প্রিন্ট এর তারিখ: আগস্ট ৩১, ২০২৬, ৭:৫০ পি.এম. || প্রকাশের তারিখ: আগস্ট ২৬, ২০২৬, ১০:৪৭ এ.এম.

দখলের ডাইনিং টেবিলে পরিবেশিত বিশ্ব

আয়াজ আহমদ বাঙালি:

শক্তিশালী দেশের দ্বারা দুর্বল দেশ বা অঞ্চলের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাই ঔপনিবেশিকতার স্বাক্ষর; এর মাধ্যমে সম্পদ আহরণ, বাজার প্রসার এবং স্থানীয় সংস্কৃতির ওপর নিয়ন্ত্রণ কার্যকর হয়।

উদাহরণ হিসেবে ভারতের উপর ব্রিটিশ শাসন, আফ্রিকার কিছু অংশে ফরাসি নিয়ন্ত্রণ, লাতিন আমেরিকার স্প্যানিশ শাসন এবং ইন্দোনেশিয়ায় ডাচ শাসন উল্লেখ করা যায়। এই বৈশ্বিক শোষণমূলক প্রকল্পের মাধ্যমে ইউরোপের কয়েকটি রাষ্ট্র এশিয়া, আফ্রিকা এবং আমেরিকার মাটি, প্রাকৃতিক সম্পদ ও মানুষের শ্রম সমৃদ্ধির কাঁচামালে পরিণত করেছিল। কখনও তলোয়ারের জোরে, কখনও চুক্তির ছলে এবং কখনও এমন আইন প্রণয়ন করে যা সাধারণ মনে হলেও বাস্তবে শৃঙ্খলের চেয়ে শক্তিশালী।

ভারত থেকে শুরু করলে স্পষ্টভাবে দেখা যায় এই লুটের প্রকৃতি কী রকম ছিল ! ১৭৫৭ সালে পলাশী যুদ্ধের আগে ভারত বিশ্বের মোট উৎপাদনের প্রায় ২৫ শতাংশ উৎপন্ন করত। সেই ভারত ১৯৪৭ সালে মাত্র ৪ শতাংশে নেমে এসেছিল। দুই শতাব্দীতে এই পতন কীভাবে ঘটে? ভারতীয় অর্থনীতিবিদ Utsa Patnaik দশকের পর দশক গবেষণা করে হিসাব দিয়েছেন, ব্রিটেন ১৭৬৫-১৯৩৮ সাল পর্যন্ত ভারতবর্ষ থেকে আনুমানিক ৪৪.৬ ট্রিলিয়ন ডলার সম্পদ সরিয়ে নিয়েছে (বর্তমান হিসাবে ব্রিটেন ও ভারতের মিলিত জিডিপির প্রায় ১৭ গুণ আর আমেরিকার মোট জিডিপির প্রায় দেড়গুণ)।

পদ্ধতিটি সূক্ষ্ম হলেও একেবারে নিষ্ঠুর ছিল। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতে রাজস্ব আদায়ের অধিকার পেল। ভারতীয় উৎপাদকরা যখন পণ্য রপ্তানি করত, ক্রেতারা লন্ডন থেকে কেনা বিশেষ “কাউন্সিল বিল” দিয়ে পরিশোধ করত। সেই বিল ভাঙাতে গেলে ভারতীয়রা পেত ভারতের কর রাজস্ব থেকে সংগৃহীত রুপি। অর্থাৎ ভারতীয়রা নিজেদের উপার্জিত অর্থ নিজেরা পাচ্ছিল না; লন্ডনে চলে যাচ্ছিল। এই টাকা দিয়ে ব্রিটেন চিন আক্রমণ করেছে, ১৮৫৭ সালের প্রথম ভারতীয় স্বাধীনতা বিদ্রোহ দমন করেছে এবং ইউরোপে রেলপথ বানিয়েছে। আর ভারতের বস্ত্রশিল্প ধ্বংস করা হয়েছিল পরিকল্পিতভাবে– ল্যাঙ্কাশায়ারের কাপড়ে শুল্ক মওকুফ এবং ভারতীয় কাপড়ে ৭০-৮০ শতাংশ শুল্ক। ঢাকাই মসলিনের তাঁতি রাতারাতি বেকার। একই পরিণতি লবণ ও লোহা শিল্প এবং জাহাজ নির্মাণেও।

