সিলেট প্রতিনিধি:
সিলেট নগরীর আম্বরখানা পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ (আইসি) দ্বীন মোহাম্মদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, ক্ষমতার অপব্যবহার, সোর্স ও দালালদের মাধ্যমে অর্থ আদায় এড়বং পুলিশ সদস্যদের ওপর মানসিক চাপ প্রয়োগের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের প্রতিবাদ করায় ফাঁড়ির এক পুলিশ সদস্যকে হয়রানি ও প্রত্যাহারের পর তিনি স্বেচ্ছায় চাকরি ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন বলে দাবি করেছেন।
পদত্যাগকারী ওই পুলিশ সদস্যের দাবি, আইসি দ্বীন মোহাম্মদের কথিত অনিয়ম ও অর্থ আদায়ের বিষয়ে তার কাছে অডিও-ভিডিওসহ একাধিক তথ্য ও রেকর্ড রয়েছে। বিষয়গুলো নিয়ে নিরপেক্ষ ও গোপনীয় তদন্ত হলে আম্বরখানা ফাঁড়ির কার্যক্রম সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যেতে পারে বলেও দাবি করেন তিনি।
অভিযোগ অনুযায়ী, আম্বরখানা ও আশপাশের এলাকায় বিভিন্ন উৎস থেকে নিয়মিত অর্থ আদায়ের একটি ব্যবস্থা রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। এর মধ্যে দলদলি চা-বাগান এলাকার কথিত মাদক কারবার ও অবৈধ ‘তীর খেলা’র আসর থেকে সাপ্তাহিক চাঁদা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়া গোয়াইনঘাট থেকে নগরীতে আসা সবজিবাহী গাড়ি থেকে রাতের বেলায় ১ হাজার টাকা এবং ভারতীয় চোরাই পণ্য—বিশেষ করে জিরা ও চকলেট—বহনকারী গাড়ি থেকে ৪ হাজার টাকা করে আদায়ের অভিযোগ করেছেন ওই পুলিশ সদস্য।
তার দাবি, অনটেস্ট সিএনজি অটোরিকশা থেকেও নিয়মিত মাসোহারা নেওয়া হয়। আম্বরখানা পয়েন্টের হকারদের কাছ থেকে ‘ছাত্তার’ নামে এক ব্যক্তির মাধ্যমে দোকানপ্রতি ১৭০ টাকা করে আদায়ের অভিযোগও রয়েছে। পাশাপাশি এলাকার বিভিন্ন হোটেল থেকে সাপ্তাহিক চাঁদা এবং লাক্কাতুরা এলাকার কথিত মদের স্পট থেকেও অর্থ আদায়ের অভিযোগ করেছেন তিনি।
অভিযোগকারী পুলিশ সদস্যের ভাষ্য, এসব অর্থ আদায়ের কাজে পুলিশের কথিত সোর্স ও স্থানীয় দালালদের ব্যবহার করা হয়। ‘সাদ্দাম’ নামে এক সোর্স নিয়মিত ফাঁড়ির ব্যারাকে যাতায়াত করেন বলেও দাবি তার।
চাঁদার টাকা লেনদেনে ফাঁড়ির সামনের ‘শরীফ’-এর দোকানের বিকাশ নম্বর ব্যবহার করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। হকারদের কাছ থেকে সংগৃহীত অর্থ ফাঁড়ির সামনের একটি ফুজি স্টুডিওর ‘সাব্বির’-এর কাছে জমা রাখা হয় এবং পরে ‘মুন্সি হানিফ’-এর মাধ্যমে তা আইসির কাছে পৌঁছানো হয়—এমন দাবিও করেছেন পদত্যাগকারী সদস্য।
তার আরও দাবি, হকারদের ভ্যানগাড়ি আটকে রেখে ১ হাজার টাকার বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়ার কথোপকথনের অডিও-ভিডিও রেকর্ড তার কাছে রয়েছে।
আইসি দ্বীন মোহাম্মদের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, অভিযানে আটক ব্যক্তিদের মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতে নামমাত্র জরিমানা করিয়ে ছেড়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।
এছাড়া ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা থাকার পরও আম্বরখানা ফাঁড়ির সামনে ‘শরীফ’ ও ‘কালা মিয়া’র দোকান গভীর রাত পর্যন্ত খোলা রাখার সুযোগ দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করেছেন ওই পুলিশ সদস্য।
পদত্যাগকারী সদস্যের দাবি, তিনি আইসির কথিত অনিয়মের প্রতিবাদ করলে বিষয়গুলো নিয়ে কথা কাটাকাটি হয়। পরে তাকে ফাঁড়ি থেকে প্রত্যাহার করে পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করার ব্যবস্থা করা হয়।
তার অভিযোগ, এ বিষয়ে থানার ওসিকে ভুল তথ্য দিয়ে প্রভাবিত করা হয়েছিল। কর্মস্থলে ন্যায়সঙ্গত পরিবেশ না পাওয়া এবং কথিত অনিয়মের সঙ্গে আপস করতে না চাওয়ায় শেষ পর্যন্ত তিনি স্বেচ্ছায় পুলিশ বাহিনী থেকে পদত্যাগ করেন।
“আইসি দ্বীন মোহাম্মদের কথিত অপকর্মের অডিও, ভিডিও এবং আসামিদের বক্তব্যের রেকর্ড আমার কাছে সংরক্ষিত আছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ যদি গোপনীয়ভাবে আম্বরখানা ফাঁড়িতে তদন্ত করে এবং সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদ করে, তাহলে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসবে।”
অভিযোগগুলোর বিষয়ে জানতে আম্বরখানা পুলিশ ফাঁড়ির আইসি দ্বীন মোহাম্মদের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে এ বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তার বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।
অভিযোগগুলোর সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি। অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট অডিও-ভিডিও, আর্থিক লেনদেনের তথ্য, বিকাশ হিসাব, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য এবং পদত্যাগকারী পুলিশ সদস্যের চাকরি-সংক্রান্ত নথি যাচাই করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তার বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অবস্থান প্রকাশ করা হলে প্রতিবেদনটি আরও পূর্ণাঙ্গ হবে।
এখন প্রশ্ন হলো—উত্থাপিত অভিযোগগুলো নিয়ে সিলেট মহানগর পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ কোনো নিরপেক্ষ তদন্ত করবে কি না এবং তদন্তে অভিযোগগুলোর সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় বা আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না।