সৌরভ দত্ত, কলকাতা:
শনিবার যখন ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর উপস্থিতিতে শুভেন্দু অধিকারী মুখ্যমন্ত্রী পদে শপথ নেবেন তখন তা কেবল এক ব্যক্তির জয় হবে না,তা হবে বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসের এক পূর্ণ বৃত্ত সম্পন্ন হওয়ার মুহূর্তও।
বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে ১৯৬৭ সাল ছিল এক সন্ধিক্ষণ। আর ২০২৬ সাল হয়ে রইল এক মাইলফলক পরিবর্তনের বছর। আর এই দুই সময়ের মধ্যে সেতুবন্ধন করে দিলেন মেদিনীপুরের দুই ভূমিপুত্র— অজয়কুমার মুখোপাধ্যায় এবং শুভেন্দু অধিকারী । দুজনেই নিজ নিজ দলের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলেন, দুজনেই মুখ্যমন্ত্রীকে তাঁর ঘরের মাঠে পরাজিত করেছেন এবং বিধানসভা ভোটে দুই আসনে জিতে বাংলার মসনদে বসার যোগ্যতা অর্জন করেছেন। বিধানচন্দ্র রায়ের মৃত্যুর পর ১৯৬২ সালে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হন প্রফুল্লচন্দ্র সেন। ‘আরামবাগের গান্ধী’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন তিনি। ১৯৯০ সালে যখন তিনি মারা যান, তাঁর সম্পত্তি বলতে ছিল কেবল কয়েক জোড়া ধুতি-পাঞ্জাবি আর বইভর্তি আলমারি। অথচ প্রশাসক হিসেবে তিনি চরম সংকটের মুখে পড়েছিলেন। ১৯৬২ থেকে ১৯৬৭ সালের মধ্যে বাংলায় দেখা দেয় ভয়াবহ খাদ্যসংকট। কালোবাজারি রুখতে প্রফুল্ল সেন রেশন ব্যবস্থা ও লেভি সিস্টেম চালু করেন, কিন্তু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। এই সময়ই তিনি জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন তাঁর বিশেষ একটি মন্তব্যের জন্য। তিনি পরামর্শ দেন, চালের অভাব মেটাতে ভাতের বদলে মানুষকে রুটি, আলু ও কাঁচকলা খেতে হবে।
বিরোধীরা ব্যঙ্গ করে তাঁর সরকারকে ‘কাঁচকলা মন্ত্রিসভা’ বলতে শুরু করে। এই খাদ্য আন্দোলনের ঢেউয়েই তৎকালীন সেচমন্ত্রী অজয় মুখোপাধ্যায় কংগ্রেস ত্যাগ করে নলিনাক্ষ সান্যালের সঙ্গে মিলে গঠন করেন ‘বাংলা কংগ্রেস’। ১৯৬৭ সালের নির্বাচনে তিনি নিজের জেলা মেদিনীপুরের তমলুক এবং মুখ্যমন্ত্রীর কেন্দ্র আরামবাগ— এই দুই আসন থেকেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ঐতিহাসিক লড়াই এবং জয় ১৯৬৭ সেই সালের সেই নির্বাচনে মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্ল সেনকে পরাস্ত করেন অজয় মুখোপাধ্যায়। প্রফুল্ল সেনের পরাজয়ের দিন কলকাতায় নাকি দ্বিগুণ দামে কাঁচকলা বিক্রি হয়েছিল— যা ছিল এক চরম বিদ্রূপ। তার পর ১৫ মার্চ অজয় মুখোপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। তিনিই ছিলেন বাংলার প্রথম অকংগ্রেসি মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর মন্ত্রিসভায় উপমুখ্যমন্ত্রী ছিলেন জ্যোতি বসু।
