প্রিন্ট এর তারিখ: জুলাই ১৮, ২০২৬, ২:৩৭ পি.এম. || প্রকাশের তারিখ: জুলাই ১৫, ২০২৬, ৭:২৬ পি.এম.

আড়াই কোটি টাকার চারটি নৌ-অ্যাম্বুলেন্স ব্যবহারহীন, হাওরে এখনও ত্রাণ সালোয়ারে

সৈয়দ আমান উল্লাহ্, স্টাফ রিপোর্টারঃ

বর্ষার মৌসুমে সুনামগঞ্জের বিশাল হাওর এলাকা সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এই অবস্থায় মারাত্মক অসুস্থ রোগীকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার একমাত্র অবলম্বন হয়ে দাঁড়ায় ছোট নৌকা। ঝড়-বৃষ্টি, উত্থানশীল ঢেউ এবং জীবনের ঝুঁকি উপেক্ষা করে পরিবারের সদস্যরা রোগী নিয়ে হাসপাতালে পৌঁছানোর জন্য ছুটে যান উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স অথবা জেলা সদর হাসপাতালে।

অথচ মানুষের এই দুর্দশার সমাধানে সরকার প্রায় আড়াই কোটি টাকা খরচ করে চারটি আধুনিক নৌ-অ্যাম্বুলেন্স প্রদান করলেও, সেগুলো কখনও রোগী পরিবহণের জন্য ব্যবহার করা হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে অবহেলা ও অযত্নের ফলে এখন সেগুলো কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে।

স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ২০১৩ সালে তাহিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জন্য একটি এবং ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে জামালগঞ্জ, ধর্মপাশা ও শাল্লা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জন্য আরও তিনটি নৌ-অ্যাম্বুলেন্স বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। প্রতিটির মূল্য ৬১ লাখ টাকারও বেশি ছিল।

এই আধুনিক নৌ-অ্যাম্বুলেন্সে সঠিক তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, রোগী পরিবহনের জন্য বিশেষ বেড এবং জরুরি চিকিৎসার সুবিধাসমূহ অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু, নৌ-অ্যাম্বুলেন্সগুলো বিতরণের পর চালক নিয়োগ, জ্বালানী সরবরাহ বা নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের কোনও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। ফলে কোটি কোটি টাকার সরকারি সম্পত্তি বছরের পর বছর অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

বর্তমানে নদীর তীরে কোন কোন নৌ-অ্যাম্বুলেন্স মরিচা ধরে রয়েছে, কিছু উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চত্বরে অবহেলায় পড়ে আছে, আবার কিছু থানা প্রাঙ্গণে দীর্ঘদিন ধরে অকেজো অবস্থায় রয়েছে। যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এগুলোর বেশির ভাগ এখন ব্যবহার উপযোগী নয়।

স্থানীয় মানুষ অভিযোগ করেছেন, বর্ষাকালে হাওরাঞ্চলের রোগীদের এখন যাত্রীভাড়া করা ছোট নৌকায় হাসপাতালে যেতে হয়। দীর্ঘ পথ, কঠোর আবহাওয়া এবং উত্তাল পানির কারণে অনেক সময় রোগীর শারীরিক পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়ে যায়। তারা সরকারি নৌ-অ্যাম্বুলেন্সের কথা শুনেছেন, কিন্তু বাস্তবিকপক্ষে এর সেবা তারা কখনো পাননি।

তাহিরপুর উপজেলার টেকেরঘাট এলাকার বাসিন্দা আব্দুল মালেক বলেন, “বর্ষাকালে যে কোনও রোগী গুরুতর অসুস্থ হলে ভাড়ায় নৌকা ছাড়া আমাদের আর কোনো উপায় থাকে না। সরকারী নৌ-অ্যাম্বুলেন্সের সম্পর্কে অনেক শুনেছি, কিন্তু কোনদিন চলতে দেখিনি। যদি এগুলো চালু থাকত, তাহলে হাওরের মানুষের জন্য অনেক সুবিধা হতো।”

শাল্লা উপজেলার বাহারা ইউনিয়নের বাসিন্দা রাশেদা বেগম বলেন, “রাত কিংবা ঝড়-বৃষ্টির সময়ে রোগী নিয়ে হাসপাতালে যেতে খুবই কষ্ট হয়। ছোট নৌকায় যেতে গিয়ে অনেক সময় রোগীর অবস্থার অবনতি ঘটে। সরকারি নৌ-অ্যাম্বুলেন্স কার্যকর থাকলে অন্তত নিরাপদে হাসপাতালে নেওয়া সম্ভব হত।”

এ বিষয়ে সুনামগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. মো. জসিম উদ্দিন শরিফী বলেন, “নৌ-অ্যাম্বুলেন্সগুলো অনেক দিন পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকায় আগেই অকেজো হয়ে গেছে। এখন এগুলো পুনরুদ্ধার করা সম্ভব নয়। নতুন নৌ-অ্যাম্বুলেন্সের জন্য আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে চাহিদা পাঠাব।”

হাওর অঞ্চলের জনগণের প্রশ্ন, কোটি কোটি টাকার সরকারি প্রকল্প যদি মানুষের প্রয়োজনের সময় কাজে না লাগে, তবে সেই বিনিয়োগের দায় কে নেবেন? বর্ষার সময় যখন প্রতিটি মুহূর্ত জীবন-মৃত্যুর সংগ্রাম, তখন কার্যক্ষম নৌ-অ্যাম্বুলেন্স চালুর প্রয়োজনীয়তা স্থানীয় মানুষের মতে অত্যাবশ্যক।