Site icon দৈনিক নবদিগন্ত

সুন্দরবনে দস্যু আতঙ্কে ২২ জেলে অপহরণ, উপকূলে উদ্বেগ

সুন্দরবনে দস্যু আতঙ্কে ২২ জেলে অপহরণ, উপকূলে উদ্বেগ

মো: আল-মাহফুজ শাওন:

আজ সুন্দরবনের মানুষদের মনে গভীর দুঃখ বিরাজ করছে নিরীহ সাধারণের আর্তনাদে। যারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নদীতে নামেন পরিবারের জন্য খাবার যোগাতে ,  তারাই বর্তমানে দস্যুদের বশবর্তী হয়ে রয়েছে।

সম্প্রতি সুন্দরবনের নদী ও খালের অঞ্চলে ২২ জন জেলের অপহরণ ঘটায় পুরো উপকূলজনিত অঞ্চলে আতঙ্ক, ক্ষোভ ও অনিশ্চয়তার ছায়া নেমে এসেছে।

অপহৃত জেলেদের পরিবারের মধ্যে এখন শিক্ষামূলক উদ্বেগের পরিবেশ বিরাজ করছে। অনেক পরিবারের রান্নাঘরে আগুন জ্বলছে না দিনের পর দিন। সন্তানদের ঘুম নেই, মায়েদের বুকফাটা কান্নায় এলাকা ভারী হয়ে উঠেছে। উপকূলের মানুষেরা জানতে চাইছেন—একটি স্বাধীন দেশে শ্রমজীবী মানুষের জীবনে নিরাপত্তা নেই কেন?

২০১৮ সালে সরকারিভাবে সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত বলে ঘোষণা করা হয়েছিল। সেই সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়মিত অভিযানে অনেক দস্যু আত্মসমর্পণ করে এবং বনাঞ্চলে শান্তি ফিরে আসে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সেই স্বস্তি যেন আবারও ভেঙে পড়ছে।

বিশেষ করে ২০২৪ সালের আগস্ট মাসের পর থেকে সুন্দরবনের বিভিন্ন স্থানে নতুন এবং পুরনো দস্যু বাহিনীর কার্যক্রম বেড়ে যাওয়ার তথ্য রয়েছে। স্থানীয় সূত্রে জানা যাচ্ছে, বর্তমানে সুন্দরবনে আনুমানিক ১৬টি দস্যু বাহিনী সক্রিয় রয়েছে। এর মধ্যে করিম-শরীফ বাহিনী, নানা ভাই বাহিনী, ছোট জাহাঙ্গীর বাহিনী, ছোট সুমন বাহিনী, আলিফ বাহিনী, বুড়ো জাহাঙ্গীর বাহিনী, সবুজ-জাহাঙ্গীর বাহিনী, আল-আমীন বাহিনী, দুলাভাই বাহিনী, জনাব বাহিনী এবং আসाबুর গ্রুপের নাম সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে।

দস্যুরা গহিন বনাঞ্চল ও নদী পথকে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে ব্যবহার করছে। সুযোগ বুঝে তারা জেলেদের নৌকা ও ট্রলার থেমে গিয়ে অপহরণের ঘটনা ঘটাচ্ছে। পরে এসব জেলেদের মুক্তির জন্য মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ দাবি করা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মুক্তিপণ দিতে ব্যর্থ হলে জেলেদের নির্যাতনের সম্মুখীন হতে হচ্ছে।

দস্যুদের ভীতি এখন শুধু মৎস্যজীবীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সুন্দরবন ভিত্তিক পর্যটন শিল্পও এর নেতিবাচক প্রভাবে পড়তে শুরু করেছে। বিভিন্ন সময়ে পর্যটকের নৌকা কিংবা রিসোর্টে ডাকাতির চেষ্টা হয়েছে। এর ফলে পর্যটকদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি বাড়ছে।

পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা বলছেন, সুন্দরবনে দ্রুত নিরাপত্তার অবস্থা উন্নত না হলে, পর্যটন শিল্পের ওপর ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।

এই পরিস্থিতির মোকাবিলায় কোস্টগার্ড, নৌবাহিনী এবং অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনী তাদের অভিযানকে আরও তীব্র করেছে। সম্পর্কিত সূত্রে জানা যাচ্ছে, গত দেড় বছরে বিভিন্ন অভিযানে মোট ৬১ জন দস্যুকে আটক করা হয়েছে এবং বিপুল পরিমাণে অস্ত্র, গোলাবারুদ ও দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে।

