প্রিন্ট এর তারিখ: জুলাই ২২, ২০২৬, ১:৩২ এ.এম. || প্রকাশের তারিখ: জুলাই ১৯, ২০২৬, ১০:৩৮ পি.এম.

কয়রায় ঝুঁকিপূর্ণ বিদ্যালয় ভবন ধস, নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রের দাবি জোরালো

নিজস্ব প্রতিবেদক:

কয়রা উপজেলার মহারাজপুর ইউনিয়নের চারদিকে যেন প্রকৃতির ক্রন্দন। নদীভাঙন, জলোচ্ছ্বাস এবং ঘূর্ণিঝড় যেখানে নিয়মিত হয়, সেখানে মানুষের একমাত্র আশ্রয়স্থলটিও এখন মৃত্যুর ফাঁদে পরিণত হয়েছে।

গতকাল শনিবার গোবিন্দপুর গাজী আব্দুল জব্বার স্কুল অ্যান্ড কলেজের পুরনো ভবনের সামনের অংশ ধসে গেছে। ভবনটি অনেক আগে থেকেই ঝুঁকিপূর্ণ ছিল তবে বিকল্প না থাকায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সেখানে ক্লাস চলছিল।

ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও জলবায়ু পরিবর্তনের ধারাবাহিক প্রভাবে দেশের উপকূলীয় এলাকা কয়রা বারবার ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। এ দুর্যোগের প্রভাব থেকে এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোও রক্ষা পাচ্ছে না। কয়রা উপজেলার গাজী আব্দুল জব্বার হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজের অবকাঠামোগত নিরাপত্তা ও দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা নিয়ে স্থানীয় অভিভাবক, শিক্ষার্থী ও সচেতন মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বেড়ে গেছে। স্থানীয়রা বলছেন, বর্ষা মৌসুমে অধিক বৃষ্টির এবং জলাবদ্ধতার কারণে বিদ্যালয় চত্বর জলমগ্ন হয়ে পড়ে। ঘূর্ণিঝড় ও প্রবল বাতাসের সময়ে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার বিষয়েও উদ্বেগ রয়েছে। দুর্যোগকালে নিরাপদ শিক্ষা কার্যক্রম নিশ্চিত করতে অবকাঠামো আরও শক্তিশালী করার দাবি জানিয়েছেন তারা।

অভিভাবকদের অভিযোগ, উপকূলীয় এলাকার বাস্তবতা বিবেচনা করে বিদ্যালয়গুলোর জন্য দুর্যোগ-সহনশীল ভবন, উন্নত ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং জরুরি আশ্রয় ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। বিশেষ করে কয়রার মতো দুর্যোগপ্রবণ অঞ্চলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিরাপদ রাখা এখন সময়ের দাবি।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, উপজেলার গোবিন্দপুর, আটরা, দশহালিয়া ও লোকা এলাকা এখন জলবায়ু পরিবর্তনের একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। কপোতাক্ষ নদের পাড়ে গড়ে ওঠা এই জনপদে নদীভাঙন ও জলোচ্ছ্বাসের প্রভাবে মানুষের জীবন আজ বিপর্যস্ত।

গত পাঁচ বছরে অন্তত ৭০টি পরিবার তাদের ঘরবাড়ি হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছে। অথচ প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় মাথা গোঁজার মতো কোন আশ্রয়কেন্দ্র নেই। এলাকায় গোবিন্দপুর গাজী আব্দুল জব্বার স্কুল অ্যান্ড কলেজই একমাত্র বড় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।

দুর্যোগের সময় স্থানীয় মানুষ এখানে আশ্রয় নেয়। কিন্তু দুইতলা এই ভবনটি এখন খুবই জরাজীর্ণ। দরজা-জানালা নেই, ছাদের plaster খসে পড়ছে। এই জরাজীর্ণ কক্ষে শিক্ষার্থীরা ঝুঁকি নিয়ে ক্লাস করছে। কিন্তু গতকাল হঠাৎ ভবনের সামনের অংশ ভেঙে যায়। স্কুল বন্ধ থাকায় কোনো ক্ষতি হয়নি।

প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক রবিউল ইসলাম বলেন, এ এলাকায় তিন কিলোমিটারের মধ্যে কোন সাইক্লোন শেল্টার নেই। জল  inundation এর সময় বাধ্য হয়ে মানুষকে গাছের ওপর উঠে আশ্রয় নিতে দেখি। স্কুলটি জীর্ণ হলেও দুর্যোগকালে মানুষের বিদায় নেওয়ার অন্য জায়গা থাকে না। কিন্তু ভবনটি ভেঙে যাওয়ায় এখন ছাত্র-ছাত্রীদের ক্লাস নেওয়াও ঝুঁকিপূর্ণ।

এলাকার প্রবীণ বাসিন্দা মাওলানা মহিববুল্লাহ নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করতে গিয়ে বলেন, নদী প্রতিদিন আমাদের গ্রাম ছুঁড়ে ফেলছে। গত ৫ বছরে সব শেষ হয়ে গেছে। ঝড় হলে বা বাঁধ ভেঙে প্লাবিত হলে আমরা কোথা যাব? আমাদের কেউ দেখার নেই। এই দুঃখজনক প্রশ্নটি এখন গোটা এলাকার নিম্নবিত্ত মানুষের মুখে মুখে।

উপকূল ও সুন্দরবন সংরক্ষণ আন্দোলনের সভাপতি তরিকুল ইসলাম বলেন, প্রতিবছর সাইক্লোন সিজনে উপকূলের খবর শিরোনামে আসে, কিছু ত্রাণ ও সহানুভূতি দেখা যায়। কিন্তু টেকসই সমাধানে কোন পদক্ষেপ নেওয়া হয় না। কপোতাক্ষের  জরাজীর্ণ বাঁধ ও আশ্রয় কেন্দ্রের অভাব এই এলাকার মানুষকে চরম ঝুঁকিতে ফেলে দিয়েছে। এখানে জরুরি ভিত্তিতে একটি সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণ এখন সময়ের দাবি।

কয়রা উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল জাবের বলেন, আমরা জানি ওই এলাকায় একটি পরিকল্পিত আশ্রয় কেন্দ্র নির্মাণ কেমন জরুরি। গাজী আব্দুল জব্বার স্কুল অ্যান্ড কলেজ ক্যাম্পাসে একটি আধুনিক সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণের প্রস্তাবনা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে। আমরা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এটি বাস্তবায়নের চেষ্টা করব।

অস্থায়ী সংস্কার বা ত্রাণ নয়, গোবিন্দপুর এবং এর পার্শ্ববর্তী এলাকার হাজারো মানুষের জীবন রক্ষায় একটি নিরাপদ ও কার্যকর আশ্রয় কেন্দ্র এখন জীবনের দাবী।