Site icon দৈনিক নবদিগন্ত

যশোরে ফ্যামিলি কার্ডে ৬২ ধনী নারী, তিন কর্মকর্তা স্ট্যান্ড রিলিজ

যশোরে ফ্যামিলি কার্ডে ৬২ ধনী নারী, তিন কর্মকর্তা স্ট্যান্ড রিলিজ

যশোরে ফ্যামিলি কার্ডে ৬২ ধনী নারী, তিন কর্মকর্তা স্ট্যান্ড রিলিজ

মালিকুজ্জামান কাকা:

দরিদ্র ও নিম্নআয়ের পরিবারের নারীদের জন্য নির্বাচনে প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে সরকার কর্তৃক ফ্যামিলি কার্ড পরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছে। যশোরে ৬২ ধনী পরিবারের মহিলা তালিকাভুক্ত হওয়ায় সমাজসেবা অধিদপ্তরের যাচাই প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে সন্দেহ দেখা দিয়েছে। এ পরিস্থিতিতে, যশোর জেলা সমাজসেবা অফিসের উপপরিচালক হারুন অর রশীদ ও দুই সহকারী পরিচালক সাইফুল ইসলাম এবং ইতি দত্ত সেনকে স্ট্যান্ড রিলিজ করা হয়েছে। তবে স্থানীয়দের বলে, সমাজসেবা প্রতিষ্ঠানকে প্রভাবিত করার জন্য ৩/৪ জন আঞ্চলিক বিএনপির নেতাকে দায়ী করা হচ্ছে, যারা এখনও কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। তারা বর্তমানে ধরা পড়ার বাইরে রয়েছে।

নিয়ম অনুযায়ী, যাদের নিজস্ব জমি, আবাসন নেই, বিধবা, স্বামী পরিত্যক্তা এবং প্রতিবন্ধী সদস্য আছে, তাদের পরিবারের মহিলাদের প্রধান কার্ড পাওয়ার অধিকার থাকা উচিত। কিন্তু যশোর সদর উপজেলার ১০ নং চাঁচড়া ইউনিয়নের ৭ নং ওয়ার্ডে ফ্যামিলি কার্ডের যেই তালিকা তৈরি হয়েছে, তাতে একাধিক বহুতল ভবনের মালিকের স্ত্রীও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। সমাজসেবা অধিদপ্তরের ৫৪ জন সমাজকর্মী যিনি সার্ভে পরিচালনা করে ওই তালিকা তৈরি করেছেন, তাতে ধনী পরিবারের মহিলাদের অন্তর্ভুক্তির ফলে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে জানানো হয়েছে। এছাড়া, দুর্নীতি ও অস্বচ্ছতা প্রমাণিত হলে যশোরের ফ্যামিলি কার্ড তালিকা থেকে ৬২ জন মহিলার কার্ড স্থগিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে মন্ত্রণালয়ের তরফ থেকে।

বিএনপির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ফ্যামিলি কার্ড পাইলট প্রকল্পের আওতায় যশোরের পিছিয়ে পড়া চাঁচড়া ইউনিয়নের ৭ নং ওয়ার্ডে দরিদ্র নারীদের জরিপ করে ২০৪২ জনকে ফ্যামিলি কার্ড প্রদানের ব্যবস্থা নেওয়া হয়। গত ১৬ মে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ শুরু হয়। চাঁচড়ায় দুই হাজারেরও বেশি মহিলা ফ্যামিলি কার্ড পেয়ে স্থানীয় এলাকায় উচ্ছ্বাসের সৃষ্টি করে। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির সেই ফ্যামিলি কার্ড হাতে পেয়ে নারীরা সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। ওই দিন ভাতুড়িয়া স্কুল মাঠে আয়োজিত ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভার্চুয়ালি যুক্ত থেকে সারাদেশের সঙ্গে মিলিত হয়ে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির দ্বিতীয় পর্যায়ের উদ্বোধন করেন।

উদ্বোধনের পরপরই যশোর সদর উপজেলার চাঁচড়া ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের ১৯৮০ জন উপকারভোগী পরিবারের মহিলাদের মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ২৫০০ টাকা করে অর্থ সহায়তা প্রদান করা হয়। এক্ষেত্রে ৬২ জন নারীর অর্থ স্থগিত করা হয়।

