দৈনিক নবদিগন্ত

ইরান সংঘাতে গোলাবারুদ চাপে যুক্তরাষ্ট্র, ইউক্রেনের অস্ত্র সরিয়ে নেওয়ার ভাবনা

ইরান সংঘাতে গোলাবারুদ চাপে যুক্তরাষ্ট্র, ইউক্রেনের অস্ত্র সরিয়ে নেওয়ার ভাবনা

যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাত টানা ২৭ দিনে গড়িয়েছে। সংঘাতের শুরুতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পরও দেশটির শাসনব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আনতে পারেনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। বরং ধারাবাহিকভাবে ইরানের সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হচ্ছে। পাল্টা হিসেবে তেহরানও মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটি ও স্থাপনাগুলোতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা জোরদার করেছে।

এই পরিস্থিতিতে প্রত্যাশার তুলনায় ইরানকে দ্রুত দুর্বল করতে না পেরে চাপে পড়েছে ওয়াশিংটন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে নানা জটিলতা দেখা দিচ্ছে। এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের গোলাবারুদের মজুত কমে আসছে বলে জানা গেছে।

এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন ইউক্রেনের জন্য নির্ধারিত কিছু অস্ত্র ও গোলাবারুদ মধ্যপ্রাচ্যে স্থানান্তরের বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করছে। এমন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে রাশিয়ার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে চলমান যুদ্ধে ইউক্রেন বড় ধরনের দুর্বলতায় পড়তে পারে বলে বিশ্লেষকদের আশঙ্কা। অনেকেই এটিকে ইউক্রেনকে কার্যত ‘ত্যাগ’ করার মতো পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্ট পেন্টাগনের সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানিয়েছে, কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হাজার হাজার লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। এতে বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ ব্যবহারের ফলে নিজস্ব মজুত দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। ফলে ইউক্রেনের জন্য নির্ধারিত উন্নত কিছু অস্ত্র মধ্যপ্রাচ্যে সরিয়ে নেওয়ার চিন্তা করা হচ্ছে।

বিশেষ করে ন্যাটোর আওতায় কেনা ইন্টারসেপ্টর মিসাইলের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম এই তালিকায় রয়েছে। ‘প্রায়োরিটাইজড ইউক্রেন রিকোয়ারমেন্টস লিস্ট’ কর্মসূচির মাধ্যমে এতদিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে এসব অস্ত্র সংগ্রহ করছিল কিয়েভ। ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বড় অংশই এই কর্মসূচির ওপর নির্ভরশীল।

ন্যাটো সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, ইউক্রেনের প্যাট্রিয়ট সিস্টেমের অধিকাংশ মিসাইল এবং অন্যান্য প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম এই উদ্যোগের মাধ্যমে সরবরাহ করা হয়েছে। এখন এই সরবরাহ কমে গেলে রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মুখে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বড় ধাক্কা খেতে পারে।

এ অবস্থায় ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যেও উদ্বেগ বাড়ছে। তারা আশঙ্কা করছে, যুক্তরাষ্ট্রের অতিরিক্ত গোলাবারুদ ব্যবহারের কারণে তাদের নিজস্ব সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহ প্রক্রিয়াও বিলম্বিত হতে পারে।

এদিকে পেন্টাগন ইতোমধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে জড়ো করছে, যাতে ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা থেকে মার্কিন বাহিনী ও মিত্র দেশগুলোকে সুরক্ষা দেওয়া যায়।

পেন্টাগনের অভ্যন্তরীণ আলোচনায় উঠে এসেছে, ভবিষ্যতে ইউক্রেনের জন্য পাঠানো সামরিক সহায়তা প্যাকেজে আকাশ প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কম থাকতে পারে। বিষয়টি নিয়ে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে জোর আলোচনা চলছে।

অন্যদিকে, ইরান সংঘাতের ব্যয় মেটাতে ট্রাম্প প্রশাসন কংগ্রেসের কাছে অতিরিক্ত প্রতিরক্ষা বাজেট অনুমোদনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। একইসঙ্গে ন্যাটো দেশগুলোর অর্থায়নে ইউক্রেনের জন্য বরাদ্দ কিছু অর্থ যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব সামরিক মজুত বাড়াতে ব্যবহার করার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে।

ইউক্রেনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তারা তাদের প্রতিরক্ষা প্রয়োজনীয়তা মিত্রদের জানিয়ে যাচ্ছে এবং বর্তমান পরিস্থিতির অনিশ্চয়তা সম্পর্কে সচেতন রয়েছে।

উল্লেখ্য, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কয়েক দফা আলোচনা হলেও তা ব্যর্থ হয়। এরপরই সামরিক অভিযান শুরু হয় এবং তা এখনো অব্যাহত রয়েছে। সংঘাতের জেরে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়ছে এবং গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথগুলোতেও প্রভাব পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

Exit mobile version