খন্দকার আলী আবীর, নড়াইল:
নতুনকালের আবহে অনেক পুরোনো পেশা হারিয়ে যাচ্ছে। তবে নড়াইলের বানিজ্যিক স্থান রুপগন্জ মুচিপোলে এমন একটি শিল্প এখনো জীবিত, যা বহুগুণ ধরে রাখছে সংস্কৃতির সুর। এখানে কথা বলছি ঢোল, তবলা, হারমোনিয়ামের মেরামতকারীদের সম্পর্কে।
ছবির মধ্যে যিনি রয়েছেন, তিনি একজন দক্ষ কারিগর – বয়সের কষ্ট সয়লেও, তার স্পর্শে মৃতপ্রায় বাদ্যযন্ত্র প্রাণ ফিরে পায়।
স্থানীয়দের তথ্য অনুসারে, এই কারিগর ব্রিটিশ শাসনকাল থেকে পেশার সাথে যুক্ত।
তার পিতা এবং দাদা উল্লেখযোগ্য বাদ্যযন্ত্র মিস্ত্রি ছিলেন। নড়াইল শহরের ঐতিহ্যবাহী এই দোকানটিতে তিন প্রজন্ম ধরে ঢোলের চামড়া পরিবর্তন, তবলার পাগড়ি বাঁধা এবং হারমোনিয়ামের রিড মেরামতের কাজ হয়ে আসছে। দেয়ালে ঝোলানো সাদাকালো ছবিটি তার পূর্বপুরুষের, যিনি এই কাজের সূচনা করেছিলেন।
ছবিতে তাকে খালি গায়ে লুঙ্গি পরে বসে থাকতে দেখা যাচ্ছে। সামনে বিশাল ঢোলের কাঠামো রয়েছে। হাতে সুই-সুতা এবং বাঁশের বাতা দিয়ে তিনি যত্নসহকারে ঢোলের চামড়া টানটান করছেন। পেছনে সারিবদ্ধভাবে রয়েছে তবলা, ডুগি এবং মাটির খোল। প্রতিটি বাদ্যযন্ত্রের বৈশিষ্ট্য তার মুখস্থ।
তিনি জানান: আগে গানের দলে, যাত্রাপালা, পূজা-পার্বণে কাজের কোনো শেষ থাকত না। সারারাত ধরে ঢোল বাঁধতে হতো। এখন তো ডিজিটাল যন্ত্র বাজছে, লোকজন আর বাজাচ্ছে না। তারপরও শখের কারণে দু-একজন আসে। এটি আমার বাপ-দাদার পেশা, আমি ছাড়তে চাই না। আগে যেভাবে ভালো চামড়া, কাঠ, রিড পাওয়া যেত, এখন তা আর পাওয়া যায় না। দামও বেড়ে গেছে চার থেকে পাঁচ গুণ।
নতুন কারিগরের অভাব: কাজটি কঠিন, আয়ও কম। ছেলে-মেয়েরা এই পেশায় আসতে আগ্রহী নয়। তার নিজ কন্যা-পুত্ররাও এই পেশায় আসেনি।
চাহিদা কমেছে: বৈদ্যুতিন প্যাড এবং কিবোর্ডের যুগে প্রকৃত ঢোল-তবলার চাহিদা হ্রাস পাচ্ছে। শুধুমাত্র কিছু সংগীত বিদ্যালয় এবং গ্রামাঞ্চলের পুরনো ওস্তাদরা যন্ত্র মেরামতের জন্য আসেন।
এখনো নড়াইলের সুলতান মঞ্চ এবং এসএম সুলতান শিশু স্বর্গের নানা আয়োজনে তার তৈরি ঢোলের ধ্বনি শোনা যায়। লোকশিল্পী, বাউল এবং কীর্তনীয়া দলের কাছে তিনিই স্থায়ী বিশ্বাস। “যন্ত্রটি মেশিনের সুরে প্রাণহীন, হাতের তৈরি যন্ত্রের যে অনুভূতি, তা আর কোথায় পাবেন?” – দুঃখ প্রকাশ করেন একজন স্থানীয় বাউল নজরুল বয়াতী।
এই ইট-কাঠের শহরের মধ্যে এই ছোট্ট ঘরটি যেন একটি জীবন্ত সংগ্রহশালা। শিল্পীর ঘামে ভেজা শরীর এবং কুঁচকানো হাত জানান দেয় সংস্কৃতিকে রক্ষার জন্য একটি নিঃশব্দ সংগ্রামের কাহিনী। সরকারি কিংবা বেসরকারি সহায়তায় এই শিল্প হয়তো আরও কিছুদিন টিকে থাকবে। নইলে ব্রিটিশ আমল থেকে আসা এই সুরের শিল্প একদিন ইতিহাসের পাতায় পরিণত হবে। উল্লেখ্য, তাদের নামেই মুচিপোলের নামকরণ।
সূত্র: মোঃ তানজির হোসেন(সাংবাদিক ও লেখক)