প্রিন্ট এর তারিখ: আগস্ট ৩১, ২০২৬, ৮:৫৯ পি.এম. || প্রকাশের তারিখ: আগস্ট ১০, ২০২৬, ৫:৩৬ পি.এম.

শিল্পী এসএম সুলতানের ১০৩তম জন্মবার্ষিকী আজ

নড়াইল জেলা প্রতিনিধিঃ

বরেণ্য শিল্পী এসএম সুলতান মানুষের ভিতরে শক্তির উত্থানকে তার রঙিন ক্যানভাসে দেখাতেন। তিনি কৃষকের বিশাল শক্তিকে মহাকালের ইতিহাসে রেখে গেলেন এবং প্রমাণ করলেন দরিদ্র কৃষক দুর্বল নয়। সেই বৈষম্যবিরোধী সাম্য ও সৌন্দর্যের শিল্পভাষার মহান শিল্পী সুলতানের আজ জন্মবার্ষিকী।

১৯২৪ সালের ১০ আগস্ট এ দিনে নড়াইলের মাছিমদিয়ায় মেছের আলী ও মাজু বিবির ঘরে এসএম সুলতান জন্মগ্রহণ করেন, যিনি মাটি ও মানুষের চিত্রশিল্পী।

ফাইল একাডেমি এসএম সুলতান স্মৃতি সংগ্রহশালার সভাপতি ও জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ আবদুল ছালাম বলেন, এসএম সুলতানের ১০৩তম জন্মবার্ষিকী উদযাপনে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সহায়তায়, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, জেলা প্রশাসন ও এসএম সুলতান স্মৃতি সংগ্রহশালার সহযোগিতায় সোমবার (১০ আগস্ট) দিনব্যাপী নানা আয়োজন করা হয়েছে।

আয়োজনের মধ্যে রয়েছে, এসএম সুলতান স্মৃতি সংগ্রহশালায় সকাল ৬টায় কোরান খতম, সকাল ৯টায় শিল্পীর মাজারে শ্রদ্ধাঞ্জলি ও দোয়া মাহফিল, সকাল সাড়ে ৯টায় শিশুদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা ও প্রদর্শনী উদ্বোধন, সকাল ১০টায় আর্ট ক্যাম্পের উদ্বোধন, আলোচনা অনুষ্ঠান ও সম্মাননা পদক প্রদান। পরে পুরস্কার বিতরণী ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হবে।

সংস্কৃতি মন্ত্রী অ্যাডভোকেট নিতাই রায় চৌধুরী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন। এসএম সুলতান স্মৃতি সংগ্রহশালার সভাপতি ও জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ আবদুল ছালাম অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন।

বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন- নড়াইল-১ আসনের সংসদ সদস্য বিশ্বাস জাহাঙ্গীর আলম, নড়াইল-২ আসনের সংসদ সদস্য আতাউর রহমান বাচ্চু ও সংস্কৃতি বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের সচিব কানিজ মওলা। সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক রেজাউদ্দিন স্টালিন।

‘এসএম সুলতান : জীবনঘনিষ্ঠ ও সমাজ বাস্তবতার শিল্পী’ শীর্ষক আলোচনা সভায় মুখ্য আলোচক হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের অধ্যাপক রেজা আসাদ আল হুদা অনুপম উপস্থিত থাকবেন। স্বাগত বক্তব্য দেবেন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির চারুকলা বিভাগের পরিচালক আব্দুল হালিম চঞ্চল।

এ বছরের ‘সুলতান সম্মাননা পদক-২০২৬’ পাচ্ছেন ড. মো. আব্দুস সাত্তার। এসএম সুলতানের জন্মবার্ষিকীর নানা অনুষ্ঠান চমৎকার আয়োজনে হচ্ছে বলে জানান এসএম সুলতান সংগ্রহশালার কিউরেটর তন্দ্রা মুখার্জী।

শিল্প সাহিত্য জগতের বিশেষ নাম এসএম সুলতান। পুরো নাম শেখ মোহাম্মদ সুলতান। যদিও তার বাবা শৈশবে তাকে লাল মিয়া নাম দিয়েছিলেন। বাবা শেখ মোহাম্মদ মেছের আলী ছিলেন একজন রাজমিস্ত্রি। কিন্তু সুলতানের কাছে তার বাবা ছিলেন একজন শিল্পী। জমিদার বাড়ির অনেক নকশা সুলতানের বাবার করা। সুলতান এ কাজগুলোকে কাছ থেকে দেখেছেন, যা তাকে পরে শিল্পী হতে অনুপ্রাণিত করেছে।

