Site icon দৈনিক নবদিগন্ত

ভেসে আসা বনজ ফল-পাতায় উপকূলের জ্বালানি, হুমকিতে সুন্দরবনের প্রাকৃতিক বনায়ন

ভেসে আসা বনজ ফল-পাতায় উপকূলের জ্বালানি, হুমকিতে সুন্দরবনের প্রাকৃতিক বনায়ন

ভেসে আসা বনজ ফল-পাতায় উপকূলের জ্বালানি, হুমকিতে সুন্দরবনের প্রাকৃতিক বনায়ন

মো. আল-মাহফুজ শাওন:

সুন্দরবনের নদী ও বনাঞ্চল থেকে জোয়ার-ভাটা স্রোতে ভেসে আসা শুকনো পাতা, ডালপালা ও ফল সংগ্রহ করে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করছেন উপকূলীয় এলাকার মহিলারা। জ্বালানির অভাব, দারিদ্র্য এবং বিকল্প জ্বালানির উচ্চ খরচের কারণে এসব প্রাকৃতিক উপকরণ তাঁদের দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এভাবে সুন্দরবনের ফল সংগ্রহ করা প্রাকৃতিক বনাঞ্চলকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে এবং দীর্ঘ মেয়াদে পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

উপকূলীয় অঞ্চলে জীবিকার পাশাপাশি জ্বালানি সংগ্রহ করাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে, নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর মহিলারা প্রতিদিন নদী ও খালের তীরে ভেসে আসা শুকনো পাতা, গোলপাতার অংশ, কেওড়া, গেওয়া এবং অন্যান্য গাছের ফল সংগ্রহ করতে বেশ কয়েক ঘণ্টা ব্যয় করেন। এর ফলে পরিবারগুলোর জ্বালানি খরচ কমে যায় এবং ভেসে আসা উপকরণের পুনঃব্যবহার সম্ভব হয়।

সম্প্রতি কয়রা উপজেলার শাকবাড়িয়া নদীরকাছে দেখা গেছে, এক মহিলা কোমর সমান পানিতে নেমে শুকনো পাতা ও ফল সংগ্রহ করছেন। ঝুড়িতে পুরে নেওয়া এসব পাতা ও ফল পরে শুকিয়ে রান্নার কাজে ব্যবহার করা হয়।

স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, জোয়ারের পানির সঙ্গে সুন্দরবনের বিভিন্ন গাছের পাতা, ফল, এবং শুকনো ডাল ভেসে আসে। এই উপাদানগুলো উপকূলের গরিব পরিবারগুলোর জন্য একটি বিনামূল্যের জ্বালানি হিসেবে কাজ করছে।

উত্তর বেদকাশী ইউনিয়নের বাসিন্দা অঞ্জনা মুন্ডা বলেন, “ভেসে আসা ফলগুলোতে যদি শাঁস থাকে, তবে শুকানোর সময় লাগে। তাই আমরা শাঁস বাদ দিয়ে খোলস শুকিয়ে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করি। নিজেদের ব্যবহারের পাশাপাশি কিছু ফল বিক্রিও করি। তবে বনের বাইন গাছের ফল সহজে জ্বলে উঠে না, তাই সেগুলো গবাদিপশুর খাবার হিসেবে ব্যবহার করা হয়।”

স্থানীয় মহিলারা জানাচ্ছেন, অনেক পরিবার অর্থনৈতিক সমস্যার কারণে জ্বালানি কাঠ বা গ্যাস কিনতে পারেন না। তাই তারা নদী ও খালের তীরে ভেসে আসা ফল ও পাতা সংগ্রহ করে সংরক্ষণ করেন। তাঁদের দাবি, প্রতি জোয়ারে একজন মানুষ এক থেকে দেড় মণ ফল সংগ্রহ করতে পারেন।

কাটকাটা গ্রামের একজন মধ্যবয়সী মহিলা সুরভি মণ্ডল বলেন, “সারা বছর এ কাজ চলে। এলাকায় জ্বালানির তীব্র সংকট রয়েছে। তাই আমরা দলবেধে নদীর তীরে ভেসে আসা সুন্দরবনের বিভিন্ন গাছের ফল সংগ্রহ করি। এই ফলগুলোর জ্বালানির পাশাপাশি ছাগলের খাবার হিসেবেও ব্যবহার করা হয়।”

সুন্দরবনের পার্শ্ববর্তী কপোতাক্ষ, শাকবাড়িয়া ও কয়রা নদীর তীরবর্তী এলাকার বাসিন্দা শ্রাবন্তী রানী, সূর্য মুন্ডা এবং নিলিমা রানী জানান, সুন্দরবনের গাছের ফল জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের ফলে প্রাকৃতিক বনাঞ্চল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কিন্তু বিকল্প জ্বালানির অভাবের কারণে তাঁরা বাধ্য হয়ে এসব ফল সংগ্রহ করতে হচ্ছেন।

এ বিষয়ে উত্তর বেদকাশী ইউনিয়নের বাসিন্দা ও ঘুগরাকাটি ফাজিল ডিগ্রি মাদ্রাসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মাওলানা সুজাউদ্দিন বলেন, “সুন্দরবনের বিভিন্ন গাছের পাতা ও ফল নদীর পানিতে ভেসে এসে সাধারণ মানুষের জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু যদি এসব ফল সংরক্ষণ করা সম্ভব হতো, তবে নদীর চরগুলোতে প্রাকৃতিক সবুজ আসলতে গড়ে উঠতে পারত।”

কয়রা উপজেলা বন কর্মকর্তা জহিরুল হক বলেন, “সুন্দরবন থেকে ভেসে আসা ফল জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের ফলে প্রাকৃতিক বনাঞ্চলের ক্ষতি হচ্ছে। সচেতনতার অভাবে মানুষ এসব ফল সংগ্রহ করছে। এ নিয়ে স্থানীয়দেরকে বারবার সতর্ক করা হয়েছে।”
কাশিয়াবাদ ফরেস্ট স্টেশনের কর্মকর্তা নাসির উদ্দিন মন্তব্য করেন, “সুন্দরবনের গাছপালা থেকে পতিত ফলগুলোর একটি সংখ্যা বনেই চারা হিসেবে বৃদ্ধি পায়। কিন্তু বেশিরভাগ ফল জলবদ্ধতার ফলে নদীর তীরে গিয়ে জমা হয়। এই ফলগুলো উপকূলবাসীর জন্য সাময়িক জ্বালানির হিসেবে কাজ করলেও এর পরিবেশগত প্রভাব অত্যাধিক বিপজ্জনক। কারণ, এই ফলগুলো থেকে বিস্তীর্ণ এলাকায় প্রাকৃতিকভাবে নতুন বনায়ন সৃষ্টির সম্ভাবনা ছিল।”

পরিবেশবিদদের মতে, উপকূলীয় এলাকার জন্য বিকল্প জ্বালানী সহজলভ্য করা না গেলে সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল এই তেল সংগ্রহ বন্ধ করার প্রক্রিয়া কঠিন হয়ে যাবে। পাশাপাশি, স্থানীয় মানুষের আয়ের প্রয়োজন এবং পরিবেশ সংরক্ষণের মধ্যে একটি ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে।

Exit mobile version