বগুড়ার শেরপুর উপজেলায় সাম্প্রতিক সময়ে দ্রুত বিকাশ ঘটছে লেকার ফার্নিচার শিল্পের। স্থানীয় বেকারত্ব দূরীকরণ ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার করে এটি এখন এলাকার অন্যতম উদীয়মান শিল্প খাত হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। তবে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়াই আবাসিক এলাকায় অপরিকল্পিতভাবে এসব কারখানা গড়ে ওঠায় চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েছেন শ্রমিকসহ স্থানীয় বাসিন্দারা।
অনুসন্ধানে জানা যায়, উপজেলার কুসুম্বী ইউনিয়নের বাগড়া , দীঘির পাড়, গাড়িদহ ইউনিয়নের হাপুনিয়া ও বনমরিচা, মহিপুর কলোনী, এবং শাহবন্দেগী ইউনিয়নের পার্ক ও কানাইকান্দর হাই স্কুল রোড ও তৎসংলগ্ন এলাকায় এ শিল্পের ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। এই অঞ্চলগুলোতে বর্তমানে প্রায় ১০০ থেকে ১২০টি ছোট-বড় লেকার ফার্নিচার কারখানা গড়ে উঠেছে।
এসব কারখানায় মূলত এমডিএস (MDS) ও সিএসি (CAC) রাসায়নিক উপাদান ভিত্তিক আধুনিক লেকার ফার্নিচার প্রস্তুত করা হচ্ছে। কাঠ প্রসেসিং, স্যান্ডিং, এমডিএস সিলার প্রয়োগ ও সিএসি স্প্রে ফিনিশিং—এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় প্রতিদিন যুক্ত থাকেন শত শত শ্রমিক।

লেকার ফার্নিচার মালিক সমিতির সভাপতি জনাব আলিম জানান, “বর্তমানে একেকটি কারখানায় গড়ে ২০ থেকে ২৫ জন শ্রমিক কাজ করছেন। এখানকার তৈরি গুণগত মানসম্পন্ন লেকার ফার্নিচার স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে এখন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সরবরাহ করা হচ্ছে। বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে এই শিল্প বড় ভূমিকা রাখছে।”
এদিকে, এই ফার্নিচার শিল্পকে কেন্দ্র করে এলাকাটিতে গড়ে উঠেছে বেশ কিছু কেমিক্যালের দোকান ও গোডাউন।সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় গড়ে ওঠা এসব কেমিক্যাল দোকান ও গোডাউনে ন্যূনতম পরিবেশগত ছাড়পত্র কিংবা ফায়ার সেফটি ব্যবস্থা ছাড়াই চরম ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে দাহ্য রাসায়নিক ক্রয়-বিক্রয় ও মজুত চলছে।
কারখানা ও কেমিক্যাল গোডাউনগুলোর এই অপরিকল্পিত বিস্তারে এলাকার পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। অধিকাংশ কারখানাতেই নেই কোনো আধুনিক কেমিক্যাল ফিল্টার কিংবা ডাস্ট-ফ্রি স্প্রে বুথ। স্প্রে করার সময় বাতাসের সঙ্গে মিশে যাওয়া বিষাক্ত থিনার, কেমিক্যালের তীব্র গন্ধ এবং কাঠের সূক্ষ্ম গুঁড়া চারপাশে ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে পার্শ্ববর্তী বাসাবাড়ির কোমলমতি শিশু ও বয়োবৃদ্ধরা প্রতিনিয়ত শ্বাসকষ্ট, অ্যাজমা, অ্যালার্জি এবং ফুসফুসের নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন।
| বগুড়ার শেরপুরে কলেজছাত্রী অপহরণের অভিযোগ, একজন কারাগারে |
একই সাথে চরম সুরক্ষাহীনতায় কাজ করছেন কারখানার শ্রমিকরা। সেফটি মাস্ক, গ্লাভস কিংবা প্রটেক্টিভ গিয়ার ছাড়াই খোলা পরিবেশে কাজ করায় দীর্ঘমেয়াদে কেমিক্যালের সংস্পর্শে থেকে তারা চর্মরোগ ও চোখের সমস্যায় ভুগছেন।
সার্বিক বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে শেরপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) জনাব সাইদুজ্জামান হিমু বলেন, “অনুমোদনহীন ও অপরিকল্পিত কেমিক্যাল ব্যবহার এবং পরিবেশ দূষণের বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। মাঠ পর্যায়ে দ্রুত সরেজমিনে খোঁজখবর নিয়ে জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ রক্ষায় প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, দ্রুত প্রশাসনিক তদারকি ও তদারকির মাধ্যমে দাহ্য কেমিক্যাল গোডাউনগুলো নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি কারখানাগুলোকে পরিবেশবান্ধব উপায়ে পরিচালনায় বাধ্য করা গেলে শিল্পটির বিকাশের পাশাপাশি রক্ষা পাবে জনস্বাস্থ্য।