কাজের মেয়ের সঙ্গে সম্পর্কের কারণে হত্যাকাণ্ড—পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে দায় স্বীকারের দাবি।সিলেট নগরীর রায়নগর রাজবাড়ীর মিতালী আবাসিক এলাকার ১১১ নম্বর বাসায় স্বামী-স্ত্রী ও গৃহপরিচারিকাকে হত্যার ঘটনায় চাঞ্চল্যকর মোড় এসেছে। ঘটনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বাবুল মিয়া (৪০) নামে একজনকে আটক করেছে সিলেট মহানগর পুলিশ (এসএমপি)।
বুধবার (১২ আগস্ট) সকালে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর পুলিশ দ্রুত তদন্তশুরুকরে। পরে তথ্যপ্রযুক্তির সাহায্যে ও গোয়েন্দা তৎপরতার মাধ্যমে রায়নগর এলাকা থেকে বাবুলকে আটক করা হয়। পুলিশ বলছে, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা জানিয়েছেন।
বুধবার সন্ধ্যায় সাংবাদিকদের কাছে এসব তথ্য জানান সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার সারোয়ার মুর্শেদ শামীম।
কে এই বাবুল?
পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আটক বাবুল মিয়ার বয়স আনুমানিক ৪০ বছর। তিনি পেশায় রংমিস্ত্রি। মাঝে মাঝে কসাইয়ের কাজও করতেন। ওই বাসায় আগে রঙের কাজ করার সুবাদে নিহত গৃহপরিচারিকা তাহমিনা (১৫)-এর সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, তাহমিনার সাথে বাবুলের প্রায় ১৫ থেকে ২০ দিনের সম্পর্ক ছিল। বুধবার সকালে বাবুল ওই বাসায় গেলে তাহমিনা দরজা খুলে দেয়। এরপর দুজনের মধ্যে তর্ক শুরু হয়। একপর্যায়ে বাবুল ছুরি দিয়ে তাহমিনাকে আঘাত করেছেন বলে পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে উঠেছে।
তাহমিনার চিৎকার শুনে এগিয়ে এসে নিহত দম্পতি
পুলিশের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, তাহমিনার চিৎকার শুনে গৃহকর্ত্রী সুরাইয়া বেগম (৭২) এগিয়ে এলে তাঁকেও ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করা হয়। পরে গৃহকর্তা আব্দুস সত্তার মিয়া (৮২) স্ত্রীকে বাঁচাতে এসেবাবুলেরসাথে ধস্তাধস্তি করেন। একপর্যায়ে তাকেও ছুরিকাঘাত করা হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে।
এরপর হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে বাবুল বাসার ব্যালকনির খোলা অংশ দিয়ে পালিয়ে যান বলে পুলিশের ভাষ্য।
অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান
পুলিশ জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডের পর পালানোর সময় বাবুল একটি খালি প্লটে হত্যায় ব্যবহৃত ছুরিটি ফেলে দেন। তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ ওই অস্ত্র উদ্ধারেরজন্য অভিযান চালাচ্ছে।
পুলিশের দ্রুত তৎপরতায় রহস্যের জট খুলছে
বুধবার সকালে রায়নগর মিতালী আবাসিক এলাকার ১১১ নম্বর বাসা থেকে তিনজনের মরদেহ উদ্ধারের পর ঘটনাটি নগরজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। প্রথমে ডাকাতি, জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধসহ একাধিক সম্ভাবনা সামনে রেখে তদন্ত শুরু করে পুলিশ।
ঘটনার পর এসএমপির একটি বিশেষ তদন্ত দল গঠন হয়। পাশাপাশি পিবিআইসহ অন্যান্য সংস্থাও তদন্তে যুক্ত হয়। এরপর তথ্যপ্রযুক্তির সাহায্যে সন্দেহভাজন বাবুলকে শনাক্ত করে আটক করা হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে।
প্রাথমিক পর্যায়ে পুলিশ ডাকাতির সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখছিল। কিন্তু বাবুলকে আটক ও জিজ্ঞাসাবাদকরার পর তদন্তের মোড় ঘুরে যায়। এখন মূলত তাহমিনার সাথে বাবুলের সম্পর্ক, হত্যার প্রকৃত উদ্দেশ্য এবং ঘটনার পেছনে অন্য কেউ জড়িত কি না—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
‘মাত্র কয়েক ঘণ্টায়’ পুলিশের সফলতা
সকাল ৯টার দিকে হত্যাকাণ্ডের খবর প্রকাশ্যে আসার পর দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আলামত সংগ্রহ, বিশেষ তদন্ত দল গঠন এবং সন্দেহভাজনকে শনাক্ত করে আটক—সব মিলিয়ে এসএমপির তৎপরতা স্থানীয়ভাবে প্রশংসা পাচ্ছে। পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, ঘটনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সন্দেহভাজনকে হেফাজতে নেওয়া সম্ভব হয়েছে।
তবে আইনিকারণে বাবুল এখনো অভিযুক্ত/সন্দেহভাজন; আদালতে দোষ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত তাঁকে চূড়ান্তভাবে হত্যাকারী বলা যাবে না।
পূর্ণ ঠিকানা এখনো প্রকাশ করেনি পুলিশ
আটক বাবুল মিয়ার নাম, আনুমানিক বয়স ও পেশার তথ্য বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হলেও তাঁর পূর্ণ স্থায়ী ঠিকানা পুলিশ বা নির্ভরযোগ্য সংবাদসূত্রে এখনো প্রকাশ করা হয়নি। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কোনো ঠিকানা যাচাই ছাড়া প্রকাশ করা হচ্ছে না।
এদিকে নিহত তিনজনের দেহ ময়নাতদন্তের জন্য সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মর্গে পাঠানো হয়েছে। হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অস্ত্র উদ্ধারের পাশাপাশি মামলার আইনগত প্রক্রিয়া এবং ঘটনার বিস্তারিত তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।