স্কুলে ভর্তি হলেও স্কুলের নিয়মে পড়াশোনা তার ভালো লাগত না। সময় কাটাত প্রকৃতি অনুভব করে। কখনো ক্লাসে বসে আবার কখনো চিত্রা নদীর পাড়ে বসে স্কেচ করতেন। স্কুলের শিক্ষক রঙ্গলাল ব্যাপারটি লক্ষ্য করলেন। সুলতানের খাতা দেখে বুঝতে পারলেন তার মধ্যে এক শিল্পী রয়েছে। তিনি সুলতানের সেই প্রতিভা গড়তে চাইলেন। তিনি সুলতানকে তার বাড়িতে নিয়ে গেলেন। সেখানে রঙ্গলাল সুলতানের সব জ্ঞান শেয়ার করলেন। সেখান থেকে শুরু।

১৯৫০ সালে ইউরোপ সফরের সময় যৌথ প্রদর্শনীতে তার ছবির সঙ্গে সমকালীন বিশ্ববিখ্যাত চিত্রশিল্পী পাবলো পিকাসো, ডুফি, সালভাদর দালি, পল ক্লি, মানেট, মাতিসের ছবিগুলো প্রদর্শিত হয়। সুলতানই একমাত্র এশীয় শিল্পী যার ছবি এসব শিল্পীর ছবির সঙ্গে একত্রে প্রদর্শিত হয়েছে।
শিল্পী এসএম সুলতান ছিলেন মাটি এবং মানুষের শিল্পী। তার শিল্পের বিষয় ছিল বাংলার কৃষক, জেলে, তাঁতি, কামার এবং কুমারের জীবন ও সংগ্রাম। তিনি ভালো বাঁশি বাজাতে পারতেন। তিনি সাপ, ভল্লুক, বানর, খরগোশ, মদনটাক, ময়না, গিনিপিক, মুনিয়া, ষাঁড়সহ নানা প্রাণী পুষতেন।

সৃষ্টিশীল এই শিল্পী নড়াইলের পুরুলিয়ায় ১৯৫৫-৫৬ সালে ‘নন্দন কানন ফাইন আর্ট অ্যান্ড স্কুল, ১৯৭৩-৭৪ সালের দিকে যশোর এমএম কলেজের একটি পুরোনো হোস্টেলে একাডেমি অব ফাইন আর্ট স্কুল, ১৯৭৮ সালে জন্মস্থান নড়াইলের মাছিমদিয়ায় ফাইন আর্ট স্কুল এবং ১৯৮৭ সালে নড়াইলের কুরিগ্রামে ‘শিশুস্বর্গ’ নামে শিশু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি শিশুদের খুব ভালোবাসতেন। তাদের জন্য তৈরি করেন বড় বজরা (ইঞ্জিনচালিত নৌকা)। তার আশ ছিল শিশুদের প্রকৃতির সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে এই বজরায় করে চিত্রা নদীতে শিশুদের নিয়ে ছবি আঁকবেন। তিনি কয়েকবার শিশুদের নিয়ে চিত্রা নদীতে বেড়াতে গিয়ে ছবি আঁকানো শিখিয়েছেন।

১৯৯৩ সালের ১০ আগস্ট শিল্পী নিজ উদ্যোগে চিত্রাঙ্কন, নৃত্য ও সংগীত শিক্ষার জন্য ‘লাল বাউল সম্প্রদায়’ নামে একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন গঠন করেন। ২০০৩ সালে শহরের কুড়িগ্রামে সরকার শিল্পীর নামে সুলতান কমপ্লেক্স গড়ে তোলে। ২০০৯ সালে শিল্পীর ভক্তরা সুলতানের বাগানবাড়ি শহরের পশ্চিম মাছিমদিয়ায় ‘এসএম সুলতান বেঙ্গল চারুকলা মহাবিদ্যালয়’ স্থাপন করেন।

চিত্রশিল্পের খ্যাতি হিসেবে ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘ম্যান অব দ্য ইয়ার’, নিউইয়র্কের বায়োগ্রাফিক্যাল সেন্টার থেকে ‘ম্যান অব অ্যাচিভমেন্ট’ এবং এশিয়া উইক পত্রিকা থেকে ‘ম্যান অব এশিয়া’ পুরস্কার লাভ করেন। এছাড়া ১৯৮২ সালে একুশে পদক এবং ১৯৯৩ সালে স্বাধীনতা পদকে ভূষিত হন। ১৯৮৪ সালে বাংলাদেশ সরকারের রেসিডেন্ট আর্টিস্ট হিসেবে স্বীকৃতি এবং ১৯৮৬ সালে বাংলাদেশ চারুশিল্পী সংসদ সম্মাননা পান।

চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৯৯৪ সালের ১০ অক্টোবর যশোর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে মারা যান তিনি। ‘মাটি ও মানুষের চিত্রশিল্পী’ এসএম সুলতানকে জন্মভূমি নড়াইল শহরের কুড়িগ্রাম এলাকায় সংগ্রহশালা চত্বরে চিরনিদ্রায় রাখা হয়।