রহমত আরিফ, ঠাকুরগাঁও সংবাদদাতা:
প্রবল গরমে পুরো শরীর হয়ে গেছে নাজেহাল। তৃষ্ণায় মুখ শুকিয়ে গেছে। মাথার উপরে উজ্জ্বল সূর্য, দীর্ঘ পথে হাঁটার ক্লান্তি এবং অনিশ্চয়তা নিয়ে একটি যুবক চলছেন। কাঁধে একটি ব্যাগ, মাথায় হেলমেট, সাথে একটি সাইকেল, বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা আর হৃদয়ে ভরা স্বপ্ন। এই দুই চাকার বাহনে চড়ে সে যাবতীয় জেলা ও উপজেলা ভ্রমণে বেরিয়েছে। তার নাম মোবাশ্বের আলী।
দেশ সম্পর্কে জানার, মানুষের কাহিনী শোনার এবং বাংলাদেশের সৌন্দর্যকে অঙ্গীকারবদ্ধ ভাবে উপভোগ করার তীব্র ইচ্ছা থেকেই মোবাশ্বের আলীর এই বিশেষ যাত্রা শুরু হয়েছে। এই বছরের ৩০ এপ্রিল, তিনি তার জন্মস্থান রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার রামনাথপুর ইউনিয়নের বড় রাজারামপুর ग्राम থেকে সাইকেলে যাত্রা শুরু করেন। তার লক্ষ্য হলো ধীরে ধীরে পুরো বাংলাদেশ ভ্রমণ করা। যাত্রার প্রথমে তিনি পঞ্চগড় জেলার বিভিন্ন উপজেলা ঘুরে দেখেন। এরপর ঠাকুরগাঁওতে পৌঁছান। বর্তমানে তার ভ্রমণের ৩৯তম দিন চলছে। এ পর্যন্ত তিনি দুই জেলার ৮টি উপজেলায় ভ্রমণ করেছেন। প্রতিদিন তিনি গড়ে ১০০ থেকে ১৫০ কিলোমিটার সাইকেল চালিয়ে নতুন গন্তব্যে পৌঁছাচ্ছেন।
মোবাশ্বের আলী রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার রামনাথপুর ইউনিয়নের বড় রাজারামপুর গ্রামের কৃষক রুহুল আমিন এবং মর্জিনা বেগম দম্পতির প্রবর সন্তান। তিন ভাই-বোনের মধ্যে তিনি সর্বকনিষ্ঠ। তিনি রংপুরের কারমাইকেল কলেজের ইংরেজি বিভাগের সাবেক ছাত্র।
সাধারণ কৃষক পরিবারের সন্তান হলেও তার স্বপ্ন সাধারণ নয়। ছোটবেলা থেকেই ভ্রমণের প্রতি তার আগ্রহ প্রবল ছিল। সেই আগ্রহটিই এক সময় বড় স্বপ্নে পরিণত হয়েছে। এই স্বপ্নের পথে সে বর্তমানে সাইকেল চালিয়ে দেশের কোণাগুলো আবিষ্কার করছে। তার চূড়ান্ত লক্ষ্য আরো বড়, একদিন সাইকেল নাকি অন্য কোনো বাহনে বিশ্বজয়ের জন্য বের হওয়া।
প্রচন্ড রোদ, ঝড়-বৃষ্টি, ক্লান্তি কিংবা দীর্ঘ যাত্রা কোনটিই তাকে থামাতে পারেনি। সাইকেলের প্যাডেলে পায়ে চাপ দিয়ে স্বপ্নের পেছনে ছুটতে থাকা এই তরুণ যেন দেখিয়ে দিচ্ছে- ইচ্ছাশক্তি ও সাহস থাকলে সীমিত দ্রব্যও বড় স্বপ্ন আগ্রাসনে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না।
ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার অধিবাসী আব্দুল করিম, রাজ্জাক, রুবেল ও আরিফ বলেন, এই তরুণের সাথে কথা বলে ভালো লাগছে। বর্তমান সময়ে অনেক যুবকই মোবাইল ও সামাজিক মাধ্যম নিয়ে ব্যস্ত থাকে, কিন্তু মোবাশ্বের দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা ঘুরে মানুষ এবং প্রকৃতিকে কাছ থেকে দেখার চেষ্টা করছে। এ বয়সে এমন চিন্তা-ভাবনার সাহস সত্যিই প্রশংসিত হওয়া উচিত। তার স্বপ্ন ও লক্ষ্য শুনে আমাদের মুগ্ধতা বেড়েছে।