এই শোষণের পরিণতি দুর্ভিক্ষে পরিণত হলো।১৭৭০ সালের বাংলার দুর্ভিক্ষে প্রায় এক কোটি মানুষ মারা গিয়েছিল– বাংলার তৎকালীন জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ। কোম্পানি খাজনা আদায় বন্ধ করেনি, এমনকি মানুষ মরতে মরতেও না। ১৯৪৩ সালের বাংলার দুর্ভিক্ষে ৩০ লাখেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারায়, তখনও ব্রিটিশ সরকার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সৈন্যদের জন্য ভারত থেকে খাদ্যশস্য রপ্তানি অব্যাহত রেখেছিল। ব্রিটিশ শাসনে ভারতীয়দের গড় আয়ুষ্কাল ১৮৭০ থেকে ১৯২০ সালের মধ্যে এক-পঞ্চমাংশ কমে যায়।

পৃথিবীর অন্য প্রান্তে, বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম স্বর্ণ মজুদের মালিক ফ্রান্সের ভূখণ্ডে একটাও সোনার খনি নেই। কিন্তু দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকে ২,৪৩৬ টন সোনা সংরক্ষিত আছে। বিপরীতে, ফ্রান্সের তৎকালীন উপনিবেশ মালির ৮৬০-র বেশি খনি থেকে প্রতিবছর প্রায় ৫০ টন সোনা আহরণ করা হয়। বিস্ময়ের বিষয়, এত বিপুল স্বর্ণ উৎপাদন সত্ত্বেও মালির কেন্দ্রীয় ব্যাংকে সোনার মজুদ নেই বললেই চলে। অর্থাৎ, যে দেশ সোনা উৎপাদন করছে, সেই দেশ সেই সম্পদের নিয়ন্ত্রণ বা সঞ্চয় থেকে বঞ্চিত; বরং ঐ সম্পদের বড় অংশ চলে যাচ্ছে উন্নত দেশগুলোর ভাণ্ডারে, বিশেষত সাবেক উপনিবেশিক শক্তিগুলোর কাছে। দক্ষিণ গোলার্ধের বহু দেশের চিত্র এরকমই। এসব দেশে খনিজ, তেল, গ্যাস, সোনা বা অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদ স্থানীয় ভূখণ্ড থেকেই উত্তোলন করা হয় এবং উৎপাদনের মূল প্রক্রিয়াটিও সেখানে সম্পন্ন হয়। কিন্তু এই সম্পদের মালিকানা, মূল্য নির্ধারণ, রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ এবং আর্থিক লাভের বড় অংশ থাকে বিদেশি কর্পোরেশন, বহুজাতিক কোম্পানি বা উন্নত দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানের হাতে।

এদিকে, ইন্দোনেশিয়ায় ডাচরা তিনশো বছরের উপনিবেশে যে পদ্ধতি চালু করেছিল তার নাম “চাষ পদ্ধতি” বা Cultivation System। ১৮৩০ সালে ডাচ গভর্নর-জেনারেল ভান ডেন বোস আইন জারি করলেন–জাভার কৃষকদের হয় জমির ২০ শতাংশে সরকারি ফসল ফলাতে হবে, নয়তো ৬০ দিন বিনা মজুরিতে সরকারি বাগানে কাজ করতে হবে। ডাচ সরকার চিনি, কফি, চা, নীল ও তামাকের ওপর আধিপত্য স্থাপন করেছিল। এই ব্যবস্থা ১৮৫০-র দশকে ডাচ কেন্দ্রীয় সরকারের রাজস্বের ৫২ শতাংশ যোগান দিচ্ছিল। এই অর্থেই নেদারল্যান্ডস আধুনিক হয়েছিল, আর জাভার কৃষক না খেয়ে মরছিল। ডাচ লেখক মুলতাতুলি এই বর্বরতার বিরুদ্ধে লিখেছিলেন “ম্যাক্স হ্যাভেলার”–সেই উপন্যাস আজও ডাচ সাহিত্যের বিবেকের দংশন হয়ে আছে।
কঙ্গোর বাস্তবতা বর্ণনা করা আরও কঠিন! বেলজিয়ামের রাজা দ্বিতীয় লিওপোল্ড ১৮৮৫ সালে বার্লিন সম্মেলনে ২৬ লাখ বর্গ কিঃমিঃ-র কঙ্গোকে ব্যক্তিগত সম্পত্তি হিসেবে স্বীকৃতি আদায় করলেন —এলাকাটি বেলজিয়ামের আশিগুণ বড়। রাবার সংগ্রহের নির্ধারিত কোটা পূরণ না হলে কর্মীর হাত কেটে নেওয়া হতো। শিশুদের অপহরণ করা হতো। ১৮৯০ থেকে ১৯২০ সালের মধ্যে কঙ্গোর জনসংখ্যা ১৪ মিলিয়ন থেকে ১০ মিলিয়নে নেমে আসে। তখনকার বিশ্বখ্যাত লেখক মার্ক টোয়েন এবং জোসেফ কনরাড লিওপোল্ডের অত্যাচার ও বর্বরতা নিয়ে যথাক্রমে “King Leopold’s Soliloquy” (ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক প্রতিবাদপত্র) এবং “Heart of Darkness”(উপন্যাস) লিখলেন তবু লিওপোল্ড থামেননি। ১৯০৮ সালে আন্তর্জাতিক চাপে তিনি কঙ্গো বেলজিয়ান সরকারের হাতে ছেড়ে দিলেও শোষণ বন্ধ হয়নি। ১৯৬০ সালে স্বাধীনতার পরও বেলজিয়াম খনিজ সমৃদ্ধ কাতাঙ্গা প্রদেশের বিচ্ছিন্নতাকে সমর্থন করল, আর নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী পাট্রিস লুমুম্বাকে হত্যা করা হলো –যার পেছনে বেলজিয়াম ও আমেরিকার সম্পৃক্ততা পরে নথিভুক্ত হয়েছে।

