প্রিন্ট এর তারিখ: অক্টোবর ১৭, ২০২৬, ৪:৫৬ পি.এম. || প্রকাশের তারিখ: আগস্ট ২১, ২০২৬, ১২:৩০ এ.এম.

ধামইরহাটে নারী হত্যার রহস্য উদঘাটন, ১২ ঘণ্টায় গ্রেপ্তার ২

আব্দুল আজিজ নওগাঁ প্রতিনিধিঃ

নওগাঁ জেলার ধামইরহাট থানার খেলনা গ্রামে জনৈক মেরিনা বেগম (৪৫) কে নৃশংসভাবে হত্যা করে মরদেহ আগুনে পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায়, মামলা হওয়ার ১২ ঘন্টার মধ্যে হত্যাকাণ্ডে জড়িত ০২ জন আসামী গ্রেফতার এবং হত্যাকান্ডে ব্যবহৃত আলামত উদ্ধার করা হয়।

১৮ আগস্ট সন্ধ্যা আনুমানিক ০৭. ০০ ঘটিকার সময় পুলিশ সুপার গোয়েন্দা তথ্যের মাধ্যমে এবং পরবর্তীতে ওসি ধামইরহাট থানার মাধ্যমে জানতে পারেন যে, ধামইরহাট থানার ২নং আগ্রাদ্বিগুন ইউপির তালপুকুর মাহমুদপুর (ভালকাডাঙ্গা) গ্রামে একটি আগুনে পোড়া অজ্ঞাত মহিলা লাশ পাওয়া গেছে। সংবাদ পাওয়ার পর পুলিশ সুপার দ্রুত অফিসার ইনচার্জ ধামইরহাট থানায় এবং পত্নীতলা সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপারকে দ্রুত ঘটনাস্থলে যাওয়ার নির্দেশ দেন এবং পুলিশ সুপার নিজে বিষয়টি নজর রাখেন। উল্লেখ্য, একই সময় একজন ব্যক্তি কাউসার আলী তার মায়ের নিখোঁজ সংবাদ এর জন্য থানায় আসেন।

প্রচন্ড বৃষ্টির মধ্যে থানা পুলিশের টিম ২৫ কিলোমিটার দূরে ঘটনাস্থলে পৌঁছায় এবং সেখানে গিয়ে দেখে একজন মধ্যবয়সী মহিলার আগুনে পোড়া মৃতদেহ, তার পাশে কিছু প্রসাধনী এবং পরিচয়পত্র রয়েছে। এ হত্যাকাণ্ডটি একটি ক্লুলেস হত্যা মামলা। অতঃপর থানায় ডায়েরি করতে আসা কাউসার আলী ঘটনাস্থলে এসে মায়ের অজ্ঞাত পরিচয় লাশটি সনাক্ত করেন, যিনি ৩-৪ দিন আগে বাসা থেকে বের হয়ে গিয়েছিলেন। তাৎক্ষণিক সিআইডি ও পিবিআই টিমকে জানানো হয়।

পুলিশ এরপর পুরো বিষয়টি গভীরভাবে তদন্ত শুরু করে। তথ্য প্রযুক্তি, স্থানীয় তদন্ত এবং ডাটা বিশ্লেষণ করে পুলিশ কয়েকজনকে সন্দেহ করে। মধ্যরাতের পরে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জনাব শরীফ এবং অফিসার ইনচার্জ মিন্টুর নেতৃত্বে অভিযানে বের হন। প্রচন্ড বৃষ্টির কারণে অভিযানে কিছু বিঘ্ন ঘটলেও টানা ছয়-সাত ঘণ্টা অভিযান চালানোর পর প্রথমে স্থানীয় সাবেক মেম্বার ১। মোঃ বাবুল হোসেন (৪৯), পিতা : সামসুদ্দীন, মাতা : সজিমন, সাং-মড়লই, থানাঃ ধামইরহাট, জেলার নওগাঁকে গ্রেফতার করা হয় এবং তার তথ্যের ভিত্তিতে পরে ২। মোঃ তারেক রহমান (২১), পিতা : মোঃ মোজাম্মেল হক, মাতা : তহমিনা, সাং-মড়লই, থানাঃ ধামইরহাট, জেলার নওগাঁকে গ্রেফতার করা হয়।

পরে বিশেষ টিম তাদের দুজনকে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করে হত্যাকাণ্ডে তারা দুজনের জড়িত থাকার বিষয়টি স্বীকার করে। তাদের তথ্যমতে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত আলামত একটি বেল্ট এবং হত্যার পর ভিকটিমের অন্যান্য স্থানে ফেলে দেওয়া জুতার ব্যাগও উদ্ধার করা হয়। বর্ণিত আসামীদ্বয় ছাড়াও আরও ০২ জন আসামী এই হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত। এই চারজন মিলে পরিকল্পিতভাবে মেরিনা বেগমকে হত্যা করে এবং তার লাশের পরিচয় নষ্ট করার জন্য পেট্রোল দিয়ে পোড়ানো হয়।