তবে উপকূলের মানুষ এখন আর শুধু আশ্বাস শুনতে চান না। তারা কার্যকর এবং স্থায়ী সমাধানের দাবি জানাচ্ছেন। অপহৃত ২২ জেলেকে দ্রুত জীবিত উদ্ধার করতে এবং দস্যু বাহিনীর বিরুদ্ধে কঠোর ও অব্যাহত অভিযান পরিচালনার আহ্বান জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

কয়রা উপজেলার দক্ষিণ বেদকাশি এলাকার মৎস্যজীবী মো. মনিরুল ইসলাম বলেন, “আমরা গরিব মানুষ। নদীতে না গেলে আমাদের অনাহারে থাকতে হয়। কিন্তু এখন নদীতে গেলেও ভয়—ফিরে আসতে পারবো তো? আমাদের পাড়া দিয়ে হাঁটলেই শোনা যায়, ডাকাতরা কারো না কারো তুলে নিয়েছে।”

দাকোপ উপজেলার সুতারখালি এলাকার অরিবিন্দু মণ্ডল মন্তব্য করেন, “সাহস নিয়ে বন যাওয়ার প্রস্তুতি নিই। কিন্তু আবার ভয় করে, ডাকাত যদি ধরে। তখন টাকা পাব কোথা থেকে? বন বিভাগ টাকা নিয়ে পাস-পারমিট দেয়, কিন্তু ডাকাতের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার ব্যবস্থা করেই না। বাঘ, সাপ আর কুমিরের হাত থেকে বাঁচার জন্য আমি মাদুলি বা তাবিজ নিয়ে বনে যাই। কিন্তু ডাকাত থেকে বাঁচার জন্য তাবিজ নেই।”

উপকূলের মৎস্যজীবীরা বলছেন, শুধুমাত্র অভিযান করলেও হবে না; বরং গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, স্থানীয়দের সাথে সমন্বয় এবং নদীপথে নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করলেই দস্যুতা কমানো সম্ভব।
বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থা খুলনার সমন্বয়কারী অ্যাডভোকেট মোমিনুল ইসলাম বলেছেন, “সুন্দরবন একটি বন নয়, এটি উপকূলের লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন এবং আহারের উৎস এবং দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ। যদি সুন্দরবন অপরাধীদের আশ্রয়ে পরিণত হয়, তাহলে এটা শুধু উপকূলের বাসিন্দাদের জন্য নয়, সমগ্র দেশের জন্য বিপজ্জনক হবে।”

সুন্দরবনের পশ্চিম বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এজেডএম হাছানুর রহমান মন্তব্য করেছেন, “আমরা শুনি ডাকাতরা মৎস্যজীবীদের তুলে নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু থানায় কোনো অভিযোগ করা না হওয়ায় প্রশাসনের পক্ষে ব্যবস্থা গ্রহণে সমস্যা হয়। এজন্য মৎস্যজীবীদেরও প্রশাসনকে সহায়তা করতে হবে।”

এদিকে, ‘নৌযাত্রা সুরক্ষিত, জানমালের নিরাপত্তা’ এই স্লোগানকে সামনে রেখে দেশে শুরু হয়েছে একটি সপ্তাহব্যাপী নৌ নিরাপত্তা সপ্তাহ। নৌপরিবহণ অধিদপ্তরের আয়োজনে চলমান এই কর্মসূচির কারণে উপকূলবাসীর মনে বর্তমান একমাত্র প্রশ্ন হলো—এ সপ্তাহব্যাপী উদ্যোগ সুন্দরবনকে কতটা দস্যুমুক্ত করতে পারবে?

উপকূলে বসবাসকারী মানুষের আশা, এটি শুধুমাত্র একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে সুন্দরবনে আবারও নিরাপদ পরিবেশ ফিরিয়ে আনা হবে, যাতে জীবিকার তাত্য নিয়ে নদীতে নামা মানুষগুলো কমপক্ষে জীবিত ফিরে আসার নিশ্চয়তা পায়।

Exit mobile version