট বৈঠকের সমাপ্তির পরে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সাধারণ জনগণের উদ্বেগ দূর করলেন। তিনি নিশ্চিত করে বললেন, “কোনো সরকারি প্রকল্পের সুবিধা বন্ধ হবে না।”
তৃণমূল সরকারের সময় সবচেয়ে জনপ্রিয় দুটি জনমুখী প্রকল্প ছিল। একটি হচ্ছে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার এবং অন্যটি স্বাস্থ্যসাথী। লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্পের মাধ্যমে রাজ্যের অধিকাংশ মহিলা প্রতি মাসে ১ হাজার ৫০০ টাকা পেতেন। তফশিলি জনজাতির মহিলারা এই প্রকল্পে ১ হাজার ৭০০ টাকা পেয়ে ছিলেন। এছাড়া স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্প ৫ লক্ষ টাকার স্বাস্থ্যবিমার সুবিধা এনে দেয়। সোমবার নবান্নে প্রথম ক্যাবিনেট বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানিয়েছেন, আজ থেকেই বাংলায় আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্প কার্যকর হচ্ছে। সেইসাথে তিনি ৬টি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের ঘোষণা দেন।
সোমবার প্রথম ক্যাবিনেট বৈঠকে মোট ৬টি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে।
যাদের আত্মত্যাগের মাধ্যমে সরকার প্রতিষ্ঠা হয়েছে তাদের মধ্যে ৩২১ জন নিহত বিজেপি কর্মীর পরিবারের জন্য দায়িত্ব গ্রহণ করেছে সরকার।
রাজ্যের জনবিন্যাস পরিবর্তন হয়েছে। তাই সীমান্ত নিরাপত্তা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। আগামী ৪৫ দিনের মধ্যে বিএসএফকে কাঁটাতারের জন্য জমি হস্তান্তর করা হবে।
‘বেটি বাঁচাও, বেটি পড়াও’, ‘বিশ্বকর্মা যোজনা’, ‘আয়ুষ্মান ভারতে’র মতো কেন্দ্রীয় প্রকল্পের সঙ্গে রাজ্য যুক্ত হলো।
রাজ্যের আইপিএস এবং আইএএস কর্মকর্তারা কেন্দ্রের প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করতে পারতেন না। এখন থেকে চাইলে তারা ওই প্রশিক্ষণে যোগ দিতে পারবেন।
সোমবার থেকে রাজ্যে ভারতীয় ন্যায় সংহিতা কার্যকর হচ্ছে। এতদিন আইপিসি অসাংবিধানিকভাবে বাংলায় কার্যকর ছিল।
সরকারি চাকরিতে আবেদনকারীর বয়সের সর্বোচ্চ সীমা ৫ বছর বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত গৃহীত হলো।
বঙ্গের প্রথম বিজেপি সরকারের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী দাবি করছেন, “পূর্ববর্তী সরকার অনেক ক্ষতি করে গেছে।” এবার জনগণকে আরও অনেক কিছু প্রদান করা হবে, বলছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু। লক্ষ্মীর ভাণ্ডার এবং স্বাস্থ্যসাথীর মতো বর্তমান সামাজিক প্রকল্পসমূহ বন্ধ হবে না বলেও নিশ্চিত করেন তিনি। আগামী সপ্তাহ থেকে দিলীপ ঘোষ এবং অগ্নিমিত্রা পল সাংবাদিক বৈঠক করবেন।
আগামী সোমবার নতুন সরকারের দ্বিতীয় মন্ত্রিসভার বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। ওই দিন ডিএ, পে কমিশনসহ আরও বিভিন্ন বিষয় সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। এছাড়া নারী নির্যাতন এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির প্রসঙ্গেও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে।
দ্রুত পরিবর্তন ঘটছে বাংলার জনবিন্যাস! সীমান্তবর্তী এলাকাগুলিতে হিন্দু ও মুসলিম জনসংখ্যার অনুপাতের পরিবর্তনের অভিযোগ ব্যাপকভাবে শোনা যাচ্ছে। বাংলায় অনুপ্রবেশকারীদের রোধ করার জন্য সীমান্ত বন্ধ করার পরিকল্পনার কথায় সংশ্লিষ্ট ছিলেন প্রধানমন্ত্রী এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। বাংলায় প্রচারে এসে নরেন্দ্র মোদি এবং অমিত শাহ বারবার সীমান্তের সংলগ্ন অঞ্চলে জনবিন্যাসের পরিবর্তনের আলোচনা করেছেন। এবার বাংলায় নতুন সরকার গঠনের পর প্রথম মন্ত্রিসভার সভায় শুভেন্দুর মুখে একই বিষয় উঠে এসেছে।
জনবিন্যাস পরিবর্তনের প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে সীমান্তে কাঁটাতারের ব্যবস্থা গ্রহণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে প্রথম ক্যাবিনেটে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেছেন, “রাজ্যের জনবিন্যাস পরিবর্তিত হয়েছে। প্রথমদিনেই কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র দপ্তর এবং বিএসএফকে জমি হস্তান্তরের অনুমোদন দিলাম। ৪৫ দিনের মধ্যে জমি বিএসএফের হাতে পৌঁছাতে হবে। ভূমি এবং রাজস্ব সচিব ও মুখ্যসচিবের তত্ত্বাবধানে জমি হস্তান্তর প্রক্রিয়া অনুষ্ঠিত হবে।”
‘ভরসার বাংলা’ নির্মাণের আশ্বাস দিতে কেন্দ্রীয় নেতাদের দ্বারা উল্লেখিত তিনটি শব্দবন্ধ ‘ডিটেক্ট-ডিলিট-ডিপোর্ট’ নীতির পথেই বাংলার নতুন সরকার এক ধাপ এগিয়ে গেল। অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির মাধ্যমে বাংলায় অনুপ্রবেশকারীদের বাছাই করে বিতাড়নের ঘোষণা করেছিলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ।
রাজ্যে সরকার গঠন করার পর প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠকে সেই প্রসঙ্গ আবার উত্থাপিত হলো। রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে ত্রুটি তুলে বিএসএফকে জমি হস্তান্তরের বিষয়টি জানালেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। ভূমি এবং রাজস্ব সচিব ও মুখ্যসচিবের উপর দায়িত্ব ন্যস্থ করা হয়েছে। ৪৫ দিনের মধ্যে জমি হস্তান্তরের কথা উল্লেখ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। এতদিন জমি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে বিলম্ব ছিল রাজ্যের। এবার সীমান্ত বন্ধের পথে আর কোন বাধা রইল না। বিএসএফকে ১০৫ একর জমি হস্তান্তরের প্রক্রিয়া সোমবার থেকেই শুরু হয়েছে। মোদি-শাহের প্রতিশ্রুতির আলোকে শ্যামাপ্রসাদের স্বপ্নের অনুপ্রবেশমুক্ত বাংলা গঠন করার অঙ্গীকার করেছে বাংলার নতুন সরকার।