প্রাথমিকভাবে তদন্তে জানা যায় যে, মামলার বাদী মেরিনা বেগমের ছেলে মোঃ কাউসার আলী এবং ভিকটিমের স্বামী মোঃ হাছেন আলী (৫৫) জীবিকার প্রয়োজনে কুমিল্লায় রয়েছেন। গত ইং ১৪/০৮/২০২৬ তারিখে দুপুর অনুমান ১১. ৩০ ঘটিকার সময় বাদীর মা মেরিনা বেগম (৪৫) গরুর জন্য ঘাস কাটার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হন। পরে তিনি আর ফিরে না আসায় বাদী তার স্ত্রীর মাধ্যমে বিষয়টি জানেন ও দ্রুত কাজের স্থান কুমিল্লা থেকে নিজ বাড়িতে চলে আসেন।
প্রাথমিক তদন্তে পাওয়া যায় যে গ্রেপ্তার হওয়া আসামী মোঃ বাবুল হোসেনের সঙ্গে ডিসিষ্ট মেরিনা বেগমের সম্পর্ক ছিল। মেরিনা এবং গ্রেপ্তার আসামী মোঃ বাবুল হোসেনের মোবাইল নম্বর আদান-প্রদান হয়। তাঁদের মধ্যে মাঝে মধ্যে মোবাইল ফোনে বিভিন্ন বিষয়ে কথোপকথন হয় এবং এক সময়ে তাঁদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক তৈরি হয়। তাঁদের সম্পর্ক আরও গভীর হলে ডিসিষ্ট মেরিনা বেগম আসামী মোঃ বাবুল হোসেনকে বিয়ের জন্য চাপ দেয়। আসামী মোঃ বাবুল হোসেন তাঁকে জানান যে, বিয়েতে রাজি না হলে, প্রয়োজনে সে তাঁর বাড়িতে যাবে অথবা আত্মহত্যা করবে বলে ডিসিষ্ট মেরিনা বেগমকে সতর্ক করে। ডিসিষ্টের এমন কথায়, আসামী মোঃ বাবুল হোসেন ডিসিষ্টকে জানায় যে, আগামী রবিবার ইং ১৬/০৮/২০২৬ তারিখে তাঁরা বিয়ের পরিকল্পনা করেছে।

সেই মোতাবেক ডিসিষ্ট ইং ১৬/০৮/২০২৬ তারিখ দুপুরে বাড়ি থেকে বের হয়ে যায়। পরবর্তীতে আসামী মোঃ বাবুল হোসেন অপর আসামী মোঃ তারেক রহমানসহ আরও ০২ জনকে ডিসিষ্ট মেরিনা বেগমকে আনতে ৬নং জাহানপুর ইউপির সাহাপুরে পাঠায়। গ্রেপ্তার আসামী তারেকসহ অপর ০২ জন সাহাপুর বাজার থেকে ডিসিষ্ট মেরিনাকে আগ্রাদ্বিগুন বাজারে রাত অনুমান ১০:০০ ঘটিকার সময় নিয়ে আসে। সেখানে আসামী মোঃ বাবুল হোসেন মোটরসাইকেল নিয়ে আগ্রাদ্বিগুন বাজারে এসে জনৈক মোঃ নুরুজ্জামান এর তেলের দোকান থেকে ০৩ (তিন) লিটার পেট্রোল ক্রয় করে। ০২ লিটার পেট্রোল গাড়িতে ওঠায় এবং বাকি ০১ লিটার পেট্রোল ০১ লিটার বোতলে রেখে একটি বাজারের ব্যাগে রাখে।

আসামী মোঃ বাবুল হোসেন সহ অন্য আসামীরা আগ্রাদ্বিগুন বাজার থেকে একত্রিত হয়ে ডিসিষ্ট মেরিনা বেগমকে নিয়ে ঘটনাস্থলের সংলগ্ন মনিহারী টু তালপুকুর গামী পাকা রাস্তার মাঝে দাঁড়ায় এবং মোটরসাইকেল ও অটোরিকশা রাস্তা থেকে ৩০০ ফুট দক্ষিণে ধামইরহাট থানাধীন ২নং আগ্রাদ্বিগুন ইউপির তালপুকুর মাহমুদপুর গ্রামস্থ (ভালকাডাঙ্গা) জনৈক মোসাঃ জাহানারার বাড়ির ভিতরে নিয়ে যায়। সেখানে গিয়ে আসামীরা একত্রিত হয়ে আসামী মোঃ তারেক রহমানের কোমরে থাকা বেল্ট খুলে ডিসিষ্টের গলায় অন্য ০২ জন আসামী চাপ দেয়।

মৃত্যু নিশ্চিত করে আসামী মোঃ বাবুল হোসেন আলামত ধ্বংস করার লক্ষ্য ডিসিষ্টের শরীরে পেট্রোল ঢেলে আগুন লাগিয়ে দেয়। ফলে আগুনে তাঁর শরীরের উপরের অংশ পুড়ে যায়। ঘটনার স্থলে থাকা ভিকটিমের দুটি ব্যাগ আসামী মোঃ বাবুল হোসেন নিয়ে পাকা রাস্তায় যায়। সেখানে যাওয়ার পর আসামী মোঃ বাবুল হোসেন জুতার ব্যাগটি আমবাগানের ভিতরে ছুড়ে ফেলে। পরে আসামীরা একত্রে আসামী মোঃ বাবুল হোসেনের বাড়িতে যায়, ভিকটিম মেরিনার কাছ থেকে নেওয়া কিছু টাকা নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নেবে। প্রধান আসামী মেম্বার বাবুল ছাড়া প্রত্যেকে আড়াই হাজার টাকা করে পায়। পরে তাঁরা নিজ নিজ বাড়িতে চলে যায়।

এ বিষয়ে পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম বলেন যে য Brutal এই হত্যাকান্ড এবং লাশ আগুনে পোড়া ক্লুলেস এই মামলার রহস্য পুলিশ ২৪ ঘন্টায় উদঘাটন করতে পেরেছে এবং হত্যাকারী দুইজনকে গ্রেপ্তার করেছে। নওগাঁ জেলা পুলিশ নওগাঁ জেলায় যে কোনো ধরনের অপরাধ আইন অনুসারে কঠোরভাবে দমন করবে এবং সাথে সাথে অপরাধ প্রতিরোধে জেলা পুলিশ সর্বাত্মকভাবে কাজ করে যাচ্ছে।