পশ্চিম আফ্রিকায় ফ্রান্সের উপনিবেশবাদ শেষ হয়নি পতাকা নামানোর সাথে সাথে। ১৯৬০ সালে মালি, সেনেগাল, কোত দিভোয়ার, বুরকিনা ফাসো, নাইজার, টোগো, বেনিন, ক্যামেরুন, চাদ, মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র, গ্যাবন এবং কঙ্গো প্রজাতন্ত্র–পশ্চিম ও মধ্য আফ্রিকার চৌদ্দটি দেশকে “CFA ফ্র্যাংক” নামের মুদ্রা ব্যবস্থায় আটকে রাখা হলো। শর্ত একটাই; বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ৫০ শতাংশ ফ্রান্সের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা রাখতে হবে। নিজের টাকার উপর নিজের নিয়ন্ত্রণ নেই। একেই তারা বলল স্বাধীনতা।

আফ্রিকার প্রাকৃতিক সম্পদের মানচিত্রটি দেখলে মাথা ঘোরে। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম প্লাটিনাম মজুদ থাকা জিম্বাবুয়েতে ব্রিটিশরা কৃষ্ণাঙ্গ কৃষকদের জমি কেড়ে শ্বেতাঙ্গ বসতি তৈরি করেছিল। মোজাম্বিক ও অ্যাঙ্গোলার তেল-গ্যাসের জন্য পর্তুগাল দীর্ঘ যুদ্ধ চালিয়েছে। ব্রিটিশ শাসনামলে ঘানা (সোনা ও কোকো) ও নাইজেরিয়া (তেল) কাঁচামাল রপ্তানির উপকরণে পরিণত হয়েছিল,শিল্প গড়ে ওঠেনি। নামিবিয়ায় ১৯০৪ থেকে ১৯০৮ সালের মধ্যে জার্মানদের দ্বারা হেরেরো ও নামা জনগোষ্ঠীর ওপর সংঘটিত হয় আধুনিক বিশ্বের প্রথম দিকের এক গণহত্যা। হেরেরো জনগোষ্ঠীর প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষকে হত্যা করা হয় কিংবা মরুভূমির দিকে ঠেলে দেওয়া হয়। একশো বছর পরে, ২০২১ সালে, জার্মানি আনুষ্ঠানিকভাবে এটিকে গণহত্যা বলে স্বীকার করেছে।

১৮৮২ সালে মিশরে ব্রিটিশ দখল প্রতিষ্ঠিত হয়, আর মিশরীয় শ্রমিকদের ত্যাগে নির্মিত সুয়েজ খাল ব্রিটিশ-ফরাসি নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।আলজেরিয়ায় ফরাসি উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে ১৯৫৪ থেকে ১৯৬২ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে আনুমানিক ১৫ লাখ আলজেরীয় প্রাণ হারায়। লিবিয়ায় ইতালীয় উপনিবেশকালে বেনগাজি অঞ্চলে গণহত্যা চালানো হয়। উত্তর আফ্রিকায় সভ্যতার নাম করে আসা ইউরোপীয়দের হাতেই তৈরি হয়েছিল অসংখ্য গণকবর। লাতিন আমেরিকার লুণ্ঠন শুরু হয়েছিল আরও পাঁচশো বছর আগে। বলিভিয়ার পোটোসিতে সেরো রিকো পর্বতে রুপার মজুদ আবিষ্কার হবার পর স্পেনীয়রা “মিতা” পদ্ধতিতে আদিবাসীদের জোরপূর্বক খনিতে নামাল। ষোলো থেকে আঠারো শতাব্দীতে মেক্সিকো, পেরু এবং বলিভিয়া থেকে আনুমানিক ১,৮৫,০০০ কিঃগ্রাঃ সোনা এবং ১ কোটি ৬০ লাখ কিঃগ্রামেরও বেশি রুপা ইউরোপে গেছে। আনুমানিক ৮০ লাখ আদিবাসী ও আফ্রিকান দাস এই খনিগুলোতে কাজ করতে করতে মারা গেছে। এই সম্পদই ইউরোপের ব্যাংকিং ব্যবস্থা এবং শিল্পবিপ্লবকে অর্থায়ন করেছিল। উরুগুয়ের লেখক এদুয়ার্দো গালেয়ানো বলেছিলেন, এত সম্পদ পাঠাতে পাঠাতে লাতিন আমেরিকার নিজের ঘরে কিছুই অবশিষ্ট নেই।

