ফিলিস্তিনি এক শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনা অবলম্বনে নির্মিত তিউনিশিয়ার আলোচিত চলচ্চিত্র ‘দ্য ভয়েজ অব হিন্দ রজব’ ভারতে প্রদর্শনে জটিলতা তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক স্পর্শকাতরতার কারণ দেখিয়ে সিনেমাটির সেন্সর ছাড়পত্র আটকে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে, যা নিয়ে দেশটির রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, অস্কারের সেরা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র বিভাগে মনোনয়ন পাওয়া এই সিনেমাটি ভারতে মুক্তির উদ্যোগ নেওয়া হলেও এখনো কেন্দ্রীয় চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ডের অনুমোদন পায়নি।
চলচ্চিত্রটির ভারতীয় পরিবেশক প্রতিষ্ঠান জয় বিরাত্রা এন্টারটেইনমেন্টের প্রধান মনোজ নন্দওয়ানা বলেন, গত ফেব্রুয়ারিতে সিনেমাটি সেন্সর ছাড়পত্রের জন্য জমা দেওয়া হয়। পরিকল্পনা ছিল ৬ মার্চ অস্কার অনুষ্ঠানের আগেই এটি মুক্তি দেওয়ার। তবে সেন্সর বোর্ডের এক সদস্য তাকে অনানুষ্ঠানিকভাবে জানান, চলচ্চিত্রটি মুক্তি পেলে ভারত-ইসরাইল দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
এ যুক্তির তীব্র বিরোধিতা করে মনোজ নন্দওয়ানা বলেন, “ভারত ও ইসরাইলের সম্পর্ক এতটাই দৃঢ় যে একটি চলচ্চিত্রের কারণে তা ক্ষতিগ্রস্ত হবে—এমন ধারণা অযৌক্তিক। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইতালি ও ফ্রান্সের মতো দেশেও সিনেমাটি মুক্তি পেয়েছে, যাদের সঙ্গে ইসরাইলের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।”
সিনেমাটি নির্মাণ করেছেন তিউনিশিয়ার খ্যাতনামা পরিচালক কাউথার বেন হানিয়া। এটি পাঁচ বছর বয়সী ফিলিস্তিনি শিশু হিন্দ রাজাবের হৃদয়বিদারক বাস্তব ঘটনার ওপর ভিত্তি করে তৈরি। ২০২৪ সালে যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজায় পরিবারের সঙ্গে পালানোর সময় একটি গাড়িতে আটকে পড়ে সে। জীবন বাঁচাতে ফিলিস্তিনি রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিতে ফোন করে সাহায্য চাইলেও শেষ পর্যন্ত ইসরাইলি হামলায় প্রাণ হারায় শিশুটি। তার সেই বাস্তব ফোনকলের অডিও চলচ্চিত্রে ব্যবহার করা হয়েছে, যা দর্শকদের গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে।
চলচ্চিত্রটি গত সেপ্টেম্বরে ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হলে ব্যাপক সাড়া ফেলে। প্রদর্শন শেষে প্রায় ২০ মিনিট ধরে দাঁড়িয়ে করতালির মাধ্যমে নির্মাতাকে সম্মান জানান দর্শকরা। একইসঙ্গে এটি মর্যাদাপূর্ণ ‘সিলভার লায়ন’ পুরস্কার অর্জন করে।
ভারতে সিনেমাটির প্রদর্শনী আটকে যাওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর রাজনৈতিক মহলে সমালোচনার ঝড় ওঠে। কংগ্রেস নেতা ও সংসদ সদস্য শশী থারুর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক পোস্টে এই সিদ্ধান্তকে “লজ্জাজনক” বলে আখ্যা দেন। তিনি বলেন, “চলচ্চিত্র প্রদর্শন মতপ্রকাশের স্বাধীনতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এর সঙ্গে রাষ্ট্রীয় কূটনৈতিক সম্পর্কের কোনো সংশ্লিষ্টতা থাকা উচিত নয়।”
তিনি আরও মন্তব্য করেন, বিদেশি কোনো দেশের প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কায় চলচ্চিত্র বা বই নিষিদ্ধ করার প্রবণতা একটি পরিপক্ব গণতন্ত্রের জন্য অশোভন এবং এ ধরনের সংস্কৃতি বন্ধ হওয়া উচিত।
বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের বর্তমান পররাষ্ট্রনীতিতে ইসরাইলের প্রতি সমর্থন বৃদ্ধির কারণে রাজনৈতিক বিবেচনায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে থাকতে পারে। তবে এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত ভারতীয় সেন্সর বোর্ডের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সব মিলিয়ে, আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত এই চলচ্চিত্রটির ভারতে মুক্তি নিয়ে অনিশ্চয়তা এখনো কাটেনি, বরং তা নতুন করে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সেন্সরশিপ নিয়ে বিতর্ক উসকে দিয়েছে।