তারা আরো বলেন, সে শুধুই তার শখ মেটাতে ঘুরছে না, বরং পরিবেশ রক্ষার ব্যাপারে সচেতনতা তৈরির চেষ্টা করছে। গাছ লাগানো, প্রকৃতির সংরক্ষণ ও পরিবেশ রক্ষার যে বার্তা সে মানুষের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে, তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পথচলতে তার মতো তরুণদের সেখানে সহযোগিতা করা উচিত। আমরা মনে করি, দেশের তরুণ সমাজ যদি তার মতো ইতিবাচক চিন্তা ও উদ্যোগ গ্রহণ করে, তাহলে সমাজ ও দেশের অনেক কল্যাণ হবে। আমরা তার যাত্রায় সফলতা কামনা করছি এবং আশা করি, সে নিরাপদে পুরো বাংলাদেশ ঘুরে তার স্বপ্ন পূরণ করতে সক্ষম হবে।
মোবাশ্বের আলী উল্লেখ করেন, ছোটবেলা থেকে তিনি চান বাংলাদেশকে ধীরেধীরে ও নিকটবর্তী থেকে জানার। বাংলাদেশে এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে যাওয়ার উদ্দেশ্যে তিনি একমাত্র দেশের প্রকৃতিকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণের জন্য যাত্রা করেছেন। তার এই যাত্রা শুরু হয়েছে রংপুরের পীরগঞ্জ থেকে চলতি বছরের ৩০ এপ্রিল। এটি কেবল সাইকেল ভ্রমণ নয়, বরং শিক্ষার্থীদের এবং দেশের জনগণের প্রতি তার একটি বার্তা রয়েছে। সেই বার্তা হলো, প্রকৃতি রক্ষা করলে আমরা রক্ষা পাব। দেশের শিক্ষার্থীরা এবং সব মানুষের মধ্যে তিনি একটি জনসচেতনতা তৈরি করার চেষ্টা করছেন, যাতে সবাই গাছ লাগায় এবং পরিবেশ রক্ষা করে।
তিনি জানান, এই দীর্ঘ সফরের খরচের ব্যবস্থা করেছেন মূলত নিজের টিউশনি দিয়ে অর্জিত টাকা দিয়ে। পরিবারের পক্ষ থেকেও তাকে সহযোগিতা করা হচ্ছে। তবে যাত্রার পথে দেশের বিভিন্ন এলাকার মানুষের আন্তরিকতা ও ভালবাসায় তিনি বিস্মিত হয়েছেন। অনেকেই তাকে খাবার দেন, কেউ বিশ্রামের জায়গা নিশ্চিত করেন, আবার কেউ প্রয়োজনীয় সাহায্য নিয়ে তার পাশে দাঁড়ান। সাধারণ মানুষের এই ভালোবাসা তাকে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি দিয়ে থাকে।
ঠাকুরগাঁওয়ের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) মোহাম্মদ খোদাদাদ হোসেন বলেন, মোবাশ্বের আলীর এই পদক্ষেপ প্রশংসনীয়। একজন যুব ছাত্র হিসেবে তিনি সাইকেল চালিয়ে দেশের প্রকৃতি, সংস্কৃতি এবং মানুষের জীবনধারা সম্পর্কে জানার চেষ্টা করছেন। একই সাথে, পরিবেশ সংরক্ষণ ও গাছ লাগানোর মতো গুরুত্বপূর্ণ বার্তাও তিনি মানুষদের কাছে তুলে ধরছেন।
তিনি আরও বলেন, কিন্তু দীর্ঘ ভ্রমণের ক্ষেত্রে নিরাপত্তার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা তাকে সড়ক আইন পালন করার, প্রয়োজনীয় নিরাপত্তামূলক সরঞ্জাম ব্যবহারের এবং পথে সচেতন থাকার পরামর্শ দিয়েছি। তার এই অসাধারণ উদ্যোগ সাফল্যের দিকে নিয়ে যাক এবং তিনি নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছানোর মতো আমাদের প্রত্যাশা।