চিলির গল্পটি আধুনিক ঔপনিবেশিকতার পাঠ্যপুস্তক। ১৯৭৩ সালে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট সালভাদর আলেন্দে তামার খনি জাতীয়করণ করতে চেয়েছিলেন– যাতে চিলির মানুষ নিজেদের সম্পদের আয় পায়। সিআইএ-র সহায়তায় সামরিক অভ্যুত্থানে তাকে হত্যা করা হলো। পিনোচেতের স্বৈরাচার তামা শিল্প বিদেশি বিনিয়োগকারীদের হাতে ফিরিয়ে দিল। কলম্বিয়া, হন্ডুরাস এবং গুয়াতেমালায় ইউনাইটেড ফ্রুট কোম্পানির কলা বাগান এতটাই ক্ষমতাবান ছিল যে এই দেশগুলো “বানানা রিপাবলিক” নামে পরিচিত হয়ে গেল– একটিই বিদেশি কর্পোরেশনের সুবিধার জন্য।

হাইতির ইতিহাস পৃথিবীর করুণ ও বেদনাদায়ক অসঙ্গতিগুলোর একটি।১৭৯১ সালে হাইতির দাসরা ফ্রান্সের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করল। তেরো বছরের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পর ১৮০৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হলো পৃথিবীর প্রথম সফল দাস বিপ্লবের ফসল। কিন্তু ফ্রান্স স্বীকৃতির বিনিময়ে দাবি করল ১৫০ মিলিয়ন ফ্র্যাংক — দাস-মালিকদের “ক্ষতি”র ক্ষতিপূরণ। যারা মানুষকে দাস বানিয়েছিল তারা পেল টাকা, যারা দাস ছিল তারা পেল আরও ঋণ। এই ঋণ পরিশোধ করতে হাইতির লাগল ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত।

আটলান্টিক দাস বাণিজ্য ছিল ঔপনিবেশিক লুণ্ঠনের সবচেয়ে কলঙ্কময় অধ্যায়। ১৫০০ থেকে ১৮৫০ সাল পর্যন্ত প্রায় ১ কোটি ২৫ লাখ আফ্রিকানকে দাস হিসেবে আমেরিকায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। পশ্চিম আফ্রিকার সেনেগাল, গাম্বিয়া, গিনি, সিয়েরা লিওন, বেনিন এবং নাইজেরিয়া থেকে কোটি কোটি সুস্থ-সবল মানুষ ছিনিয়ে নেওয়া হলো। এদের মধ্যে ১৫-২০ শতাংশ সমুদ্রযাত্রায় মৃত্যুবরণ করে। দাস শ্রমের উপর গড়ে উঠেছিল যুক্তরাষ্ট্রের তুলা-শিল্প, ক্যারিবিয়ানের চিনি-শিল্প এবং ব্রাজিলের কফি-শিল্প। ১৮৩৩ সালে ব্রিটেনে দাসপ্রথা শেষ হবার পরও দাস-মালিকদের ২০ মিলিয়ন পাউন্ড ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়, যা তখনকার সরকারি বাজেটের ৪০ শতাংশের সমান। যারা দাস ছিল তারা কিছুই পায়নি।