তথ্য পাওয়া গেছে, ফ্যামিলি কার্ড বিতরণের কিছু দিন আগে অভিযোগ ওঠে যে, তালিকায় অন্তর্ভুক্ত ২০৪২ জনের মধ্যে ৬২ জন ধনী পরিবারের মহিলা রয়েছেন। অনেকের কাছে বহুতল আবাসন রয়েছে এবং একজনের স্বামী পাঁচতলা ভবনের মালিক। দরিদ্র, ভূমিহীন অথবা কোন শর্ত পূরণ না করার কারণে তাদের ফ্যামিলি কার্ড মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে স্থগিত করা হয়েছে। এমনকি নির্বাচন প্রক্রিয়ার অস্বচ্ছতা এবং সমাজসেবা কর্মকর্তাদের নজরদারিতে অবহেলা প্রমাণিত হলে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় দ্রুত ব্যবস্থা নিয়েছে।

যশোরের সমাজসেবা অধিদপ্তরের পরিচালক হারুন অর রশীদ, সহকারী পরিচালক সাইফুল ইসলাম ও সহকারী পরিচালক ইতি দত্ত সেনকে স্ট্যান্ড রিলিজ করা হয়েছে। রাষ্ট্রপতির আদেশ অনুযায়ী সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক শাখার উপসচিব রবিউল ইসলাম স্ট্যান্ড রিলিজের আদেশ জারি করেছেন। এর মধ্যে উপপরিচালক হারুন অর রশীদকে জয়পুরহাট, সহকারী পরিচালক সাইফুল ইসলামকে পাবনায় এবং ইতি দত্ত সেনকে গোপালগঞ্জে স্ট্যান্ড রিলিজ করা হয়েছে। আদেশে জনস্বার্থে স্ট্যান্ড রিলিজের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে স্ট্যান্ড রিলিজ হওয়া উপপরিচালক হারুন অর রশীদ জানিয়েছেন, ২০৪২টি পরিবারের কার্ডের একটি তালিকা তৈরি করা হয়েছিল। ইউনিয়ন সমাজ কর্মীরা স্বচ্ছতার সঙ্গে কাজ করার চেষ্টা চালিয়ে গেছে। এর মধ্যে ৬২ জন নারীর বিষয়টি প্রশ্ন সৃষ্টি করেছে। বহুতল ভবন মালিকের স্ত্রীর নামও তালিকায় উঠে এসেছে। মোট ৬২ উঠতি পরিবারের নারীরা তালিকায় থাকার কারণে তিনি মন্ত্রণালয়ে চিঠি প্রেরণ করেছেন, যাতে তা স্থগিত করা হয়।

তিনি প্রকৃতপক্ষে ওই পরিবারের কার্ড নারী জরিপের সঙ্গে জড়িত নন। সরকারি নির্দেশনায় তিনিসহ আরও দুই সহকারী পরিচালক স্ট্যান্ড রিলিজ হয়েছেন। তবে সমাজসেবা কর্তাদের প্রভাবিত করা এলাকার অন্তত ৩/৪ জন বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে স্থানীয় ক্ষতিগ্রস্তরা অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।

ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি নুরুজ্জামান বাবলা, সাধারণ সম্পাদক আব্দুস সামাদ টগর, থানা বিএনপি নেতা ওয়াহিদ সেকেন্দার লুলু, চাঁচড়া ইউনিয়ন মহিলা দলের সভাপতি সাহানা বেগম, এবং থানা যুবদলের সদস্য শাওন কবির, এই সরকারি কর্তাদের প্রভাবিত করে গরীব নারীদের পরিবর্তে ধনী নারীদের পরিবারের কার্ড বরাদ্দে ভূমিকা রাখার অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।

এই বিষয়ে উপজেলা সমাজ সেবা কর্মকর্তা আশিকুজ্জামান তুহিন জানিয়েছেন, যশোরে পরিবার কার্ডের পাইলট প্রকল্পটি জেলা অফিসের তত্ত্বাবধানে রয়েছে। জেলা কার্যালয় থেকে মন্ত্রণালয়ে তালিকা পাঠানো হয়েছে। অতএব, ধনীদের তালিকায় থাকা ৬২ জন নারীর পরিবারের কার্ড স্থগিত করা হয়েছে বলে তিনি জানতে পেরেছেন। এই বিষয়ে উপজেলা সমাজসেবা অফিসের কোনও সংশ্লিষ্টতা নেই।

Exit mobile version