ঠিক একই ঘরানায় ২০২৬ সালে শুভেন্দু অধিকারীর উত্থান। অজয় মুখোপাধ্যায় যেমন অবিভক্ত মেদিনীপুরের তমলুকের ভূমিপুত্র ছিলেন, শুভেন্দুও তাই। আবার শুভেন্দুও অজয়বাবুর মতই একদা সেচমন্ত্রী ছিলেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁর ভাইপো অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিদ্রোহ ঘোষণা করে ২০২০ সালে বিজেপিতে যোগ দিয়েছিলেন তিনি। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে নন্দীগ্রামে তাঁকে হারাতে গিয়ে উল্টে নিজেই পরাস্ত হন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আর এবারের ভোটে কার্যত অজয় মুখোপাধ্যায়ের পথ অনুসরণ করে দুটি কেন্দ্রে লড়েন শুভেন্দু অধিকারী। নিজের গড় নন্দীগ্রাম এবং মুখ্যমন্ত্রীর খাসতালুক ভবানীপুর। অজয় মুখোপাধ্যায় যেমন খাদ্য সংকটের আবেগকে হাতিয়ার করেছিলেন, শুভেন্দুও তেমনই মমতার বিরুদ্ধে হাতিয়ার করেন দুর্নীতি ও সংখ্যালঘু তোষণের অভিযোগকে।
ভবানীপুরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ১৫,৫০৫ ভোটে পরাজিত করেন তিনি। তার পর শুক্রবার বিজেপির পরিষদীয় দলের বৈঠকে তাঁকে সর্বসম্মতিতে নেতা নির্বাচন করা হয়। শনিবার শপথ নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই অজয় মুখোপাধ্যায়ের সেই বিরল রেকর্ড ছুঁয়ে ফেলবেন শুভেন্দু। মুখ্যমন্ত্রীকে হারিয়েই মুখ্যমন্ত্রীর আসনে বসতে চলেছেন বাংলার দ্বিতীয় কোনও নেতা। ইতিহাস বলছে, অজয় মুখোপাধ্যায়ের প্রথম যুক্তফ্রন্ট সরকার মাত্র কয়েক মাস স্থায়ী হয়েছিল। জোটে ভাঙন ধরায় ১৯৬৭-র নভেম্বরেই সেই সরকার বরখাস্ত হয়।
পরে ১৯৬৯ সালে তিনি দ্বিতীয়বার মুখ্যমন্ত্রী হলেও জোটের অন্তর্দ্বন্দ্বে অতিষ্ঠ হয়ে নিজের সরকারের বিরুদ্ধেই রাইটার্স বিল্ডিংয়ের সামনে কার্জন পার্কে অনশনে বসেছিলেন অজয় মুখোপাধ্যায়। পরবর্তীতে তিনি ইন্দিরা গান্ধীর কংগ্রেসে যোগ দেন এবং কেন্দ্রীয় মন্ত্রিত্বের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়ে প্রণব মুখোপাধ্যায়ের নাম সুপারিশ করেন। তবে অজয় মুখোপাধ্যায়ের মতো সরকারের স্থিতিশীলতা নিয়ে শুভেন্দু অধিকারীর সামনে কোনও চ্যালেঞ্জ। বাংলায় এবার বিজেপি ২০৭টি আসনে অর্থাৎ দুই তৃতীয়াংশের বেশি আসনে জিতে সরকার গড়তে চলেছে।
তবে হ্যাঁ বাংলায় ভয়ের পরিবেশ কাটিয়ে ভরসার পরিবেশ গড়ে তোলার চ্যালেঞ্জ তাঁর সামনে অবশ্যই থাকবে। সেদিক থেকে এদিন শুভেন্দুর কথা ছিল খুব ইতিবাচক। পরিষদীয় দলের বৈঠকে তিনি বলেন, “আমি নয় আমরা – এই মন্ত্রেই কাজ হবে। কথা কম কাজ বেশি করবে নতুন সরকার”।
অজয় মুখোপাধ্যায় এবং শুভেন্দু অধিকারীর মধ্যে মিল কেবল মেদিনীপুর বা জোড়া আসনে জয় নয়; দুজনেই বাংলার রাজনীতিতে একটি করে দীর্ঘকালীন আধিপত্যের অবসান ঘটিয়েছেন।