এশিয়ার অন্য প্রান্তে ফিলিপাইন প্রথমে স্পেনীয়, পরে আমেরিকান উপনিবেশ বা দখলের অধীনে ছিল। ১৮৯৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র ফিলিপাইন কিনে নিল মাত্র দুই কোটি ডলারে– ফিলিপিনোদের মত না নিয়ে। স্বাধীনতা আন্দোলনে চার লাখেরও বেশি ফিলিপিনো প্রাণ হারায়। ভিয়েতনাম শতাব্দী ধরে ফরাসি উপনিবেশ ছিল, রাবার ও ধান রপ্তানি হতো কিন্তু কৃষকদের জীবন ছিল দারিদ্র্যপীড়িত। মালয়েশিয়া থেকে টিন ও রাবার এবং মায়ানমার থেকে চাল ও সেগুন কাঠ –ব্রিটিশ কোম্পানিগুলো নিয়ে গেছে, শিল্প রেখে যায়নি। শ্রীলঙ্কায় চা বাগানের জন্য দক্ষিণ ভারত থেকে তামিল শ্রমিক আনা হয়েছিল, যারা আজও পরিচয় সংকটে বাস করছে। কেনিয়ায় ব্রিটিশরা উর্বর জমি দখল করে শ্বেতাঙ্গ বসতি বানিয়েছিল এবং মাউ মাউ বিদ্রোহ দমনকালে নির্যাতন শিবির চালিয়েছিল–পরবর্তীতে ব্রিটিশ আদালত স্বীকারও করেছে।

ভৌত সম্পদের পাশাপাশি লুট হয়েছে সংস্কৃতি ও জ্ঞান। ব্রিটিশ মিউজিয়ামে আজও আছে নাইজেরিয়া থেকে ১৮৯৭ সালে সামরিক অভিযানে নিয়ে যাওয়া বেনিন ব্রোঞ্জ। গ্রিস থেকে নেওয়া পার্থেনন মার্বেল লন্ডনে। মিশরের ওবেলিস্ক প্যারিসের চত্বরে। ভারত থেকে কোহিনূর হীরা ব্রিটিশ মুকুটে। এই লুটই প্রমাণ, উপনিবেশিত জনগণের সম্পদ ছাড়াও তাদের ইতিহাস ও পরিচিতি ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছিল।

স্বাধীনতা পাওয়া সত্ত্বেও সত্যিকারের মুক্তি মেলেনি; বাধ্যবাধকতা রয়ে গেছে। বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ-র “স্ট্রাকচারাল অ্যাডজাস্টমেন্ট প্রোগ্রাম” উন্নয়নশীল দেশগুলোকে বাধ্য করেছে রাষ্ট্রীয় শিল্প বেসরকারি করতে, ভর্তুকি তুলতে
এবং বাজার খুলে দিতে। অর্থনীতিবিদ জেসন হিকেলের গবেষণা মতে, ১৯৬০-২০১৭ সাল পর্যন্ত ধনী দেশগুলো গ্লোবাল সাউথ থেকে ১৫২ ট্রিলিয়ন ডলার সম্পদ বের করে নিয়েছে–বিদেশি সাহায্যের নামে যা ঢেলেছে তার চেয়ে অনেক অনেক বেশি। মালির সোনা এখনও প্যারিসের ভল্টে ঘুমায়।

আজ ক্ষতিপূরণের দাবি উঠছে। ক্যারিবিয়ান দেশগুলোর জোট CARICOM দাসপ্রথার ক্ষতিপূরণ চাইছে। জার্মানি নামিবিয়ার গণহত্যার স্বীকৃতি দিয়েছে। নেদারল্যান্ডস ক্ষমা চেয়েছে। ব্রিটেন “গভীর দুঃখ” প্রকাশ করেছে, কিন্তু অর্থনৈতিক ক্ষতিপূরণে রাজি হয়নি। সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন বলেছিলেন, ক্ষতিপূরণ দেওয়া শুরু হলে ব্রিটিশ মিউজিয়াম খালি হয়ে যাবে। মালির শূন্য রিজার্ভ ও ফ্রান্সের ২,৪৩৬ টন সোনার মধ্যকার পার্থক্য পরিকল্পিত ব্যবস্থার ফলেই ঘটেছে; কোটি কোটি মানুষের শ্রম, মাটি ও স্বপ্ন অন্যের সমৃদ্ধির কাজে ব্যবহার হয়েছে। আফ্রিকার দারিদ্র্য, দক্ষিণ এশিয়ার অনুন্নয়ন এবং লাতিন আমেরিকার ঋণের ফাঁদ শোষণমূলক বৈশ্বিক ব্যবস্থার অনিবার্য ফল! যতদিন না এই সত্যগুলো মুখে বলা হবে , ইতিহাসের হিসাব মিলানো হবে, ততদিন বিশ্বের অর্ধেক মানুষের দারিদ্র্যকে তাদেরই “ভাগ্য” হিসেবে ধরা হবে। আর এটাই হবে মানুষের বিবেক কাঁপিয়ে দেওয়ার মতো বর্বর, ভয়ঙ্কর ও হৃদয়বিদারক মিথ্যা।