আহমদ হুসাইন লস্কর, হাইলাকান্দি, আসাম :
স্বাধীনতার সাত দশক পেরিয়ে গেলেও আসামের চা জনজাতির জীবনযাত্রায় প্রত্যাশিত পরিবর্তন আসেনি—এমন অভিযোগ ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। বাস্তব চিত্রে এই জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন খুব একটা চোখে পড়ে না বলে অনেকেই মত দিচ্ছেন। দীর্ঘদিন ধরেই তারা একই অবস্থায় স্থির হয়ে আছে। চা জনজাতিকে ঘিরে নানা গল্প থাকলেও বাস্তবে উন্নতির ছাপ নেই। শিক্ষা, সংস্কৃতি, স্বাস্থ্য, বাসস্থান ও নিরাপদ পানীয়জল—সব ক্ষেত্রেই পিছিয়ে রয়েছে এই জনগোষ্ঠী। ইংরেজ আমলে যেমন অবস্থায় তাদের এখানে আনা হয়েছিল, স্বাধীনতার পরও অনেক ক্ষেত্রে সেই চিত্র অপরিবর্তিত রয়ে গেছে।
সমাজের উন্নয়নের অন্যতম মানদণ্ড শিক্ষা হলেও চা বাগান অঞ্চলে শিক্ষার অবস্থা এখনও দুর্বল। উচ্চশিক্ষার সুযোগ প্রায় নেই বললেই চলে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরেও মান নিম্ন। অনেক বাগানে নিরক্ষর মানুষের সংখ্যা বেশি। চা শিল্পের শুরুতে শ্রমিকদের আনা হয়েছিল মূলত কাজের জন্য, যেখানে ন্যূনতম খাদ্যই ছিল প্রধান চাহিদা। পরিবারে নারী-পুরুষের পাশাপাশি শিশুরাও কাজ করত। কাজের ধরন অনুযায়ী বিভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করে মজুরি দেওয়া হত। শিশুশ্রম তখন সাধারণ বিষয় ছিল, ফলে পড়াশোনার সুযোগ খুবই সীমিত ছিল। প্রয়োজনের তুলনায় স্কুল কম থাকায় এবং কর্তৃপক্ষের অনাগ্রহে শিক্ষার প্রসার ঘটেনি। সেই প্রবণতা আজও পুরোপুরি বদলায়নি। এখনও অনেক শিশু বিদ্যালয়ে নিয়মিত যায় না, স্কুলছুটের সংখ্যা বেশি। অনেক কিশোরকে বাগানে কাজ করতে দেখা যায়। বিদ্যালয়ের অবকাঠামোও দুর্বল; অনেক প্রাথমিক বিদ্যালয় এক শিক্ষক দিয়ে চলছে এবং মধ্যাহ্নভোজ কর্মসূচিও সব জায়গায় নিয়মিত নয়।
চা বাগান এলাকায় শিক্ষা সংক্রান্ত সংগঠনগুলোর কার্যক্রম প্রয়োজনের তুলনায় কম সক্রিয় থাকায় উন্নয়নও সীমিত। উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয় অল্প এবং সেগুলোর অবস্থাও সন্তোষজনক নয়। মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যাও খুবই কম।
স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও চিত্র উদ্বেগজনক। পুরনো ডিসপেনসারিগুলিই ভরসা, যেখানে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও চিকিৎসা সুবিধার অভাব রয়েছে। পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও নার্স নেই, অনেক জায়গায় নামমাত্র সেবা চলছে। চায়ের বাজারমূল্য কমে যাওয়ায় বাগানের আয় কমেছে, যার প্রভাব স্বাস্থ্যসেবাতেও পড়েছে। সরকারি স্বাস্থ্যসেবাও অনেক প্রত্যন্ত এলাকায় পৌঁছায়নি। উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো প্রায়ই বন্ধ থাকে, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও সরঞ্জামের ঘাটতি রয়েছে, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীরাও নিয়মিত উপস্থিত হন না। ফলে মানুষ চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
স্বাস্থ্য সচেতনতার অভাবও বড় সমস্যা। অধিকাংশ শিশুর জন্ম এখনও প্রশিক্ষণহীন ধাইয়ের মাধ্যমে বাড়িতে হয়, যার কারণে মা ও শিশুমৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ছে। হাসপাতালভিত্তিক প্রসবের সুযোগ থাকলেও সচেতনতার ঘাটতিতে তা কাজে লাগানো হচ্ছে না। পরিবার পরিকল্পনা, গর্ভকালীন যত্ন ও পুষ্টি সম্পর্কেও ঘাটতি রয়েছে। সরকারি স্বাস্থ্য কর্মসূচির সুফল খুব কমই পৌঁছায় এসব এলাকায়। জরুরি সেবা যেমন অ্যাম্বুলেন্স সুবিধাও অনেক স্থানে পৌঁছাতে পারে না।
বাসস্থানের ক্ষেত্রেও পুরনো কাঠামোই বেশি দেখা যায়—শন, বাঁশ ও মাটির ঘর। আবাসন প্রকল্পের সুবিধা সীমিত, আবার কিছু ক্ষেত্রে আইনি জটিলতায় পাকা ঘর নির্মাণও সম্ভব হয় না। স্থানীয় পর্যায়ে দুর্নীতির অভিযোগও রয়েছে। ফলে রাস্তাঘাট ও বাসস্থানের অবস্থা এখনও সন্তোষজনক নয়। জনস্বাস্থ্য প্রকল্প থাকলেও অনেক জায়গায় তা কার্যকর নয়। ফলে নদী, খাল বা কাঁচা কুয়ার পানি ব্যবহার করতে হয়, যা অপরিশোধিত হওয়ায় জলবাহিত রোগের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

