মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে ভিয়েতনামে ডিজেলের দাম দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। বুধবার দেশটির বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এ তথ্য প্রকাশ করেছে। হ্যানয় থেকে বার্তাসংস্থা এএফপি জানিয়েছে, দাম বৃদ্ধির প্রভাব সাধারণ জনগণ এবং ব্যবসায়ীদের জীবনযাত্রায় সরাসরি অনুভূত হচ্ছে।
ভিয়েতনামের বাজারে এই দামের ঊর্ধ্বগতির প্রভাব শুধু দেশীয় অর্থনীতিতে নয়, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে।
ডিজেলের দাম ও পেট্রলের মূল্যবৃদ্ধি
মন্ত্রণালয়ের তথ্যে বলা হয়েছে, ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার দুই দিন আগে, ২৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ডিজেলের দাম প্রায় ১০৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
- ডিজেল: গত মাসে প্রতি লিটার ১৯,২৭০ ভিয়েতনামিজ ডং, বর্তমানে বৃদ্ধি পেয়ে ৩৯,৬৬০ ডং বা প্রতি লিটার ১.৫০ ডলার।
- ৯৫-অকটেন পেট্রল: প্রায় ৬৮ শতাংশ বৃদ্ধি, ২০,১৫০ ডং থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৩,৮৪০ ডং।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দাম বৃদ্ধির প্রভাব সাধারণ জনগণের জীবনযাত্রা এবং পরিবহণ খরচে বড় প্রভাব ফেলছে।
মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত ও আন্তর্জাতিক প্রভাব
মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাবে তেলের দাম বৃদ্ধি ভিয়েতনামের বাজারে সরাসরি প্রভাব ফেলেছে। দেশটি ইতিমধ্যেই জ্বালানি সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে।
ভিয়েতনাম সরকার সম্প্রতি কাতার, কুয়েত, আলজেরিয়া এবং জাপানসহ বিভিন্ন দেশের কাছে জ্বালানি সহায়তা চেয়েছে। এছাড়া সোমবার রাশিয়ার সঙ্গে তেল ও গ্যাস উৎপাদন সংক্রান্ত দ্বিপাক্ষিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, যা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।
তবে দেশীয় বাজারে দাম নিয়ন্ত্রণের জন্য সরকার পদক্ষেপও নিচ্ছে। মঙ্গলবার অর্থ মন্ত্রণালয় পেট্রল ও ডিজেলের ওপর পরিবেশ সুরক্ষা কর অর্ধেকে নামানোর প্রস্তাব দিয়েছে, যা নাগরিকদের ওপর চাপ কিছুটা কমাতে পারে।
নাগরিকদের অভিজ্ঞতা
হ্যানয়ের বাসিন্দা নুয়েন ভ্যান চি জানিয়েছেন, গত দুই সপ্তাহ ধরে তিনি তার ট্রাক চালাতে পারেননি, কারণ ডিজেলের দাম এত বেশি যে পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। তিনি এখন যতটা সম্ভব সাইকেল ব্যবহার করছেন।
৫৪ বছর বয়সী ব্যবসায়ী এএফপিকে বলেন:
“ডিজেলের এই অবিশ্বাস্য দামে আমি আমার ট্রাক বিক্রিও করতে পারছি না। কারণ, কেউ এটি ব্যবহার করতে চায় না।”
এটি দেখাচ্ছে, দেশীয় ব্যবসায়ীদের উপর দাম বৃদ্ধির প্রভাব কতটা গুরুতর।
সরকারের পদক্ষেপ ও সমাধান
উচ্চ দামের প্রভাব মোকাবিলায় ভিয়েতনাম সরকার বেশ কিছু পদক্ষেপ নিচ্ছে:
- আন্তর্জাতিক সহায়তা চাওয়া: কাতার, কুয়েত, আলজেরিয়া ও জাপানের কাছে তেল ও জ্বালানি সাহায্য চাওয়া।
- দ্বিপাক্ষিক চুক্তি: রাশিয়ার সঙ্গে তেল ও গ্যাস উৎপাদন চুক্তি স্বাক্ষর।
- কর হ্রাস: পরিবেশ সুরক্ষা কর অর্ধেকে নামিয়ে তেলের মূল্যের ওপর চাপ কমানো।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই পদক্ষেপগুলো স্বল্পমেয়াদে কিছুটা স্বস্তি দিতে পারে, তবে আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা এবং মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে দীর্ঘমেয়াদে দাম স্থিতিশীল রাখা চ্যালেঞ্জিং।
আন্তর্জাতিক বাজার ও সম্ভাব্য জ্বালানি সংকট
বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজারে উত্তেজনা বাড়ার কারণে ভিয়েতনামে তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব আন্তর্জাতিকভাবে লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এমন পরিস্থিতি বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা তৈরি করতে পারে।
ভিয়েতনামের মতো দেশগুলো যেখানে তেলের উপর নির্ভরশীলতা বেশি, সেখানে পরিবহণ খরচ বৃদ্ধি ও দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় চাপ তৈরি হচ্ছে।
নাগরিক ও ব্যবসায়িক পরিণতি
দাম বৃদ্ধির প্রভাব:
- পরিবহণ খরচ বেড়ে গেছে, যা পণ্য পরিবহনে ব্যয় বাড়াচ্ছে।
- ছোট ব্যবসায়ীরা ডিজেল খরচের কারণে উৎপাদন বা বিতরণ সীমিত করতে বাধ্য।
- সাধারণ মানুষ দৈনন্দিন যাতায়াত কমিয়ে দিচ্ছেন, যেমন সাইকেল বা পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ব্যবহার করছেন।
এই পরিস্থিতি ভিয়েতনামের অর্থনীতি ও নাগরিক জীবনে দীর্ঘমেয়াদে প্রভাব ফেলতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাবে ভিয়েতনামে ডিজেল ও পেট্রলের দাম দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। আন্তর্জাতিক সহায়তা এবং সরকারী কর হ্রাস পদক্ষেপ কিছুটা স্বস্তি দিতে পারে, তবে মধ্যপ্রাচ্য ও আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এখনও চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।
ভিয়েতনামের নাগরিক ও ব্যবসায়ীরা এখন উচ্চ খরচে টিকে থাকার এবং স্বল্পমেয়াদে বিকল্প জ্বালানি খুঁজে পাওয়ার জন্য প্রস্তুত।
